নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, রুশ তেল কেনা নিয়ে শুল্কের চাপ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দুই মিত্রের মধ্যে বর্তমানে প্রবল অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নতুন মোড় আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে টেক্সাসের হিউস্টনের একটি স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে সময় ৫০ হাজারের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকের উপস্থিতিতে মোদি বলেছিলেন, ট্রাম্পকে তাঁর সবসময় উষ্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ, সহজে কাছে টানা যায়, প্রাণবন্ত এবং রসবোধে ভরপুর এক মানুষ বলে মনে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী প্রবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সমর্থন ট্রাম্পের পক্ষে জোগাড় করার ক্ষেত্রে মোদি তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই নির্বাচনী প্রচারের সময় মোদি একটি জনপ্রিয় হিন্দি স্লোগান ধার করে বলেছিলেন, ‘আব কি বার, ট্রাম্প সরকার!’, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘এবার ট্রাম্প সরকার’। তবে এত কিছুর পরেও সেবার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করতে পারেননি।
আজ থেকে সাত বছর পরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা এবং জটিল হয়ে উঠেছে। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অত্যন্ত কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে কংগ্রেসে তাঁর দলের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে তাঁর সামগ্রিক আইন প্রণয়নের পরিকল্পনাও ভবিষ্যতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে বর্তমান নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের বাস্তব সমীকরণ একদম বিপরীত রূপ ধারণ করেছে। ভারত এখন আর আগের মতো ট্রাম্পের প্রতি কোনো প্রকাশ্য সমর্থন জানাচ্ছে না; বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একের পর এক ফাটল ও ধাক্কার জেরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্মকর্তারা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সরব হয়ে উঠেছেন।
বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সুনির্দিষ্ট ধারণা হলো, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল যদি আসন হারিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে, তবে মোদি সরকার তাতে মোটেও অসন্তুষ্ট হবে না, বরং বেশ স্বস্তিই অনুভব করবে। ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনে মার্কিন দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেই ভারত দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিক সমর্থন লাভ করে আসছে।
তা সত্ত্বেও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক মহল ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্টরা ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তি বোধ করে থাকে। স্নায়ুযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের কার্যকালে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে গতিশীলতা ও উষ্ণতা ফিরে এসেছিল।
মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্কের কারণে বিগত কয়েক দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাস ও দূরত্ব বজায় ছিল, তা কাটিয়ে একটি নতুন সম্পর্ক পুনর্গঠনের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেই সময়ে। এরপর ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যকার সময়সীমায় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সম্পাদিত হয়।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে সই না করা সত্ত্বেও ভারত এই চুক্তির সুবাদে বৈশ্বিক পরমাণু প্রযুক্তি ও জ্বালানি ব্যবহারের দুর্লভ সুযোগ লাভ করে। বুশ প্রশাসনের সেই আমলে দুই দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক উড়োজাহাজকে ভারতের সামরিক ঘাঁটিতে জ্বালানি সংগ্রহসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ ও সরবরাহ সুবিধা ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত হয়।
এর বিপরীতে ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্টদের মার্কিন প্রশাসনকে ভারত বরাবরই নিজেদের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে অনেক বেশি সমালোচনামুখর ও কঠোর বলে মনে করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের শাসনামলেও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ভারতের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সেই ধারাবাহিকতা সাফল্যের সঙ্গেই বজায় থাকবে বলে সবার মনে দৃঢ় ধারণা জন্মেছিল।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা ও উষ্ণতা ছিল সর্বজনবিদিত, এমনকি ট্রাম্পকে মোদি স্বয়ং ‘হোয়াইট হাউসে ভারতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারতের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই প্রশাসন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও ভিন্ন চরিত্রের বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
পরিস্থিতি এতটাই পাল্টে গেছে যে ভারত তাদের দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত কূটনৈতিক চর্চা থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। সাধারণত বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো দেশের সঙ্গে মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো অত্যন্ত নীরবে এবং পর্দার আড়ালে বসে আলোচনা করে সমাধান করাই ছিল ভারতের দীর্ঘদিনের চিরাচরিত চর্চা ও কূটনীতির মূল নীতি।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে চলমান নানা বিষয়ে চরম টানাপোড়েনের কারণে এবার হোয়াইট হাউসের আচরণের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে প্রকাশ্যেই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে নয়াদিল্লি। গত মাসে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কে নিজেদের অত্যন্ত সরাসরি ও স্পষ্ট মূল্যায়ন সবার সামনে তুলে ধরেন।
সে সময় এস জয়শঙ্কর অভিযোগ করে বলেন যে, ‘সন্ত্রাসবাদ’ সম্পর্কিত ভারতের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই সংবেদনশীল আচরণ প্রদর্শন করেনি। পাশাপাশি ভারতের দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গেই তারা ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে চলেছে এবং নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক একচেটিয়া বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করে চলেছে, যার নেতিবাচক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর পড়ছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেদিনের বক্তব্যে আরও যোগ করে বলেন যে, বিভিন্ন দেশের পক্ষে এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়া কোনোভাবেই উচিত নয় যে তারা সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে একটি আলাদা জগতে বসবাস করবে, নিজেদের ইচ্ছামতো সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবে এবং বলবে যে অন্য কারো জীবন কঠিন করে তোলা তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। দুই দেশের রাজধানী নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের পারস্পরিক সম্পর্কের বড় বিরোধের অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বর্তমান অনিশ্চয়তা।
এই বহুল প্রত্যাশিত বাণিজ্যচুক্তিটি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হলে ট্রাম্পের কড়া শুল্কনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশগুলোর তালিকায় থাকা ভারত কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। চলতি মাসের একেবারে শুরুর দিকে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন যে, বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা এমন একটি জটিল পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে কোনো পক্ষকেই আর নতুন করে কোনো ছাড় দেওয়া বা নেওয়া—দুটি কাজই অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’র পক্ষ থেকেও প্রায় নিয়মিতভাবেই ভারতীয় নাগরিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হচ্ছে। জোরালো অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এইচ-১বি ভিসার মতো বিশেষ কর্মসূচির মারফত মার্কিন নাগরিকদের বৈধ চাকরি কেড়ে নিচ্ছেন এই অভিবাসীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভারতবিরোধী নানা বক্তব্য ও প্রচার এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই ট্রাম্প যখন অনেক অনথিভুক্ত ভারতীয় অভিবাসীকে হাতকড়া ও লোহার শিকল পরিয়ে অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠান, তখন সেই দৃশ্য ভারতে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মর্যাদাবান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির বিজ্ঞ পরিচালক মিলান বৈষ্ণব এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রশাসনের সঙ্গেই সত্যিকারের কোনো নীতিগত মতপার্থক্য ভারত সরকার বরাবরই স্বাভাবিকভাবে সহ্য করতে পারে।
তবে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান এই মার্কিন প্রশাসন এবং তাদের দলীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্রভাবশালী মিত্রের কাছ থেকে ভারত ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত যেসব আক্রমণ চালানো হচ্ছে, তা সরাসরি তাদের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করেছে। মিলান বৈষ্ণবসহ আরও বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এমন কঠোর সমালোচনা করা হলেও সামগ্রিক এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে মোদি সরকার যথেষ্ট ‘প্রশংসনীয় সংযম’ প্রদর্শন করে চলেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর