নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দীর্ঘ এক বিরতি পেরিয়ে এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে ৫৩ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার মুখ দেখেছেন নীলফামারীর এক নিবেদিতপ্রাণ গৃহবধূ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি জিপিএ–৪.২১ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁর এই অসাধারণ অর্জন কেবল তাঁর নিজের পরিবারকেই আনন্দিত করেনি, বরং যেসব নারী নানা সামাজিক বা পারিবারিক বাস্তবতায় শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন, তাঁদের প্রত্যেকের জন্যই এই ঘটনাটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনকারী এই গৃহবধূর নাম শেফালী বেগম। তিনি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মকছেদুল আলমের সহধর্মিণী। তিনি পড়াশোনার জন্য ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বেছে নিয়েছিলেন এবং ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
শেফালী বেগমের জীবনের শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। ১৯৭৫ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র এগারো মাস, তখন তাঁর বাবা দবির উদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়। এর পর থেকেই বিভিন্ন পারিবারিক সংকট ও জটিলতার আবর্তে পড়ে ১৯৮৮ সালে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর শিক্ষাজীবন থেকে দূরে থাকার পর শেফালী ২০২০ সালে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এরপর ২০২৩ সালে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সাফল্যের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সেবার তাঁর অর্জিত জিপিএ ছিল ৪.২৯। এসএসসি পাসের পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি, বরং একই কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন।
বয়সের ব্যবধান, সুদীর্ঘ শিক্ষাবিরতি এবং সংসারের নানা ব্যস্ততা ও দায়িত্ব—কোনো কিছুই শেফালী বেগমের দৃঢ় মনোবল ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। নিজের জীবনের এই বড় সাফল্যের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় তিনি অতীতে সবসময়ই ভালো ফলাফল করতেন, কিন্তু পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বাস্তব অবস্থার কারণে সেই ধারা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
নিজের ভেতরের সুপ্ত জেদ প্রসঙ্গে শেফালী বেগম আরও উল্লেখ করেন যে পরবর্তী সময়ে যখন তিনি তাঁর ভাগনি এবং নিজের সন্তানদের পড়াশোনা করতে দেখেন, তখন তাঁর নিজের মনের গভীরেও পুনরায় শিক্ষাগ্রহণের তীব্র বাসনা জেগে ওঠে। পরিশেষে স্বামী ও সন্তানদের সার্বিক উৎসাহ এবং আন্তরিক সহযোগিতাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি নতুন উদ্যমে তাঁর অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন পুনরায় শুরু করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেফালী বেগম দৃপ্ত কণ্ঠে জানান যে তিনি উচ্চশিক্ষার পরিসর আরও বাড়াতে চান এবং আইন বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার সুতীব্র ইচ্ছা তাঁর রয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর এই মহৎ ইচ্ছার পেছনে তাঁর সন্তানরাও পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং তারাও ঠিক একই বিষয় চাচ্ছে।
ব্যক্তিগত জীবনে শেফালী বেগম তিন সন্তানের জননী, যাঁদের মধ্যে রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর বড় ছেলে আবদুর রাজ্জাক বিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাঁর ছোট ছেলে আবদুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত রয়েছেন। এ ছাড়া একমাত্র মেয়ে মাকছুরা খানম রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বড় ছেলে আবদুর রাজ্জাক মায়ের এই সুদূরপ্রসারী সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে তাঁদের সকলের ইচ্ছা তাঁদের মা যেন এখানেই পড়ালেখা শেষ করে থেমে না যান, বরং স্নাতকসহ আরও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আরও তথ্য দেন যে তাঁর মা ইতিপূর্বে জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন; তিনি ২০১১ এবং ২০২১ সালে পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এর পাশাপাশি ২০১৫ সালে ডিমলা উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মায়ের এই দারুণ সাফল্য কেবল তাঁদের পারিবারিক গণ্ডিতেই আনন্দ বয়ে আনেনি বলে মন্তব্য করেছেন মেয়ে মাকছুরা খানম। তিনি বলেন যে তাঁর মায়ের এই অভাবনীয় সাফল্য সমাজের সর্বস্তরের নারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রতিটি মানুষের জন্য এক বিশাল প্রেরণার উৎস। তাঁর মা গোটা সমাজের সামনে এটি হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে শিক্ষার আলো অর্জনের ক্ষেত্রে বয়স কখনোই কোনো বাধা হতে পারে না।
স্বামী মকছেদুল আলম জানান যে শেফালী বেগম তাদের পুরো পরিবারের কল্যাণের জন্য অতীতে নিজের বহু ব্যক্তিগত স্বপ্ন স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি আনন্দ প্রকাশ করে বলেন যে দীর্ঘকাল পর তাঁর স্ত্রী নিজের সেই সুপ্ত স্বপ্নটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন—এটাই তাঁদের পরিবারের জন্য সবথেকে বড় আনন্দের বিষয়। তাঁর এই সাফল্যে তারা সবাই অত্যন্ত গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে তারা পরিবারের সবাই তাঁর পাশে থাকবেন।
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আবদুল মান্নান এই অর্জনের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান যে শেফালী বেগমের এই সাফল্য গোটা সমাজের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা বহন করে আনে। তাঁর মতে, নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং মনের ভেতর দৃঢ় মনোবল বজায় থাকলে মানুষের জীবনে বয়সের সীমানা পেরিয়ে যেকোনো বয়সেই সফলতা অর্জন করা পুরোপুরি সম্ভব।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর