ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইউক্রেন খাদ্যপথের অবরোধে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 30, 2026 ইং
ইউক্রেন খাদ্যপথের অবরোধে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বৈশ্বিক জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যখন অনাহার ও খাদ্য সংকটের মুখোমুখি, তখন খাদ্যশস্য পরিবহনের প্রধান আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে নতুন করে হামলা চলছে। ইউক্রেনীয় কৃষিপণ্য বহির্বিশ্বে পাঠানোর জন্য কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী এবং স্থলপথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এসব রুট বরাবর সরবরাহ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে মস্কো। দেশটির বিভিন্ন শস্যবন্দর, গুদামঘর, অভ্যন্তরীণ পরিবহন মাধ্যম, পণ্যবাহী জলযান এবং কৃষি সংক্রান্ত অবকাঠামো নিশানা করে পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এর সরাসরি পরিণতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থায় জ্বালানি, সার ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এটি কেবল একটি কৌশলগত সংঘাত নয়, বরং এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট। ইউক্রেনীয় অঞ্চল থেকে শস্য ও খাদ্যপণ্য সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলেছে দুর্বল অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোকে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে ফসল তোলার মৌসুম শুরু হওয়ার পরও রুটগুলোতে হামলার কারণে লাখ লাখ টন শস্য, তৈলবীজ এবং কৃষিজাত পণ্য দেশের ভেতরেই আটকা পড়ে রয়েছে।

গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় বর্তমান বছরের আগস্ট মাসে দেশটির কৃষিপণ্য রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিমধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে ইউক্রেনে খাদ্যপণ্য গুদামজাত করার জায়গার তীব্র আকাল দেখা দিতে পারে। পরবর্তী মাস অর্থাৎ নভেম্বর নাগাদ বিভিন্ন কৃষিপণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সংরক্ষণের অভাব এবং রুট বন্ধ থাকায় লাখ লাখ মানুষের খাদ্য জোগানের শস্য বাইরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে না পারলে আগামী মৌসুমে বীজ কেনার জন্য তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে না, যার ফলে ভবিষ্যতের উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং এই সংকট আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

মস্কো যদি আগ্রাসন থামিয়ে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জীবনরেখার ওপর আক্রমণ বন্ধ করে, তবে তার সুফল ইউরোপের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সুদূরপ্রসারী হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সুফল প্রত্যক্ষ করবে বাংলাদেশও, কারণ এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা কেবল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়, বরং সামুদ্রিক রুটে নিরাপদ খাদ্য আমদানির সক্ষমতার ওপরও গভীরভাবে আবর্তিত হয়।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজ ক্ষুধার জ্বালায় ধুঁকছে, যা এই সংকটের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, জ্বালানির বাজার এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে তার ধাক্কা সংঘাতের সীমানা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা। যাদের খাদ্য সংগ্রহ করার এবং মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর অর্থনৈতিক সামর্থ্য সবচেয়ে কম, তারাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের এই সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতি অত্যন্ত সতর্ক নজর রাখা আবশ্যক। আমাদের দেশে গম অন্যতম প্রধান এবং দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত খাদ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানকার মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি গম ও তৎসংশ্লিষ্ট খাবার আমদানির ওপর নির্ভর করে মেটাতে হয় বাংলাদেশকে।

আমদানির এই উচ্চ হার বাংলাদেশকে সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে যখনই বিশ্বের প্রধান গম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে বিঘ্ন ঘটে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথগুলো অস্থির হয়ে ওঠে। এটি কোনো কাল্পনিক শঙ্কা নয়, বরং কয়েক বছর আগে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর বাংলাদেশ সরাসরি এই ধাক্কা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গম আমদানির খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশের বাজারে গমজাত পণ্যের মূল্যও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অনড় থাকে।

রুশ কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই এই কৌশলগত বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। কিয়েভের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে খাদ্যসংকটকে যুদ্ধের একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা তাদের বৃহত্তর কৌশলের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ। রপ্তানি পথগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে তারা কেবল প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে না, বরং খাদ্যকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির হাতিয়ার বানালে বিশ্ব সমাজ কতটুকু চাপ সহ্য করতে পারে, তা নিয়েও পরীক্ষা চালাচ্ছে। এই মারাত্মক ক্ষতির শিকার হওয়া দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে ইউক্রেনীয় ভূমিকার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে মোট ভুট্টা সরবরাহের ১৫ শতাংশ, গম সরবরাহের ১০ শতাংশ, যব সরবরাহের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেল সরবরাহের পুরোটাই আসত ইউক্রেন থেকে। এশিয়ার বাজারেও তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। চলতি বছরেও সেখানে আশাব্যঞ্জক ফলনের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে শুধু ফসল উৎপাদন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না, যদি না সেই উৎপাদিত খাদ্য নির্দিষ্ট বন্দর, জলযান ও রুট পেরিয়ে প্রকৃত ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে নিরাপদে পৌঁছাতে পারে।

ইউক্রেনের রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন উদ্যোগ বর্তমানে কিছু বিকল্প পথ সৃষ্টি করেছে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করছে। যদিও স্থল ও নদীপথের এই বিকল্পগুলো আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে, তবুও বৈশ্বিক বাজারের বিশাল চাহিদা মেটানোর জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় অবাধে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা তাই বৈগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি, যা বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্য অবাধ, উন্মুক্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখা কোনো অবাস্তব ধারণা নয়, বরং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত অবস্থান নেওয়া এখানে আবশ্যক। এই কারণেই কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে শস্য রপ্তানির সঙ্গে জড়িত স্থাপনা, অবকাঠামো ও বেসামরিক জলযানে সব ধরনের হামলা অবিলম্বে স্থগিত রাখার দাবি জানানো হচ্ছে। এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষা দেবে, আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক সরকারগুলোকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ করে দেবে।

বিশ্ব মানবতাকে কোনো অবস্থাতেই খাদ্যকে যুদ্ধের দ্বিতীয় কোনো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। ইউক্রেনীয় জনগণের নিত্যদিনের এই সীমাহীন দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে এবং বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নির্ভরশীল খাদ্যব্যবস্থায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।

মস্কো যদি সংঘাত পরিহার করে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জীবনরেখায় আঘাত হানা বন্ধ করে, তবে তার সুফল ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং বাংলাদেশও তার ইতিবাচক সুফল ভোগ করবে।

এই যৌথ বিবৃতিটি বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেনের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
চোর চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচ গ্রেপ্তার, উদ্ধার ১৪ মোটরসাইকেল

চোর চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচ গ্রেপ্তার, উদ্ধার ১৪ মোটরসাইকেল