নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উচ্চ ইমারত আর প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের সমান্তরালে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে শিশুদের খেলার পরিধি, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও উন্মুক্ত উঠান। এক ছাদের নিচে পাশাপাশি বসবাস করেও প্রতিবেশীদের মাঝে চেনার গণ্ডি তৈরি হচ্ছে না, ফলে আবাসস্থলগুলো কেবল রাত কাটানোর ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। এই আত্মকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক নগরায়ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ মহল মানুষের পারস্পরিক হৃদ্যতা, খেলাধুলার সুযোগ এবং সামাজিক মেলবন্ধনকে প্রাধান্য দেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছেন।
বিদেশি মেগাসিটির অন্ধ অনুকরণ বাদ দিয়ে দেশের নিজস্ব ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে মহাপরিকল্পনা সাজানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আলোচকেরা। উন্নয়নের পরিমাপ কেবল কংক্রিটের উচ্চতা কিংবা মেগা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার না করে, সেখানে বসবাসকারী মানুষ কতটা নিরাপদে ও সামাজিকভাবে যুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন, তা মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্ব শহর দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক ভার্চুয়াল সেমিনারে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে আসে। উক্ত আয়োজনের মূল বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছিল দেশের নগরায়ণ রূপরেখা ও এর সার্বিক উন্নয়ন দর্শন কেন্দ্র করে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থার গ্রামীণ পাড়া, জলাশয়, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ ছিল। এসব স্থান কেবল বসবাসের পরিবেশ বা প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যম ছিল না, বরং পারস্পরিক চেনাজানা, সামাজিক বন্ধন ও শিশুদের ক্রীড়ার প্রধান ক্ষেত্র ছিল। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে জলাভূমি ভরাট ও সীমানা প্রাচীরের কবলে পড়ে সেই সোনালী সুযোগগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
আদিল মুহাম্মদ খান আরও উল্লেখ করেন, আমাদের কাঠামোগত উন্নয়ন নীতি অবশ্যই দেশের মাটি, জল, জনপদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রকৃত প্রবৃদ্ধি মানে কেবল আকাশচুম্বী টাওয়ার নির্মাণ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক অস্তিত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করা।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই বিচ্ছিন্ন আবাসন গড়ে উঠলে নাগরিক সমাজের ভেতরের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে চারদেয়ালে ঘেরা বিশেষ কমপ্লেক্সগুলো শ্রেণিভিত্তিক দূরত্ব বাড়িয়ে দেয় এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগগুলো সংকুচিত করে ফেলে।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠের অনুপস্থিতি কচি প্রাণের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে। তাদের জগৎ যদি কেবল গৃহকোণ, শিক্ষালয় আর মোবাইল বা টিভির পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে নেতৃত্ব, দলগত কাজ কিংবা বিরোধ মেটানোর মতো গুণগুলো আর বিকশিত হবে না।
এই নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী পুকুর, উঠান এবং মহল্লাভিত্তিক জনপদ গড়ে তোলার আইডিয়াকে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে আইপিডি। যেখানে জলাশয়গুলো জলবায়ু রক্ষা ও পানি নিষ্কাশনের ভূমিকা রাখবে এবং উঠানগুলো হবে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ পরিষ্কার ভাষায় জানান, শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বড় দালানকোঠা তৈরি করলেই তাকে নগরায়ণ বলা যায় না। বরং দেশের প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার, সুস্বাস্থ্য ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার প্রাপ্যতা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
বিআইপি প্রধান মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম যোগ করেন যে, সঠিক দর্শনের জায়গায় এখন ব্যবসায়িক লোভ ও গোষ্ঠীতন্ত্র শহরের রূপরেখা নিয়ন্ত্রণ করছে। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি আকৃতির জনপদেও এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আবাসিক এলাকাগুলো কেবল রাতের ঘুমটুকুর নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তি পেতে খাল, পুকুর ও জলাভূমির কঠোর আইনি হেফাজত নিশ্চিত করার জোরালো সুপারিশ জানিয়েছে আইপিডি। একই সঙ্গে এই সম্পদগুলো রক্ষার্থে স্থানীয় পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
নতুন সব আবাসন প্রকল্পে অবশ্যই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, হাঁটার রাস্তা ও সামাজিক বসার জায়গা রাখতে হবে এবং পুরোনো এলাকাগুলোতেও এই নাগরিক সুবিধাগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত জায়গার ঘাটতির হিসাব কষে সব শ্রেণির মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
শিশু ও কিশোরদের নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষালয়, অভিভাবক মহল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। উক্ত ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষক, শিক্ষক ও প্রকৌশলীরা অংশ নিয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর