নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় গণহত্যা, ব্যাপক ধ্বংসলীলা, অগণিত মানুষের ঘরছাড়া হওয়া এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির মামলার আইনি লড়াইয়ের মুখে ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর পারস্পরিক লড়াইয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস মিলেছে। আজকের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর যে ফলাফল প্রকাশ পাবে, তা ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দেশ শাসন করা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। যদিও দেশটির ক্ষমতার মসনদে পরিবর্তন এলেই যে অবহেলিত ও নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের যাপিত জীবনে কোনো স্বস্তি বা শান্তি নেমে আসবে, তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা এখনো কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমান ইসরায়েলি রাষ্ট্রে নিবন্ধিত মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখের কাছাকাছি। দেশটির সর্বোচ্চ আইনসভা বা পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনের বিপরীতে এই ভোটাভুটি চলছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য এককভাবে সরকার গঠনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে কমপক্ষে ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। ইসরায়েলের প্রচলিত নির্বাচনি নিয়ম অনুযায়ী, দেশের সাধারণ ভোটাররা সরাসরি কোনো প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান না। তাঁরা মূলত তাদের পছন্দের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা পক্ষে ভোট দেন। প্রতিটি দল ভোটের আগেই তাদের নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের একটি ক্রমিক তালিকা দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করে থাকে। নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ভোটের হারের অনুপাতে পার্লামেন্টের আসনগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে নেসেটে নিজেদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হলে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে ন্যূনতম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতেই হবে।
যুদ্ধপ্রিয় নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর নিজস্ব দল লিকুদ পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে ডানপন্থী এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শিবিরের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। তাঁর বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের দল জিউইশ পাওয়ার এবং বেজালেল স্মোত্রিচের দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম সক্রিয় রয়েছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় বেন-গভির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং স্মোত্রিচ অর্থমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন। এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল ধারার ইহুদি রাজনৈতিক দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমও নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে এর সম্পূর্ণ বিপরীতে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু এবং ডেমোক্র্যাটস দলগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী বিরোধী শিবির গড়ে উঠেছে। তবে এই বিরোধী জোট নির্বাচনে জয়লাভ করলে তাদের পক্ষ থেকে কে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কারো নাম ঘোষণা করা হয়নি। তা সত্ত্বেও দেশের সাবেক সেনা প্রধান এবং ইয়াশার দলের শীর্ষ নেতা গাদি আইজেনকটকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীদের তালিকায় সবার চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রাখা হচ্ছে। টুগেদার দলের প্রধান ও দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও এই পদের অন্যতম একজন জোরালো দাবিদার। এ ছাড়া অপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে নিজের জোরালো দাবি পেশ করে রেখেছেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার প্রকাশিত একটি জনমত জরিপের বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, লিকুদ এবং ইয়াশার দল দুটি পৃথকভাবে ২২টি করে আসন পেতে পারে, টুগেদার দল ১৪টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটস ও জয়েন্ট লিস্ট ৯টি করে আসন অর্জন করতে পারে। এ ছাড়া জিউইশ পাওয়ার, শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম দলগুলোর প্রত্যেকে ৮টি করে আসন পেতে পারে, এবং ইসরায়েল বেইতেনু ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম দল দুটি ৭টি করে আসন লাভ করতে পারে। এর পাশাপাশি রা’আম দলটির ঝুলিতে ৫টি আসন যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী বিচার করলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবিরটি ৫৩টি এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরটি ৫২টি আসন পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, চলমান নির্বাচনে প্রধান কোনো জোটের পক্ষেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী স্বতন্ত্র আরব দলগুলোর সমর্থন যেকোনো পক্ষের জন্য সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্ণায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে গাদি আইজেনকটসহ বিরোধী শিবিরের প্রায় অধিকাংশ শীর্ষ নেতাই এই ধরনের আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান বা নাকচ করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যদি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে দেশটিতে খুব দ্রুত আরও একটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর সেই অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে হতে পারে। উল্লেখ্য যে, নেতানিয়াহু তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এ পর্যন্ত মোট ছয়টি ভিন্ন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যদি এবার কোনোভাবে পুনরায় সরকার গঠন করতে সক্ষম হন, তবে তা হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সপ্তম মেয়াদ।
ইসরায়েলে ২০২৩ সালের গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত নজিরবিহীন হামলার পর থেকে এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে সরকারের চরম নিরাপত্তাব্যর্থতার দায় এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি ভোটারদের মাঝে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও বিরোধীরা এই ভয়াবহ ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জবাবদিহি কঠোরভাবে দাবি করে আসলেও তিনি বরাবরই এর দায় নিতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। এ ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে বিশেষ অব্যাহতি দেওয়া এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নিয়েও সাধারণ ভোটারদের মনের ভেতর গভীর ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে।
ইসরায়েলের এই আসন্ন ও জটিল নির্বাচন প্রসঙ্গে গাজা উপত্যকার এক বাস্তুচ্যুত সাধারণ ফিলিস্তিনি বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়ান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার কাছে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে হেরে গেলেও ইসরায়েলের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় কোনো ধরনের বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। এরপরেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে চাচ্ছেন যে নেতানিয়াহুর শোচনীয় পরাজয় ঘটুক।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর