নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
পর্দায় যারা দর্শকদের হরর বা ভৌতিক গল্পের মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করেন, কখনো ভ্যাম্পায়ার, কখনো দানব কিংবা অশরীরী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেন, সেই অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতাদের জীবনেই বহুবার ঘটে গেছে বাস্তব জীবনের এমন সব ঘটনা যা তাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। কাহিনীর খাতিরে তৈরি করা ভুতুড়ে পরিবেশের বাইরে গিয়ে শুটিংয়ের বাস্তব ময়দানে কখনো হঠাৎ করেই নজরে এসেছে কোনো অচেনা মানুষের রহস্যময় উপস্থিতি, কখনো নিজে থেকেই স্তব্ধ হয়ে গেছে ঘড়ি, আবার কখনো শুটিংয়ের নির্দিষ্ট লোকেশন থেকে ভেসে এসেছে কোনো অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক শব্দ। হ্যালোইন উৎসবের এই বিশেষ মুহূর্তটিতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক পর্দার পেছনের এমন কিছু গা ছমছমে ও রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার পাতায়।
জনপ্রিয় নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ এর সুবাদে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া অভিনেতা ফিন উলফহার্ড ২০১৭ সালে কানাডার টরন্টোর একটি প্রাচীন ও জীর্ণ বাড়িতে অংশ নিয়েছিলেন ‘ইট’ নামক হরর সিনেমার শুটিংয়ে, যেখানেই তার মুখোমুখি হয়েছিল এক অজানা রহস্য। ফিনের নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী, একদিন শুটিংয়ের বিরতির সময়ে তিনি এবং তার বেশ কজন সহশিল্পী মিলে ওই বাড়িটির ওপরের তলায় কৌতূহলবশত ঘুরে বেড়াতে যান এবং সেখানে একটি কক্ষের ভেতরে কালো রঙের পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তিকে অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে বৈদ্যুতিক কাজ করতে দেখতে পান। প্রথমাবস্থায় তারা ভেবেছিলেন যে এই মানুষটি সম্ভবত তাদের শুটিং ইউনিটেরই কোনো কর্মী হবেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পেরেছিলেন যে পুরো দলের কেউই ওই ব্যক্তিকে চেনেন না এবং তার পর থেকে তাকে আর ককখনোই সেখানে দেখা যায়নি। যদিও অভিনেতা নিজেই পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে কেউ হয়তো তাদের সঙ্গে নিছক কোনো মজার ছলে এমনটা করে থাকতে পারেন, তবুও সেই মুহূর্তের আকস্মিকতা তার মনে এক দারুণ অস্বস্তি ও ভীতির জন্ম দিয়েছিল।
বাস্তব জীবনের অতিপ্রাকৃত ঘটনা অনুসন্ধানকারী দুই চরিত্র এড ও লরেইন ওয়ারেনের খ্যাতি বিশ্বজোড়া, যাদের মধ্যে এড ওয়ারেনের চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত হয়েছেন প্যাট্রিক উইলসন। ২০১৬ সালে ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যাট্রিক স্মৃতিচারণা করে জানিয়েছিলেন যে ‘দ্য কনজ্যুরিং’ সিনেমার প্রথম কিস্তির শুটিং চলাকালে তিনি শিশুশিল্পী জোয়ি কিংয়ের শরীরে একাধিক রহস্যময় কালশিটে দাগ লক্ষ্য করেছিলেন, অথচ সেই ছোট্ট মেয়েটি কোনো ধরনের স্টান্টের সঙ্গে যুক্ত ছিল না এবং তার কোথাও আঘাত পাওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পর্দার চিত্রনাট্যেও ঠিক হুবহু এমন ধরনের রহস্যময় কালশিটে দাগের উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বলে অভিনেতার কাছে এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর, তবে তিনি এও জানান যে শুটিংয়ের একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে সেই দাগগুলো নিজ থেকেই মিলিয়ে গিয়েছিল এবং এর নেপথ্য কারণ আজও এক রহস্য।
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হরর জনরার অন্যতম প্রধান মাইলফলক হলো ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য এক্সরসিস্ট’ সিনেমাটি, যার নির্মাণকাজ ও শুটিং ঘিরে বহু রোমহর্ষক ও রহস্যময় জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। ছবিটির পরিচালক উইলিয়াম ফ্রিডকিন ১৯৮৫ সালের একটি সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে জানান যে ক্যামেরা চালুর সময় সেটে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল এবং একপর্যায়ে সেখানে আকস্মিক আগুন ধরে গিয়ে তিনতলা বাড়ির আদলে নিখুঁতভাবে তৈরি করা বিশাল সেটটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। সেই বিধ্বংসী আগুনের প্রকৃত উৎস বা কারণ শেষ পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে বাধ্য হয়েই প্রায় টানা তিন মাস শুটিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে একটি অসহায় কবুতরের সেটের কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খাওয়ার বিষয়টি নানা মহলে বেশ জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছিল।
‘অ্যানাবেল কামস হোম’ চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী ম্যাডিসন আইসম্যান শুটিং ফ্লোরে পা রাখার পর থেকেই বেশ কিছু অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। ম্যাডিসন জানিয়েছেন যে শুটিংয়ের সময় একদিন রাতের বেলা ইউনিটের কাস্ট ও ক্রুরা আগের ‘দ্য কনজ্যুরিং’ সিনেমার শুটিংয়ের নানা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার গল্প করছিলেন, বিশেষ করে প্যাট্রিক উইলসন ও ভেরা ফার্মিগার শুটিংয়ের সময় বারবার রাত ৩টা ১৫ মিনিটে ঘড়ি থেমে যাওয়ার ঘটনাটি তাকে মানসিকভাবে বেশ নাড়া দিয়েছিল। এরপর নিজের শুটিং চলাকালেই তিনি খেয়াল করেন যে কখনো তার ড্রেসিংরুমের বাতি জ্বলছে না তো কখনো আবার মুঠোফোনে কোনো সিগন্যাল বা নেটওয়ার্কই পাওয়া যাচ্ছে না। একটি বিশেষ দৃশ্যের ধারণের সময় তিনি ও সহশিল্পী ম্যাকেনা গ্রেস যখন সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ওপরে উঠছিলেন, তখন তারা বারবার তিনটি করে টোকা পড়ার শব্দ শুনতে পান, যদিও অভিনেত্রী মনে করেন যে সেটের ভৌত কাঠামো থেকেও এমন শব্দ হওয়া অসম্ভব নয়, তবুও রাতের ওই নিস্তব্ধতায় ঘটনাগুলো তাদের মনে দারুণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল।
বলিউডের জনপ্রিয় হরর–কমেডি ঘরানার সিনেমা ‘স্ত্রী’র শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা রাজকুমার রাওকে বাস্তবের মাটিতেই রীতিমতো আতঙ্কিত হতে হয়েছিল। ২০১৮ সালে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে ছবিটির বেশ কিছু দৃশ্যের ধারণ করা হয়েছিল স্থানীয়ভাবে ভৌতিক বলে পরিচিত এক জায়গায়, যা ছিল ভোপালের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। সন্ধ্যার পর সেখানে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে নানা ধরনের ভৌতিক লোককথা শুনেছিলেন কলাকুশলীরা এবং শুটিংয়ের আগে তাঁদের বেশ কিছু কড়া সতর্কতা যেমন সুগন্ধি ব্যবহার না করা, নারীদের চুল খোলা না রাখা এবং ভুলেও একা বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে এক রাতে শুটিং চলাকালীন ওপরের ছাদ থেকে দলের একজন লাইটম্যান নিচে পড়ে যান এবং আহত অবস্থায় তিনি দাবি করেন যে অদৃশ্য কেউ তাকে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো শুটিং টিমের ভেতরে এক আতঙ্কজনক পরিবেশ তৈরি করে এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
‘দ্য কনজ্যুরিং: লাস্ট রাইটস’ ছবির পরিচালক মাইকেল শ্যাভেজও তার শুটিং জীবনের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি জানান যে লন্ডনে সিনেমাটির প্রি-প্রোডাকশনের কাজ চালানোর সময় তিনি পরিবারকে নিয়ে শতবর্ষ পুরনো একটি বাড়িতে বসবাস করছিলেন যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত ভূতুড়ে হিসেবে পরিচিত ছিল। একদিন মাইকেলের ছোট মেয়ে করিডরের মধ্যে কোনো এক ছায়ামূর্তিকে দেখতে পাওয়ার কথা জানালেও প্রথমে তিনি তাতে খুব একটা কান দেননি, কিন্তু পরবর্তীতে এক রাতে বাড়িতে সম্পূর্ণ একা থাকার সময় তিনি স্পষ্টভাবে দুজন পুরুষের কথোপকথনের শব্দ শুনতে পান। তক্ষণাৎ টেলিভিশন বন্ধ করে তিনি বাড়ির প্রতিটি ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো মানুষের অস্তিত্ব পাননি, যা তার জীবনের অন্যতম এক ভীতিকর অভিজ্ঞতা হিসেবে চিরকাল মনে থাকবে।
আসন্ন হরর সিনেমা ‘প্যাসেঞ্জার’–এর শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে অভিনেতা জ্যাকব স্কিপিও জানিয়েছেন যে চিত্রগ্রহণ চলাকালীন এমন কিছু ঘটনার অবতারণা হয়েছিল যার কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা আজও তার কাছে নেই। শুটিংয়ের পুরো পরিবেশজুড়ে তার কাছে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক অদৃশ্য ও অশুভ শক্তির উপস্থিতি বিরাজ করছে, যার কারণে তিনি কাজ শুরুর আগেই প্রযোজকপক্ষের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন একজন পুরোহিত ডেকে সেটে পবিত্র পানি ছিটিয়ে পুরো এলাকা আশীর্বাদ করিয়ে নেওয়ার জন্য। তার মতে, এ ধরনের গভীর ভৌতিক ও রহস্যময় বিষয় নিয়ে কাজ করার সময় মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে এবং পজিটিভ শক্তি বজায় রাখতে এই ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর