নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে জীবনযাত্রার পথে আনন্দ ও বেদনার অনুভূতির অংশীদার হিসেবে বিশ্বস্ত সুহৃদ বা সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করে থাকে। কেবল সঙ্গী বা সুহৃদ বানিয়ে নেওয়াতেই সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে না, বরং মূল পরীক্ষাটি নিহিত থাকে সেই সুসম্পর্ককে জীবনের প্রতিটি বাঁকে সুরক্ষিত ও অটুট রাখার প্রক্রিয়ার মধ্যে।
ইসলামের সোনালী জীবনদর্শনে বন্ধুত্ব নিছক পার্থিব কথাবার্তা কিংবা কোনো ধরনের স্বার্থের লেনদেন নয়, বরং এটি একটি গভীর আত্মিক এবং বিশ্বাসগত সুদৃঢ় সংযোগ। শুধুমাত্র নিঃস্বার্থ স্নেহ এবং মানবিক গুণাবলির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সুসম্পর্কই কেবল ইহকালে ও পরকালে সমানভাবে মজবুত থাকে।
বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান শর্ত হলো এতে কোনো প্রকার দুনিয়াবি স্বার্থ বা লোভের উপস্থিতি না থাকা। যে সুসম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির অনুভূতির ওপর নির্মিত হয়, তা কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থের আঘাতে তলিয়ে যায় না।
শেষ বিচারের কঠিন মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাআলা যেসব বান্দাকে নিজের বিশেষ আরশের ছায়া দান করবেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একটি দল হলো সেই দুই সুহৃদ—যাঁরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবেসেছিলেন এবং সেই পবিত্র ভালোবাসার বন্ধনেই একত্রিত হয়েছিলেন ও পরবর্তীতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। এই সুমহান বার্তার কথা সহিহ বুখারি শরিফের ৬৬০ নম্বর হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
সুসম্পর্কের স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে সঙ্গীর আচার-আচরণের ওপর। ভালো মানুষের সান্নিধ্য মানুষের পুরো জীবনকে সুন্দর করে তোলে। পবিত্র কোরআনের সুরা তওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করো এবং সর্বদা সত্যবাদীদের সঙ্গ লাভ করো।
ক্ষতিকর স্বভাবের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা সময়ের পরিক্রমায় অনুতাপ বা পস্তানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাই সম্পর্কের শুরুতেই সততার গুণটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
মানুষ মাত্রই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। দীর্ঘদিনের পথচলায় সঙ্গীর কোনো কথা বা আচরণে মনে আঘাত পেতেই পারে। সেই পরিস্থিতিতে মনের মধ্যে ক্ষোভ জমিয়ে না রেখে ক্ষমা করে দেওয়াটাই হলো একটি চমৎকার চরিত্রের প্রকৃত নিদর্শন। পারস্পরিক সহনশীলতা সম্পর্কের আয়ুষ্কাল অনেক বাড়িয়ে দেয়।
বিখ্যাত মনীষী ইমাম গাজালি তাঁর ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, সঙ্গীর ভুলত্রুটিগুলোকে কোনো গোয়েন্দার মতো খুঁজে না বের করে বরং তা পর্দাবৃত করা এবং ক্ষমাসুন্দর মন নিয়ে দেখাটাই হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্বের মূল দাবি।
কোনো বিশ্বস্ত সঙ্গীর কোনো গোপনীয় তথ্য বা দুর্বলতার বিষয় জানা থাকলে তা কখনোই অন্য কোনো ব্যক্তির সামনে উন্মুক্ত করা যাবে না। অবিশ্বস্ততার আচরণ বন্ধুত্বের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
কোনো বিশ্বস্ত সঙ্গীর কোনো গোপনীয় তথ্য বা দুর্বলতার বিষয় জানা থাকলে তা কখনোই অন্য কোনো ব্যক্তির সামনে উন্মুক্ত করা যাবে না। অবিশ্বস্ততার আচরণ বন্ধুত্বের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে কখনো তার ওপর জুলুম করে না এবং বিপদের মুখে তাকে একা ফেলে চলে যায় না। যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের গোপন ত্রুটি ঢেকে রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলাও তার গোপন ত্রুটিগুলো ঢেকে দেবেন। এই অমূল্য নির্দেশনাটি সহিহ মুসলিম শরিফের ২৫৮০ নম্বর হাদিসে পাওয়া যায়।
আদর্শ বন্ধু কেবল সুখের দিনগুলোতে পাশে থাকে না, বরং জীবনের যেকোনো কঠিন বিপদের মুহূর্তে বিশ্বস্ত আশ্রয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অভাবের সময়, অসুস্থতার দিনগুলোতে কিংবা মানসিক সংকটের মুহূর্তে সঙ্গীর পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানো প্রতিটি মুমিনের সুনির্দিষ্ট ইমানি দায়িত্ব।
হাদিস শরিফে একজন মুমিনের সঙ্গে আরেকজন মুমিনের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি সুদৃঢ় ভবনের বিভিন্ন ইটের গাথুনির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা একে অপরকে অত্যন্ত শক্তভাবে ধরে রাখে। এই চমৎকার উপমাটি সহিহ বুখারি শরিফের ৪৮১ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে।
ছোটখাটো উপহার মানুষের অন্তরের ভেতরের অহংকার ও পারস্পরিক দূরত্ব দূর করে সুসম্পর্ককে আরও গাঢ় করে তোলে। আন্তরিকভাবে উপহার দেওয়া-নেওয়া এবং হাসিমুখে কুশল বিনিময় মানুষের ভেতরের হিংসা ও বিদ্বেষের ভাব মুছে ফেলে এবং পারস্পরিক ভালোবাসাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করে। বিষয়টি ইবনে নববির ‘রিয়াদুস সালেহিন’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১২৩ পৃষ্ঠায় আলোচিত হয়েছে।
বন্ধুর অনুপস্থিতির সময়ে তার সার্বিক কল্যাণের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে দোয়া করা হলো নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নিদর্শন বা নমুনা।
প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন তার ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে আন্তরিক দোয়া করে, তখন সেই দোয়া কবুল হয় এবং তাঁর মাথার কাছে একজন নির্দিষ্ট ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন, যিনি বলতে থাকেন: আমিন, অর্থাৎ তোমার জন্যেও যেন অনুরূপ কল্যাণ অর্জিত হয়। এই সুন্দর বাণীর উল্লেখ রয়েছে সহিহ মুসলিম শরিফের ২৭৩২ নম্বর হাদিসে।
বন্ধুত্ব হলো মহান সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে দান করা এক অপূর্ব নেয়ামত। সামান্য কিছু ভুল-বোঝাবুঝি কিংবা অতিরিক্ত অহংকারের বশে কোনো বিশ্বস্ত বন্ধুকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।
পারস্পরিক সম্মানবোধ, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা সুসম্পর্ক কেবল ইহকালেই মনের প্রশান্তি আনে না, বরং পরকালের অনন্ত জীবনেও জান্নাতের সঙ্গী হওয়ার পথকে সহজ ও সুগম করে দেয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর