ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইতালিতে তরুণদের বিক্ষোভ ও সহিংসতায় উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
ইতালিতে তরুণদের বিক্ষোভ ও সহিংসতায় উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ইউরোপীয় রাষ্ট্র ইতালিতে জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান খরচ, আবাসনের তীব্র সংকট, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নানা নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন দেশের অসংখ্য তরুণ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনতা। গত ১৭ অক্টোবর সংঘটিত সহিংস বিক্ষোভের পর গত শনিবার, অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২৪ অক্টোবর দেশটির প্রধান শহর রোম, মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ফের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি এবং পুলিশ কর্কশ পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করলেও আগের সপ্তাহের মতো কোনো ব্যাপক লুটপাটের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

ইতালীয় জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশজুড়ে চলমান এসব বিক্ষোভ, সহিংসতা ও লুটপাটের পূর্ণাঙ্গ ঘটনায় মোট ৪ হাজার ২৯২ জন নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ৩৭১ জনকে আটক করে সরাসরি থানায় বা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ৯ জনকে পাকড়াও করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৮৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ দপ্তরে যাদের ধরে আনা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ঠিক ১১০ জন ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক।

বর্তমান ইতালির এই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা সহজ কথায় জেন-জির বহু তরুণ এখন গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, তাদের মা-বাবারা অতীতে যে ধরনের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিলেন, আজকের দিনে তারা তার সমস্ত কিছু থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও তরুণদের মধ্যে এই অসন্তোষ মাথাচাড়া দেওয়ার প্রধান কারণগুলোর মাঝে রয়েছে অতিরিক্ত শিক্ষা ব্যয়, ভয়াবহ আবাসনসংকট, অনিশ্চিত চাকরির বাজার এবং দৈনন্দিন জীবনে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ডিজিটাল মাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে' বা ১৭ অক্টোবর আন্দোলন নামে নতুন একটি সামাজিক প্রচার শুরু হয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে সাধারণ তরুণদের এই মহাসমাবেশে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে জোরালো অভিযোগ হলো, ইতালিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, জ্বালানি এবং বাসাভাড়া যেভাবে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। বিশেষ করে মিলান, রোম ও বোলোনিয়ার মতো জনবহুল বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীদের জন্য বাসস্থান বা আবাসন ব্যয় একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, ইতালিতে চলা সব বিক্ষোভ একই আন্দোলনের অংশ নয়। স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীও পৃথকভাবে নিজেদের কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের একটি বিশেষ অংশ শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারি বাজেট বা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামরিক খাতের ব্যয় কমানোর জোরালো দাবি জানিয়েছে। তাদের গুরুতর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটের সুরাহা করার পরিবর্তে বর্তমান সরকার সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করাকেই নিজেদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের স্বনামধন্য সংগঠন 'উনিয়নে দেইলিঁ উনিভেসিতারি'-এর জাতীয় সমন্বয়ক সাবরিনা ব্রিৎসোলা সম্প্রতি এক বিশাল সমাবেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কঠোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে; শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেই চলবে না, সেই শিক্ষার মান হতে হবে বিশ্বমানের এবং শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম 'ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট'-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন প্রজন্মের উচ্চাশা ও প্রত্যাশা কোনোভাবেই পূরণ করতে পারছে না, আর এই সুদীর্ঘ অনুভূতির কারণেই দিনের পর দিন জমে থাকা অসন্তোষ আজ এভাবে বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতি বিস্তার ও আগ্রাসনের কারণে কর্মজীবনের একেবারে শুরুর দিকের চাকরিগুলো আরও বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তরুণদের মনে গভীর উদ্বেগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের শক্তিশালী প্রভাব সুদূর ইতালিতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। ইতালীয় আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের বেশ কিছু গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উভয় দেশেই শিক্ষার মান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে একই রকম তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। গত ৭ অক্টোবর রোমের একটি ঐতিহ্যবাহী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আকস্মিক বিক্ষোভ শুরু করে। আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত সেই বিবৃতির একদম শুরুতেই ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সংহতি জানানো হয়। তবে ইতালির সরকার এই দুই দেশের পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই এক করে দেখতে একেবারেই রাজি নয়।

চলতি মাসের একেবারে শুরুর দিকে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে, ইতালির সার্বিক পরিস্থিতি ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রকাশিত বক্তব্যে দুই দেশের তরুণদের সুনির্দিষ্ট দাবির মধ্যে দারুণ মিল পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের প্রভাবশালী সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো একে অপরের সঙ্গে নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আন্দোলনের নানান কৌশল নিয়মিতভাবে পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। তাঁর পরিষ্কার মতে, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির এই জোরালো দাবি এখন বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি সর্বজনীন ও সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ কেবল জনবহুল রাজপথের রক্তক্ষয়ী বা উত্তপ্ত সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এর সুদূরপ্রসারী মধ্য দিয়ে ইতালি তথা সমগ্র ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রজন্মের চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে পুঞ্জীভূত অসন্তোষও আজ বিশ্বের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান এবং উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত ব্যবহার করে খুব কম সময়ে কর্মসূচিগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া। '১৭ অক্টোবর আন্দোলন'-এর মূল আয়োজকেরা ২৪ অক্টোবরের নির্ধারিত বিক্ষোভের সুনির্দিষ্ট স্থানটি একদম শেষ মুহূর্তে সবাইকে জানানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিলেন। এর ফলে সম্ভাব্য জমায়েতস্থল সঠিকভাবে নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিকল্পনা তৈরিতে স্থানীয় পুলিশের জন্য মারাত্মক সব জটিলতা তৈরি হয়। এই বড় বিক্ষোভের ঠিক আগের দিন দেশটির ১৮টি ভিন্ন শহরে পুলিশ ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে। আগের সপ্তাহের ভয়াবহ সহিংসতার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার সন্দেহে পুলিশ প্রায় ১০০ জনকে চিহ্নিত করে, যাদের মধ্যে ঠিক প্রায় অর্ধেকই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর।

রাজধানী রোমের জনবহুল এলাকায় বিক্ষোভকারীদের একটি নির্দিষ্ট দল ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন কলোসিয়ামের ভেতরে ঢুকে পড়ে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কুইরিনালে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি সংবেদনশীল এলাকায় পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ও বোতল নিক্ষেপ করার পর উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাধ্য হয়ে জলকামান ব্যবহার করে। উত্তর ইতালির প্রাচীন শহর তুরিনে সামরিকীকরণের তীব্র বিরোধিতায় প্রায় চার হাজার সাধারণ মানুষ এই বিশাল বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের কঠিন বাধা অতিক্রম করার বৃথা চেষ্টা এবং পরবর্তীতে সংঘর্ষের মারাত্মক ঘটনায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। সেখানে সংঘর্ষের পর দুজনকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২৫ জনের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ আনা হয়।

ঐতিহাসিক বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের একটি উগ্র অংশ রাজপথের মাঝখানে ভারী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং রাস্তার পাশের ময়লা-আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সেখানে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, সেখানে সবমিলিয়ে অন্তত ১৯ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সাংস্কৃতিক জনপদ ফ্লোরেন্সেও বিক্ষোভকারীদের একটি দল শহরের বিলাসবহুল সব দোকানপাটের বাণিজ্যিক এলাকার দিকে তীব্র বেগে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, মিলান শহরে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভে অংশ নিলেও সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে کافی শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। সন্ধ্যার দিকে বিক্ষিপ্তভাবে ছুটে আসা বিভিন্ন মিছিল একত্রে মিলিত হওয়ার পর উপস্থিত মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সবমিলিয়ে প্রায় ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। এছাড়া নাপোলি, পাদোভা ও বারি সহ দেশের আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে ছোট-বড় বিক্ষোভ পালিত হলেও সেখানে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
পূজার ছুটিতে পাহাড় ও ঝরনা দেখতে ঘুরে আসুন খাগড়াছড়িতে

পূজার ছুটিতে পাহাড় ও ঝরনা দেখতে ঘুরে আসুন খাগড়াছড়িতে