নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভৌতিক ঘরানার গল্প এবং গা ছমছমে আবহ ছাড়া হ্যালোইন উৎসবের আমেজ যেন পূর্ণতা পায় না। অতিপ্রাকৃত ঘটনা, গা শিউরে ওঠা আতঙ্ক, রহস্যঘেরা বাড়ি কিংবা কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের নির্মম আক্রমণ—সব ধরনের দর্শকের পছন্দকে মাথায় রেখে বিভিন্ন থ্রিলার ও ভৌতিক ছবির আয়োজন রয়েছে। আর এই বিশেষ উৎসবটি উপলক্ষ করে নেটফ্লিক্সে উপভোগ করা যায় এমন চমৎকার ১০টি ভৌতিক চলচ্চিত্রের একটি আকর্ষণীয় তালিকা প্রকাশ করেছে স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ফোর্বস। ঘরে বসেই যেকোনো সময় এই সিনেমাগুলো দেখে নিতে পারেন হররপ্রেমীরা।
মনস্তাত্ত্বিক হরর ঘরানার চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্মাণ হলো ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্ল্যাসিক ছবি ‘সাইকো’। এই গল্পের মূল চরিত্র মেরিয়ন ক্রেন নামের এক নারী, যিনি কোনো এক কারণে পালিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে সম্পূর্ণ নির্জন একটি মোটেলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেই মোটেলটির মালিক নরম্যান বেটস প্রথম দেখায় খুব নিরীহ মানুষ বলে মনে হলেও, তার অদ্ভুত আচরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলে ধীরে ধীরে চরম অস্বাভাবিকতা ধরা পড়তে থাকে। এরপর থেকেই সেখানে একের পর এক রহস্যময় ও রোমহর্ষক ঘটনা ঘটতে শুরু করে।
বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচককের সুনিপুণ নির্মাণশৈলী, কাহিনীর অপ্রত্যাশিত সব মোড় এবং গোসলের ঘরের সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি এই সিনেমাটিকে চিরকালের মতো কালজয়ী করে তুলেছে। ছবিটি বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এর রোমাঞ্চের মাত্রা এতটুকু কমেনি এবং আজও এটি দর্শকদের সমানভাবে শিহরিত করে।
ভয়ংকর ও নির্জন কোনো কেবিনে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে ২০১৩ সালে নির্মিত হয়েছে ‘ইভিল ডেড’ নামের জনপ্রিয় ছবিটি, যার কেন্দ্রে রয়েছে পাঁচ জন বন্ধু। গভীর বনের ভেতরের সেই কাঠুরে বাড়িতে সময় কাটাতে গিয়ে তারা ঘটনাক্রমে একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় প্রাচীন বই খুঁজে পায়। না বুঝে সেই ভয়ংকর বইটি পড়ার মাধ্যমেই তারা অজান্তেই ডেকে আনে এক সর্বনাশা অশুভ শক্তিকে। এরপরেই শুরু হয় তাদের জীবনে টিকে থাকার কঠিনতম লড়াই।
বিখ্যাত নির্মাতা স্যাম রেইমির ১৯৮১ সালের কাল্ট ক্ল্যাসিক ছবি ‘ইভিল ডেড’-এর আদলেই আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুনভাবে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রচুর পরিমাণে রক্তাক্ত দৃশ্য, অত্যন্ত নিখুঁত অথচ ভয়ংকর মেকআপ এবং অতিপ্রাকৃত নানা আতঙ্কের উপস্থিতি থাকার কারণে হরর ঘরানার সিনেমা পছন্দ করেন এমন দর্শকদের জন্য এটি বেশ উপভোগ্য একটি অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
বনের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্জন একটি বাড়িতে সম্পূর্ণ একা বসবাস করেন ম্যাডি নামের এক বধির নারী, যিনি পেশায় একজন লেখক। একদিন হঠাৎ করেই এক মুখোশ পরা নির্মম হত্যাকারী তাঁকে নিজেদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ফেলে। নিজে কথা বলতে না পারার অক্ষমতা এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম না থাকার কারণে ভুক্তভোগীর চারপাশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও বহুগুণ বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
সিনেমাজুড়ে সংলাপের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত রাখা সত্ত্বেও পরিচালক যে কীভাবে দর্শকের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পেরেছেন, তার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হলো এই হাশ ছবিটি। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে টানটান উত্তেজনা সফলভাবে ধরে রেখেছেন মেধাবী পরিচালক মাইক ফ্লানাগান।
ব্রুস উইলিস এই চলচিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যালকম ক্রো নামক একজন নিবেদিতপ্রাণ শিশু মনোবিজ্ঞানীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে। তাঁর কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে আসে কোল সিয়ার নামের অত্যন্ত সংবেদনশীল এক বালক, যে দাবি করে সে নাকি খালি চোখে মৃত মানুষের অবাধ উপস্থিতি দেখতে পায়। প্রথমে কথাটি অবাস্তব ও ভিত্তিহীন মনে করে বিশ্বাস না করলেও, ধীরে ধীরে মনোবিজ্ঞানী ম্যালকম উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে ছেলেটির এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর সত্য।
ভৌতিক আবহ সৃষ্টির পাশাপাশি আবেগ ও গভীর রহস্যের এক অপূর্ব মিশ্রণে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে, যার একেবারে শেষের অপ্রত্যাশিত চমক চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। হ্যালোইনের ছুটির দিনে একা দেখার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি দুর্দান্ত সিনেমা, যা পরিচালনা করেছেন বিশিষ্ট নির্মাতা এম নাইট শ্যামলন।
ডেভিড ব্রুকনারের পরিচালনায় ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচিত্রটির কাহিনী এগিয়েছে চারজন পুরনো বন্ধুকে ঘিরে। তাঁরা সবাই মিলে সুইডেনের এক দুর্গম বনের গভীরে হাইকিং করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু একপর্যায়ে পথ হারিয়ে তাঁরা এমন এক অদ্ভুত বনে গিয়ে আটকে পড়েন, যেখানকার বাতাসে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন ও অত্যন্ত ভয়ংকর কোনো অশুভ শক্তি। সময়ের সাথে সাথে সেই বন্ধুদের চোখের সামনে একের পর এক অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে।
স্ক্যান্ডিনেভীয় প্রাচীন লোককাহিনি, গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক এবং অতিপ্রাকৃত সব রহস্যের সুন্দর এক সমন্বয়ে ছবিটি সাজানো হয়েছে। বনের ভেতরকার গা ছমছমে নিস্তব্ধতা এবং অদৃশ্য কোনো অজানা প্রাণীর উপস্থিতি দর্শকদের ছবির শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী অস্বস্তির মধ্যে ধুঁকতে বাধ্য করে।
এই ছবির মূল আকর্ষণ হলো একটি রহস্যময় ও প্রাচীন আয়না। ভাইবোনের দৃঢ় বিশ্বাস যে, তাদের প্রিয় বাবা ও মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর নেপথ্যে দায়ী একমাত্র এই অভিশপ্ত আয়নাটিই। বহু বছর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তারা দুজনে মিলে সেই আয়নার ভেতরের অশুভ ও অন্ধকার শক্তির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খোঁজার মিশনে নামে। কিন্তু যতই দিন এগোতে থাকে, তাদের বাস্তব জীবন আর কল্পনার সূক্ষ্ম সীমারেখা ধীরে ধীরে একে অপরের সাথে ঝাপসা হয়ে যায়।
পরিচালক মাইক ফ্লানাগানের সুনিপুণ পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অতীতের দুঃখজনক স্মৃতি এবং বর্তমানের বাস্তব ঘটনাগুলো সমান্তরালভাবে পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে। আয়নার অন্তর্নিহিত রহস্য এবং প্রধান চরিত্রগুলোর ভেতরের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব এই ছবিটিকে সম্পূর্ণ অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তীব্র অর্থকষ্টে জর্জরিত এক ভিডিওগ্রাফার জীবিকার তাগিদে অদ্ভুত এক কাজের দায়িত্ব পান। পাহাড়ঘেরা কোনো এক নির্জন কেবিনে গিয়ে তাঁকে মৃত্যুপথযাত্রী একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত কিছু ভিডিও ধারণ করতে হবে। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে তাঁর মক্কেল একেবারেই স্বাভাবিক আচরণ করছেন না। ধীরে ধীরে তিনি এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়েন।
মার্ক ডুপ্লাস অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি মূলত ফাউন্ড-ফুটেজ ধারার একটি চমৎকার ভৌতিক থিলারের উদাহরণ। এটি অত্যন্ত স্বল্প বাজেটে নির্মিত হলেও গল্পের ভেতরের অদ্ভুততা এবং চরিত্রের চরম রহস্যময়তা দর্শকদের চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে। ছবিটির মূল পরিচালক হলেন প্যাট্রিক ব্রাইস।
পপ জগতের পরিচিত তারকা স্কাই রাইলি তাঁর সংগীত জীবনে নতুন করে একটি কনসার্ট সফরের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্যারিয়ারের এই মোড়ে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার মুহূর্তে তাঁকে তাড়া করতে শুরু করে একের পর এক ভয়ংকর কিছু দৃশ্য। অত্যন্ত অদ্ভুত ও কুৎসিত হাসি নিয়ে মানুষের আকস্মিক উপস্থিতি এবং বাস্তব জগতের সঙ্গে অবাস্তবের সীমারেখা গুলিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা তাঁর সমগ্র জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
নাওমি স্কট অভিনীত এবং পার্কার ফিন পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি মূলত ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া আলোচিত ‘স্মাইল’ ছবির একটি সিকুয়েল। গভীর আতঙ্ক এবং সংগীত জগতের ঝলমলে জীবনের অন্তরালে থাকা অন্ধকার দিকগুলোর মেলবন্ধনে এই ছবিটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে।
গ্র্যাবার নামক এক ভয়ংকর মুখোশধারী সিরিয়াল কিলার অত্যন্ত সুকৌশলে অপহরণ করে এক কিশোরকে। তাকে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও শব্দরোধী একটি মাটির নিচের বেজমেন্টে আটকে রাখা হয়, যার ভেতরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন একটা পুরোনো কালো টেলিফোন রাখা আছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই নিষ্ক্রিয় ফোনটি হঠাৎ বেজে উঠলে ছেলেটি রিসিভারের অপর প্রান্তে শুনতে পায় খুনির অতীতের অন্যান্য শিকারদের কণ্ঠস্বর। তারাই মূলত তাকে সেখান থেকে নিরাপদে পালানোর পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করে।
ইথান হক অভিনীত এই সিনেমাটি প্রখ্যাত লেখক জো হিলের লেখা একটি জনপ্রিয় ছোটগল্প অবলম্বনে বড় পর্দায় রূপায়ণ করা হয়েছে। রহস্য, অপরাধের ছাপ এবং অতিপ্রাকৃত আতঙ্কের এক অপূর্ব মিশ্রণে তৈরি এই ছবিটি হ্যালোইনের রাতের উৎসবের জন্য একেবারে উপযোগী। ছবিটির নির্মাতা হলেন স্কট ডেরিকসন।
বিখ্যাত নির্মাতা গিয়ের্মো দেল তোরোর এই চলচ্চিত্রে দেখা যায় যে, এক তরুণ আমেরিকান নারী অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিয়ে করেন এক রহস্যময় ইংরেজ অভিজাত ব্যক্তিকে। পরিণয়ের পর স্বামীর সঙ্গে তিনি পাড়ি জমান স্বামীর আদি পুরুষের পুরোনো সেই পারিবারিক প্রাসাদে। কিন্তু বিশাল বাড়িটির চার দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে অতীতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সব রহস্য।
সেখানে যেমন ক্ষণে ক্ষণে অশরীরী বিভিন্ন শক্তির উপস্থিতি অনুভূত হয়, তেমনি রয়েছে স্বামীর পরিবারের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কলঙ্কিত অতীত। টম হিডলস্টন, মিয়া ওয়াসিকোস্কা এবং জেসিকা চ্যাস্টেইন অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি গতানুগতিক বা প্রচলিত হরর সিনেমার ধরণ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমী। চমৎকার গথিক আবহ, রহস্যে ঘেরা বিশাল প্রাসাদ এবং বিষাদমাখা এক প্রেমের গল্প এই পুরো ছবিটিকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে তুলেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর