ঢাকা | বঙ্গাব্দ

হাবিলদার পোশাকে নজরুলের দুর্লভ প্রতিকৃতির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 31, 2026 ইং
হাবিলদার পোশাকে নজরুলের দুর্লভ প্রতিকৃতির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বাংলা আলোকচিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে কাজী নজরুলের হাবিলদার পোশাকের প্রতিকৃতি একটি অত্যন্ত স্মরণীয় স্টুডিও পোর্ট্রেট হিসেবে বিবেচিত। শিল্পমূল্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং প্রতীকী ভাষার দিক থেকে বিচার করলে এই আলোকচিত্রটিকে নির্দ্বিধায় একটি ক্ল্যাসিক সৃষ্টি বলা চলে।

ছবিতে নজরুলের দণ্ডায়মান ভঙ্গিটি শুরুতেই দর্শকের নজর কাড়ে। তিনি সোজা, স্থির ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর শরীরের ওজন এক পায়ে সামান্য একটু স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাঁর বাঁ হাতটি রাখা রয়েছে একটি সৈনিকের হেলমেটের ওপর এবং ডান হাতটি রয়েছে কোমরে। কৃত্রিম স্টুডিওর আঙ্গিকে তৈরি এই ভঙ্গিটির মধ্যেও এক তীব্র আত্মমর্যাদা ও কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটেছে।

সামরিক পোশাকটির গঠনশৈলীও যথেষ্ট লক্ষণীয় বিষয়। পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম, বুকের ওপর দিয়ে যাওয়া তির্যক বেল্ট, হাঁটু পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পট্টি জড়ানো পা এবং ভারী বুট—সব মিলিয়ে তাঁকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক তরুণ হাবিলদার হিসেবে দেখা যায়। তবে তাঁর মুখাবয়বের মধ্যে কোনো ধরনের সামরিক কঠোরতার ছাপ নেই। বরং সেখানে রয়েছে গভীর চিন্তা এবং এক অনন্য কোমলতা, আর এই দ্বৈততাই ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

সেকালের স্টুডিওর আঁকা ব্যাকড্রপ, পাশে কাপড় ঢাকা টেবিল, তার ওপরে রাখা আরেকটি হেলমেট এবং একটি অলংকৃত চেয়ার—এসবই বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের ভারতীয় স্টুডিও আলোকচিত্রের অতি পরিচিত কিছু উপাদান। এগুলোকে নিছক সাজসজ্জা ভাবলে ভুল হবে, কারণ এগুলো আসলে সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব নির্মাণের এক দৃশ্যভাষা।

এই ছবিতে আলো ব্যবহারের পদ্ধতিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আলোকসজ্জা সরাসরি কোনো আলো ফেলেনি, বরং তা ছিল বেশ নরম। এর ফলে কবির মুখে কোনো তীব্র ছায়া পড়েনি। তাঁর চোখের দৃষ্টি ক্যামেরার ঠিক বাইরে নিবদ্ধ রয়েছে। দর্শকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকার পরিবর্তে তিনি যেন অন্য কোথাও বা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। ক্যামেরার লেন্সের বাইরে নিক্ষিপ্ত এই দৃষ্টিই ছবিটিকে যেকোনো সাধারণ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

বর্তমান সময়ে ছবিটির যে রঙিন সংস্করণটি দেখা যায়, সেটি মূলত পরবর্তীকালের রঙায়নের ফসল। সেই কারণে এটি আর আদি ও মূল আলোকচিত্র নয়, বরং একটি পুনর্নির্মিত দৃশ্যরূপ। তা সত্ত্বেও এই রঙের ব্যবহার, বিশেষ করে নীল রঙের পটভূমি, খয়েরি রঙের বুট, ক্রিম রঙের ইউনিফর্ম এবং লাল রঙের বেল্ট পুরো প্রতিকৃতিটির নাটকীয়তা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে যেকোনো ধরনের গবেষণার কাজের জন্য মূল সাদা-কালো প্রিন্টকেই একমাত্র প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা উচিত।

এই বিশেষ প্রতিকৃতির সবচেয়ে গভীর তাত্পর্য লুকিয়ে রয়েছে এর ঐতিহাসিক কালগত অবস্থানের মধ্যে। কারণ, এখানে আমরা যে মানুষটিকে দেখতে পাই, তিনি সেই সময়ে এখনো বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেননি। তখনো তাঁর বিখ্যাত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি এবং রচিত হয়নি কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও। কিন্তু তাঁর মুখাবয়বের ভেতরের অন্তর্লীন তেজ, চোখের দৃষ্টির আত্মবিশ্বাস এবং দেহভঙ্গির দৃঢ়তা যেন ভবিষ্যতের সেই মহান কবিকে আগে থেকেই ঘোষণা করে দিচ্ছিল।

একটিমাত্র ফ্রেমে বন্দি এই ছবিতে মূলত তিনটি ভিন্ন পরিচয় একসঙ্গে মিলিত হয়েছে—একজন সৈনিক, একজন কবি এবং একজন বিদ্রোহী। তাই এই আলোকচিত্রটি কেবল সাধারণ কোনো প্রতিকৃতি নয়; এটি একজন মানুষের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণের অত্যন্ত দৃশ্যমান একটি দলিল।

বাংলা আলোকচিত্রের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই দুর্লভ ছবিটির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনো সম্পন্ন হয়নি। আলোকগ্রাহকের সঠিক পরিচয়, স্টুডিওর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, নেগেটিভের আসল উত্স, প্রথম প্রকাশ কোথায় হয়েছিল, বিভিন্ন সংস্করণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং পরবর্তীকালের রঙায়নের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা চালানো অত্যন্ত জরুরি। সেই কাঙ্ক্ষিত গবেষণা সম্পন্ন হলে এই আলোকচিত্র কেবল নজরুল-গবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ঔপনিবেশিক আমলের ভারতীয় স্টুডিও আলোকচিত্রের সামগ্রিক ইতিহাসেও একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করবে।

আজও যখন কোনো সাধারণ মানুষ এই ঐতিহাসিক প্রতিকৃতির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন অবধারितভাবেই মনে হয়—ক্যামেরার সামনে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণ সৈনিক কেবল একটি ছবি তোলার জন্যই পোজ দেননি; তিনি যেন স্বয়ং ইতিহাসের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাকে অপেক্ষায় থাকতে বলে গেছেন। তাঁর শরীর দৃশ্যমানভাবে স্থির হলেও, তাঁর উপস্থিতি আজও সমানভাবে গতিশীল। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, তিনি প্রয়াত হয়েও আজও সরব।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নতুন পে-স্কেলে বেতন পেলেন সরকারি চাকরিজীবীরা, বঞ্চিত প্রায় ল

নতুন পে-স্কেলে বেতন পেলেন সরকারি চাকরিজীবীরা, বঞ্চিত প্রায় ল