ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বনানীতে নজর কাড়ল শুভ্র তারা পেন্টাস ফুল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
বনানীতে নজর কাড়ল শুভ্র তারা পেন্টাস ফুল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গত ২৮ জুলাইয়ের এক দুপুরে রাজধানীর বনানী এলাকার কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ ধরে পথ চলার সময় লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাত মৈত্রী কমপ্লেক্সের সামনে সারিবদ্ধভাবে সাজানো কয়েকটি ফুলের টব। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে শ্রাবণের প্রকৃতিতে বৃষ্টির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের ভিড়ে একটি টবে ফোটানো সাদা রঙের ফুলগুলোর মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অত্যন্ত কাছে গিয়ে নিরীক্ষণ করার পর স্পষ্ট হয় যে এগুলো মূলত দৃষ্টিনন্দন সাদা পেন্টাস ফুল, যার মোহনীয় ও স্নিগ্ধ রূপ দেখে ক্যামেরায় ছবি বন্দি না করে উপায় ছিল না। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এই অভিজ্ঞতা নতুন এক অনুভূতির জন্ম দেয়।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যভান্ডারে এমন বহু উদ্ভিদ ও ফুল রয়েছে, যেগুলোর বর্ণবিন্যাস, শারীরিক গঠন এবং স্নিগ্ধ সৌন্দর্য মুহূর্তেই মানুষের মন কেড়ে নিতে সক্ষম, আর এই তালিকায় সাদা পেন্টাস অত্যন্ত একটি উল্লেখযোগ্য নাম। উদ্ভিদজগতে এই ফুলের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি হলো 'Pentas lanceolata' এবং এটি মূলত রুবিয়েসি বা Rubiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর ছোট আকৃতির পাঁচটি পাপড়িযুক্ত ফুলগুলো অত্যন্ত ঘন গুচ্ছাকারে একসঙ্গে ফুটে থাকে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাঢ় সবুজ পাতার বিশাল সামাজ্যের বুকে একরাশ শুভ্র তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তারার মতো দেখতে এই ফুলের অসাধারণ গুচ্ছের কারণেই ইংরেজিতে এই গাছটিকে অত্যন্ত জনপ্রিয়ভাবে 'ইজিপশিয়ান স্টারক্লাস্টার' হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।

সাদা রঙের এই পেন্টাস ফুলের সৌন্দর্যের মূল এবং অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রঙের সরলতা ও পবিত্রতা। গাঢ় সবুজ পাতার পাতার পটভূমির সঙ্গে সাদা রঙের ফুলের আকর্ষণীয় বৈপরীত্য এই গাছটিকে অন্যান্য সাধারণ গাছের তুলনায় অনেক বেশি চমৎকার ও আকর্ষণীয় করে তোলে। যদিও ফুলগুলোর ব্যক্তিগত আকার বেশ ক্ষুদ্র, তথাপি একসঙ্গে অসংখ্য ফুল ফোটার কারণে পুরো উদ্ভিদটিই অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। গ্রিক শব্দ 'penta' থেকে মূলত 'পেন্টাস' নামকরণটি এসেছে, যার সহজ অর্থ পাঁচ এবং এটি ফুলের পাঁচটি পাপড়ির সংখ্যার সঙ্গেই সরাসরি সম্পর্কিত। উদ্ভিদটির আদি প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃতি মূলত আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে আরব উপদ্বীপের কিছু নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে এই গাছটি একটি জনপ্রিয় শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। সাদা রঙের পাশাপাশি পেন্টাসের অন্যান্য জাতের মধ্যে লাল, গোলাপি, বেগুনি ও ল্যাভেন্ডার রঙের বিভিন্ন বৈচিত্র্যও দেখতে পাওয়া যায়। তবে গাঢ় সবুজ পাতার নিখুঁত পটভূমিতে এই সাদা ফুলের গুচ্ছের রূপ ও সৌন্দর্য সম্পূর্ণ আলাদাভাবে মানুষের চোখে ধরা পড়ে। সাদা রঙের কোমল পাপড়ি এবং সবুজ পাতার অপূর্ব মেলবন্ধনে এই গাছটি লাভ করে এক পরিচ্ছন্ন, শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ।

উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুযায়ী পেন্টাস প্রজাতিটি মূলত একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ হিসেবে বেড়ে ওঠে। অনুকূল ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এই গাছটি সাধারণত এক থেকে তিন ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি লম্বা হতে দেখা যায়। এর মূল কাণ্ড থেকে শাখা-প্রশাখা গজিয়ে একটি সুন্দর ঝোপালো আকৃতি তৈরি করে থাকে। সঠিক ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এই গাছটি খুব সহজেই অত্যন্ত ঘন ও সুগঠিত রূপ লাভ করতে পারে।

এই উদ্ভিদের পাতাগুলো সাধারণত বিপরীত বিন্যাসে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে। পাতার আকৃতি প্রধানত ডিম্বাকৃতি থেকে শুরু করে বর্শাকৃতির হয়ে থাকে, যার অগ্রভাগ বেশ সরু ও সুচালো প্রকৃতির। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ, পৃষ্ঠদেশ সূক্ষ্ম রোমে আচ্ছন্ন থাকতে পারে এবং পাতার ভেতরের শিরাগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়। এই চমৎকার সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা সাদা ফুলের থোকাগুলোই গাছটির সামগ্রিক সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তবে নিঃসন্দেহে পেন্টাস উদ্ভিদের সবচেয়ে বড় ও প্রধান আকর্ষণ হলো এর আকর্ষক ফুলগুলো। অসংখ্য ক্ষুদ্র আকৃতির ও নলাকার ফুল একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি ঘন গুচ্ছ তৈরি করে থাকে। ফুলের ঠিক অগ্রভাগে পাঁচটি পাপড়ি তারার মতো চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। গাছের নির্দিষ্ট জাত এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে একটি একক গুচ্ছে ফুলের সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। যখন একসঙ্গে প্রচুর ফুল ফোটে, তখন পুরো গাছটিকেই যেন এক শুভ্র তারার অপরূপ সমারোহ বলে মনে হয়।

উষ্ণ আবহাওয়ায় পেন্টাস গাছ দীর্ঘ সময় ধরে একটানা ফুল ফুটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। পর্যাপ্ত আলোর উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় উষ্ণতা এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও এই গাছে দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ফুটতে দেখা যায়। রোদযুক্ত ও উন্মুক্ত স্থানে এই উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ফুল ফোটার প্রক্রিয়া সাধারণত সবচেয়ে ভালো হয়। প্রতিদিন অন্তত কয়েক ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলো পেলে গাছটি সবসময় সতেজ থাকে। যদিও এটি আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানেও বেঁচে থাকতে পারে, তথাপি অতিরিক্ত ছায়ার কারণে ফুলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

পেন্টাস উদ্ভিদ কেবল মানুষের চোখের তৃপ্তি বা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই নয়, বরং প্রকৃতিতে বিচরণকারী বিভিন্ন পরাগায়নকারী প্রাণীদের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। এর ফুলের মধ্যে থাকা সুমিষ্ট মধু প্রজাপতি, মৌমাছি এবং অন্যান্য ছোট পতঙ্গকে খুব সহজেই আকর্ষণ করে। পৃথিবীর কিছু কিছু অঞ্চলে আবার হামিংবার্ডের মতো সুন্দর পাখিরাও এই ফুলের মধু সংগ্রহ করার জন্য ছুটে আসে। ফলস্বরূপ, বাগানের ভেতরে পেন্টাস গাছ রোপণ করলে তা পরাগায়নকারী বিভিন্ন প্রাণীর জন্য একটি চমৎকার ও নির্ভরযোগ্য খাদ্যের উৎস তৈরি করতে পারে।

বাড়ির বাগানের সীমানা সুন্দরভাবে সাজানো, ফুলের বিশেষ বেড তৈরি করা, হাঁটার পথের দুই পাশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি কিংবা বারান্দার টবে চাষ করা—সব ক্ষেত্রেই পেন্টাস গাছ অত্যন্ত উপযোগী একটি পছন্দ। সাদা পেন্টাসের পাশাপাশি যদি লাল, গোলাপি কিংবা বেগুনি রঙের পেন্টাস একসঙ্গে লাগানো যায়, তবে বাগানে বিভিন্ন রঙের এক অপূর্ব সমাহার তৈরি হয়। সবুজ পাতার ঘনত্ব এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ফুটার সহজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাগান সবসময় প্রাণবন্ত ও সজীব থাকে।

বাড়ির ছোট্ট বারান্দা হোক কিংবা কোনো বিস্তৃত বাগান, সাদা পেন্টাস সেখানে অনায়াসে যোগ করতে পারে এক স্নিগ্ধ ও প্রশান্তিদায়ক সৌন্দর্য। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় পরাগায়নকারী প্রাণীদের জন্যও একটি অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশবান্ধব বাগানের চমৎকার এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয়ের কারণে ইজিপশিয়ান স্টারক্লাস্টার বা পেন্টাস ফুলপ্রেমী মানুষের কাছে একটি চমৎকার পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পরিশেষে এই পুরো তথ্য ও উদ্ভিদের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান চয়ন বিকাশ ভদ্র।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
কাজের অনীহা ও ক্লান্তি দূর করে কর্মোদ্দীপনা ফেরার ৭ উপায়

কাজের অনীহা ও ক্লান্তি দূর করে কর্মোদ্দীপনা ফেরার ৭ উপায়