ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ঋণের চাপে বরগুনায় দুই মেয়েকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 30, 2026 ইং
ঋণের চাপে বরগুনায় দুই মেয়েকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর তিনতলা ভবনের কক্ষ থেকে মা এবং দুই শিশুর মৃতদেহ পাওয়ার ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বরগুনা জেলা পুলিশ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের সামগ্রিক দিক বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান। পারিবারিক চরম অনটন এবং চার লাখ টাকার বেশি দেনা ও কিস্তির চাপই এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।

গত বছরের তিন মার্চ বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তিনতলার দুটি আলাদা কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ইতি রানী (৩৪) এবং তাঁর দুই কন্যাসন্তান আরাধ্যা বিশ্বাস (১১) ও অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) নিথর দেহ। নিহত ইতি ওই ডাকবাংলো ভবনেই একজন অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তিনি বরগুনা পৌরসভার কালীবাড়ি সড়কের বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

নিহতদের ময়নাতদন্তের ওই মেডিকেল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মা ইতি রানীর মৃতদেহটিতে রাসায়নিক বিষের উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং তাঁর এই মৃত্যুটি মূলত আত্মহত্যাজনিত। অন্যদিকে, দুই কন্যা আরাধ্যা ও অনুরাধার ক্ষেত্রে একই ধরনের রাসায়নিক বিষক্রিয়ার পাশাপাশি তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করার সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দল এই মৃত্যুগুলোকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন, তবে ফরেনসিক পরীক্ষার সময় কাউকেই ধর্ষণের কোনো ধরনের আলামত বা লক্ষণ পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করা হয়।

পুলিশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, নিহত ইতির স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশাগতভাবে একজন সুপারি ব্যবসায়ী এবং পাশাপাশি দরজির কাজ করতেন। তাঁর এই ক্ষুদ্র দরজির দোকান এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরের সুপারি ব্যবসার আয় দিয়ে বড় পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এছাড়া তাঁদের বহুদিনের পুরোনো বসতভিটাটি প্রায় তিন দশক আগে প্রমত্তা নদীর ভাঙনে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সময় থেকেই তাঁরা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে সরকারি জমিতে বসতি গড়ে তুলে বসবাস করে আসছিলেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, গৃহকর্ত্রী ইতি রানী বিভিন্ন বেসরকারি পাঁচটি ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বমোট দুই লাখ সাতাশ হাজার সাতশো তেইশ টাকা এবং তাঁর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস আরেকটি সংস্থা থেকে আরও আশি হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁরা অনিল রায় ও বাবুল রায় নামের অপর দুজন ব্যক্তির কাছ থেকেও ব্যক্তিগতভাবে এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন, যার ফলে তাঁদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছিল চার লাখ সাত হাজার সাতশো তেইশ টাকায়। বিশাল এই ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করার বিষয়টি নিয়ে ইতি রানী মানসিকভাবে মারাত্মক দুশ্চিন্তা ও চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।

পরিবারের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটিয়ে স্বামীকে আর্থিকভাবে সামান্য সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে মর্মান্তিক ওই আত্মহত্যার ঘটনার প্রায় দুই মাস পূর্বে মাসিক মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনের বিনিময়ে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি নেন ইতি রানী। পরিবারের চলমান তীব্র আর্থিক সংকট ও দেনার পাহাড়সম চাপের কারণে সৃষ্ট চরম হতাশা থেকেই নিজের সন্তানদের প্রথমে হত্যার পর তিনি নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নেন বলে পুলিশ জানায়।

ঘটনার দিন বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় স্থাপন করা ক্লোজ সার্কিট বা সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখেছে যে, নির্দিষ্ট ওই দিন সকাল দশটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ইতি রানী তাঁর দুই কন্যাসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ভবনটিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি ভবনটির তিন তলার ওপরের তলায় চলে যান এবং সকাল দশটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ডে বড় মেয়ে আরাধ্যা তিন নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে। এর ঠিক কিছু সময় পর ইতি রানী তাঁর ছোট মেয়ে অনুরাধাকে চার নম্বর কক্ষে রেখে নিজে তিন নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন এবং বেলা এগারোটা বেজে তেরো মিনিট তেইশ সেকেন্ডে তিনি তিন নম্বর কক্ষ থেকে বের হয়ে মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে চার নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। এর পর থেকে তাঁদের কাউকেই আর কখনো জীবিত অবস্থায় কক্ষের বাইরে হেঁটে বের হতে দেখা যায়নি।

পুলিশের এই তদন্ত প্রতিবেদনে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইতি রানী তাঁর দুই মেয়েকে কোমল পানীয় কিংবা সাধারণ খাওয়ার পানির সঙ্গে ক্ষতিকারক চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে তা পান করানোর মাধ্যমে অচেতন করেন। এরপর তাদের অত্যন্ত নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা নিশ্চিত করার পর তিনি নিজেও ঠিক একই ধরনের চেতনানাশক ওষুধ সেবন করে নিজের জীবন বিসর্জন দেন।

এদিকে পুলিশ কর্তৃক প্রকাশিত এই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের কোনো বিষয়েই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং এই রিপোর্টের ভেতরে ঠিক কী লেখা রয়েছে সে বিষয়েও তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ঋণের বিশাল বোঝার কারণে তাঁর স্ত্রী নিজের দুই সন্তানকে নিজ হাতে হত্যা করতে পারেন না বলে দাবি করে তিনি এই তদন্ত রিপোর্ট পুরোপুরি বর্জন করেন এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।

নিহত নারীর স্বামীর পক্ষ থেকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করার এই বিষয়ের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খান গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁদের তদন্তকারী কর্মকর্তা অনুসন্ধানে যা যা সত্যতা পেয়েছেন, তাঁরা মূলত সেটাই জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন। যেহেতু তারা ইতোমধ্যে চিকিৎসকদের প্রস্তুত করা ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে পেয়েছেন, তাই এখন তারা নিয়ম অনুযায়ী আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করবেন। মামলার বাদী এই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করার প্রসঙ্গে তিনি পরিষ্কার করে জানান যে, এই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন তো পুলিশ তৈরি করেনি, এটি সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল বা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ প্রদান করেছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সঙ্গীর গিল্ট ট্রিপিং থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার উপায়

সঙ্গীর গিল্ট ট্রিপিং থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার উপায়