ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ঘুমানোর আগে কলা খাওয়ার বিজ্ঞানসম্মত সত্যতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 3, 2026 ইং
ঘুমানোর আগে কলা খাওয়ার বিজ্ঞানসম্মত সত্যতা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ঘুমানোর আগে একটি নির্দিষ্ট ফল খাওয়া নিয়ে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে রাতে কলা খাওয়ার অভ্যাসটি বেশ জনপ্রিয়। অনেকেই মনে করেন যে ঘুমানোর আগে এই ফলটি গ্রহণ করলে রাতে ভালো ঘুম হতে সহায়তা করে। তবে এই ধারণার পেছনের সত্যতা কী এবং এর ফলে ওজন বৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা থাকে কি না, তা নিয়ে পুষ্টিবিদ ও গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

এই ফলটিতে এমন কিছু বিশেষ পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান রয়েছে, যা মানুষের শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি ক্ষুদ্র পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে যে রাতে শোওয়ার আগে এই ফল খাওয়ার পর অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের মানের কিছু উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তা সত্ত্বেও, এটি খেলেই দ্রুত ঘুম চলে আসবে কিংবা অনিদ্রার সমস্যা দূর হয়ে যাবে, এমন চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ফলটিতে থাকা কয়েকটি উপাদান ঘুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। এর মধ্যে ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডটি শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন উৎপাদনে সহায়তা করে। মেলাটোনিন আবার আমাদের ঘুম এবং জেগে ওঠার স্বাভাবিক চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করে। তবে মনে রাখতে হবে যে এই ফলটিতে ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ খুব বেশি মাত্রায় থাকে না।

পাশাপাশি এতে ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম রয়েছে, যা স্নায়ু এবং পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম শরীরের কার্যক্রম ঠিক রাখলেও, এটি খেলে সরাসরি ঘুমের মান উন্নত হবে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত। একইভাবে, পটাশিয়ামের একটি ভালো উৎস হওয়া সত্ত্বেও, পটাশিয়ামসমৃদ্ধ এই ফল খাওয়ার সঙ্গে ভালো ঘুমের সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এ ছাড়া এতে থাকা ভিটামিন বি৬ শরীরকে ট্রিপটোফ্যান থেকে সেরোটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, এর কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার রাতের বেলা ক্ষুধা লাগলে একটি চমৎকার হালকা নাশতা হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরকে শক্তি জোগায় এবং ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে ক্ষুধার কারণে রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা কিছুটা হ্রাস পায়।

ঘুমের ওপর এই ফলের প্রভাব নিয়ে ২০২৪ সালে ‘এশিয়া প্যাসিফিক জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’ নামক প্রকাশনায় একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গবেষণায় অনিদ্রায় ভোগা মোট একুশজন ব্যক্তিকে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই অংশগ্রহণকারীদের তিনটি ভিন্ন দলে বিভক্ত করা হয়েছিল, যার একটি দল ঘুমানোর আগে এই ফল গ্রহণ করেছিল।

অন্য একটি দল নিয়মিত দুধ পান করেছিল এবং তৃতীয় দলটি তাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস কঠোরভাবে বজায় রেখেছিল। দীর্ঘ ছয় সপ্তাহ পর দেখা যায় যে ফল এবং দুধ খাওয়া উভয় দলের অংশগ্রহণকারীরাই জানিয়েছেন যে তাঁদের ঘুমের মান আগের তুলনায় বেশ ভালো হয়েছে। গবেষকদল ঘুমের মান যাচাইয়ের জন্য বিশেষ প্রশ্নমালার পাশাপাশি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমেও অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

তবে এই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে ফল খাওয়া দলটির মোট ঘুমের সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, এমন কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি এই গবেষণাটির নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান ছিল। কারণ এতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র একুশজনে সীমাবদ্ধ ছিল এবং কে কোন দলে থাকবেন, তা দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি।

অতএব, কেবল এই একটিমাত্র সীমিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এই ফলটি খেলে নিশ্চিতভাবেই ভালো ঘুম হয়। তাই রাতে হঠাৎ ক্ষুধা অনুভূত হলে একটি ছোট কিংবা মাঝারি আকারের ফল অনায়াসেই খাওয়া যেতে পারে। কেউ চাইলে ঘুমানোর ঠিক এক থেকে দুই ঘণ্টা আগেও এটি খেতে পারেন, যদিও এই নির্দিষ্ট সময়ে খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার মিলবে, এমন কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার গ্রহণ করলে তা কারও কারও জন্য শারীরিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেকের উচিত নিজের হজমক্ষমতা ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে খাবার গ্রহণের সঠিক সময়টি নিজে থেকেই নির্ধারণ করা।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে রাতে এই ফলটি গ্রহণ করলে শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে কি না। মূলত, শুধু রাতে এই ফল খাওয়ার কারণে কারও ওজন বাড়ে না, কারণ ওজন বৃদ্ধি পাওয়া বা হ্রাস পাওয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় ঠিক কতটুকু ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে তার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ১০৫ ক্যালরি শক্তি, ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং ৩ গ্রাম ফাইবার বা আঁশ থাকে। তবে কলার সুনির্দিষ্ট আকার এবং বিভিন্ন জাতভেদে এর পুষ্টিমানের পরিমাণে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

দিনের অন্যান্য সময়ের মতোই রাতের বেলাতেও পরিমিত পরিমাণে এই ফলটি খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। বিশেষ করে রাতের ভারী খাবারের পর কোনো মিষ্টিজাতীয় খাবারের স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবেও একটি ফল বেছে নেওয়া যেতে পারে।

এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল এবং রাতের বেলা ক্ষুধা পেলে হালকা নাশতা হিসেবে এর জুড়ি মেলা ভার। তবে ভালো ঘুমের জন্য কেবল একটি খাবারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন একই নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া শোবার ঘরটি সবসময় শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক রাখার চেষ্টা করতে হবে।

বিকেল কিংবা সন্ধ্যার পর যেকোনো ধরনের ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় বর্জন করা উচিত। ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মুঠোফোন এবং কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করা একান্ত প্রয়োজন।

যদি নিয়মিতভাবে ঘুমের গুরুতর সমস্যা লেগেই থাকে, তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। পরিশেষে মনে রাখা দরকার যে এই ফলটি একটি স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে, কিন্তু এটি কোনোভাবেই ঘুমের ওষুধ কিংবা তীব্র অনিদ্রার চিকিৎসার সঠিক বিকল্প নয়।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মাগুরায় বাস কাউন্টারে যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্য

মাগুরায় বাস কাউন্টারে যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্য