ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অবসরের পরও মেসির গোল ও অ্যাসিস্ট নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 3, 2026 ইং
অবসরের পরও মেসির গোল ও অ্যাসিস্ট নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গত ৩১ আগস্ট আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার সময় লিওনেল মেসি বলেছিলেন, তাঁর সবটুকু তিনি উজাড় করে দিয়েছেন এবং জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো আর কিছুই তাঁর বাকি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ওই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে সমর্থকেরা গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। সেই বিশেষ মুহূর্তের তীব্রতায় কেউই তখন এই প্রশ্ন তোলেননি যে, মেসির ওই বক্তব্য আদৌ কতটা সত্য ছিল। ফুটবলের আঙিনায় উনচল্লিশ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে, যিনি ফুটবলের প্রায় সমস্ত অর্জনের মালিক হয়েছেন, তাঁর জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে কি না—তা নিয়ে তক্ষণাৎ সংশয় জাগাটাই স্বাভাবিক ছিল। মেসিও মূলত এই সুযোগটাই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, ওই ঘোষণা শোনার ধাক্কায় মানুষ সৌজন্যবশত তাঁর ‘আর দেওয়ার কিছু নেই’ কথাটি যাচাই করার অবকাশ পাবে না। আর এভাবেই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সঙ্গে একধরনের অলিখিত লুকোচুরি খেলা হয়ে গিয়েছিল, যা সহজে কারও নজর এড়িয়ে গেছে।

অবসর ঘোষণার পর ক্লাব ফুটবলে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখার পর একটু আবেগপ্রবণ কোনো আর্জেন্টাইন সমর্থক যদি এমন কিছু ভেবে থাকেন, তবে তাঁকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। গত আগস্টের শেষ দিকে জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ইন্টার মায়ামির জার্সিতে ক্লাব ফুটবলে তিনি ১২ ম্যাচে মাঠে নেমে ৯টি গোল করার পাশাপাশি ৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এর সঙ্গে গত ৭ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর সর্বশেষ ম্যাচটি যদি যুক্ত করা হয়, তবে সব মিলিয়ে হিসাব দাঁড়াচ্ছে ১২ ম্যাচে ৯টি গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর যেকোনো সচেতন মানুষের মনেই এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির কি সত্যিই আর দেওয়ার কিছু অবশিষ্ট ছিল না? অথচ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের আগে ক্লাব ফুটবলে তাঁর সর্বশেষ ১২টি ম্যাচের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, তখন তিনি করেছিলেন ১১টি গোল এবং ৯টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ, জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার আগের এবং পরের পারফরম্যান্সের মধ্যে খুব একটা ব্যবধান বা তারতম্য লক্ষ্য করা যায়নি।

অবশ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে খেলা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের অতি উজ্জ্বল পারফরম্যান্সকে এই হিসাবের বাইরে রাখার পেছনের কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসি যে সবসময় নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দেন এবং অধিকাংশ সময়ই মাঠে দারুণ পারফর্ম করেন, তা এত দিনে ফুটবল বিশ্বের সবারই জানা হয়ে গেছে। সাধারণত খেলোয়াড়েরা জাতীয় দলের হয়ে কত দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের ক্যারিয়ার চালিয়ে যাবেন, সেই সিদ্ধান্তটি তাঁরা সচরাচর ক্লাব ফুটবলের বর্তমান ফর্ম এবং শারীরিক ফিটনেস দেখেই নিয়ে থাকেন। কাতার বিশ্বকাপে আট ম্যাচে আটটি গোল করে মেসি তাঁর দলকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও সেখানে স্পেনের বিপক্ষে তাদের পরাজিত হতে হয়েছিল এবং ফাইনালে স্বয়ং মেসিও নিজের নামের প্রতি পুরোপুরি সুবিচার করতে পারেননি। এর পাশাপাশি তাঁর বাবার প্রয়াণের গভীর শোক—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সি চিরতরে তুলে রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেওয়ার প্রাক্কালে মেসি নিশ্চয়ই তাঁর ব্যক্তিগত ফর্ম এবং শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে একশতে একশ পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন না করলেও মাঠের পরিসংখ্যান তো কখনো মিথ্যা কথা বলতে পারে না।

পরিসংখ্যান মিথ্যা না বললেও, হয়তো মিথ্যা বলতে পারে স্বয়ং মেসির জাদুকরী পা জোড়া এবং তাদের দেওয়া কিছু অদ্ভুত ও কৃত্রিম অজুহাত। এর পেছনে কি খেলাধুলার জগতের সেই চিরন্তন ও ধ্রুব সত্য কথাটি লুকিয়ে আছে? ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের চারের ও পাঁচের দশকের কিংবদন্তি খেলোয়াড় বিজয় মার্চেন্ট এই বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন এভাবে যে, ‘কবে অবসর নেবে, সেই প্রশ্নটি ওঠার আগেই নিজে থেকে সরে দাঁড়াও, যাতে লোকে প্রশ্ন করতে পারে—কেন অবসর নিচ্ছ?’ নিজের পায়ে যথেষ্ট ধার ও শক্তি থাকতে থাকতেই মেসি হয়তো ভেবেছিলেন সময়মতো সরে দাঁড়ানোই শ্রেয়। এরপর যখন সেই পায়ের জাদুকরি ধারে ক্লাব ফুটবলের একের পর এক প্রতিপক্ষ দল কচুকাটা হতে লাগল, তখন বাকি ফুটবল বিশ্ব বিজয় মার্চেন্টের সেই বক্তব্যের শেষের অংশটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করল—‘কেন তিনি এত জলদি অবসর নিলেন?’ আর্জেন্টিনার সামান্য খ্যাপাটে বা দুষ্টু কোনো সমর্থক হয়তো তাই মনে মনে ভাবতেই পারেন যে, নিজের সবটুকু নিংড়ে দেওয়ার পরেও বাকি থাকা অংশটুকুকে কাজে লাগিয়ে মেসি আসলে খোদ আর্জেন্টিনার সঙ্গেই একধরনের কৌতুক করছেন।

রুশ মহামতি কথাসাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের ‘হোয়াট মেন লিভ বাই’ বা মানুষ কী নিয়ে বাঁচে শিরোনামের বিখ্যাত একটি গল্প রয়েছে, যেখানে তলস্তয় এই সত্যটি ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মানুষ কেবল নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ বা কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে পৃথিবীতে জীবন ধারণ করে না, মানুষের বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি হলো নিখাদ ভালোবাসা এবং পারস্পরিক প্রেম। এখন একটু ভেবে দেখা যেতে পারে, এই উনচল্লিশ বছর বয়সী মেসিকে নিয়ে যখন আজ সারা বিশ্বকে বলতে হচ্ছে যে তিনি কেন এখনই এত তাড়াতাড়ি অবসর নিলেন, তখন এই একই কথা যদি কোনো সাধারণ মানুষের নিজের জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো, তবে তা শুনতে ঠিক কেমন লাগত? নিশ্চিতভাবেই সেই অনুভূতি হতো অত্যন্ত মধুর, যা মূলত ভালোবাসায় মোড়া একধরনের বিরহের দহন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এই অনির্বচনীয় ও দুর্লভ অনুভূতিটুকু লাভ করতে প্রবলভাবে ইচ্ছুক থাকে। আর মেসিও তো শেষ পর্যন্ত রক্ত-মাংসের একজন সাধারণ মানুষই বটে, নাকি! অবশ্য গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সমসাময়িক কোনো ফুটবলারকে নিয়ে যদি মানুষের মনে এই সংশয় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে জেগে থাকে, তবে সেই বিরল নজিরের অধিকারীও একমাত্র মেসিই।

সেই সংশয় আজও সমানভাবে মানুষের মনে জাগরিত হচ্ছে, যখন দেখা যায় ‘আর কিছুই দেওয়ার নেই’ এই অজুহাতে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পরও একজন মানুষ এই বয়সে এমন অবিশ্বাস্যভাবে মাঠে ফুটবল খেলে চলেছেন। গত ১৮ অক্টোবর আটলান্টার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মাঝমাঠ থেকে নিজের আয়ত্তে বল টেনে নিয়ে দৌড়ে সোজা পেনাল্টি বক্সে ঢুকে যেভাবে তিনি গোল আদায় করেছিলেন, তা কি সহজে ভোলার মতো? সেই ম্যাচে তাঁর চেয়ে বয়সে পুরো ছয় বছরের ছোট হওয়া সত্ত্বেও আটলান্টার ডিফেন্ডার জুনিয়র আলোনসো পর্যন্ত তাঁর ক্ষিপ্র দৌড় কিংবা দুর্দান্ত ড্রিবলিং কোনোভাবেই রোধ করতে পারেননি। আবার ঠিক একই ম্যাচে বক্সের ভেতরে দ্রুতগতির দৌড়ের ওপর একসঙ্গে প্রতিপক্ষের তিন ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলে যে গোলটি তিনি করেছিলেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। সেই তিনজন ডিফেন্ডারের প্রত্যেকেই কেবল বয়সে মেসির চেয়ে ছোট ছিলেন না, বরং শারীরিক শক্তির দিক থেকেও তাঁরা অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন; কিন্তু সবুজ ঘাসের মাঠে তাঁদের সেই সমস্ত শারীরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিমিষেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে ভিন্ন এক বাস্তবতার জন্ম দিল।

এমনকি ঠিক একই ধরনের দৃশ্য আজ সকালেও মাঠে উপস্থিত দর্শকদের চোখের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। বক্সের ভেতরে পূর্ণ গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে হেড করে বল পেছনে বাড়িয়ে দিয়ে চমৎকার এক গোলের উৎস তৈরি করেছিলেন তিনি, যা দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও তরুণ বয়সের সেই মেসির কথা মনে পড়ে যেতে পারে, যাঁর সম্পর্কে সাধারণের এমন জোরালো বিশ্বাস ছিল যে তাঁর শরীরের চারপাশে যেন অতিরিক্ত একটি করে ‘চোখ’ সবসময় খোলা থাকে। তা না হলে মাঠে কোন খেলোয়াড় ঠিক কোন মুহূর্তে কোথায় অবস্থান করছেন, সেই নিখুঁত ধারণা একজন মানুষ কীভাবে পেতে পারেন? ফুটবলের বড় বড় কিংবদন্তিরা এই বিশেষ বোধশক্তি ঠিকই টের পান, আর তা কেবল প্রতিপক্ষের গোলের সুযোগ খুঁজে বেড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানুষের মনের ভেতরের গভীর ভাবগতিকেও নিখুঁতভাবে অনুধাবন করতে পারে। ক্রিকেট সম্রাট শচীন টেন্ডুলকারের মতো মেসিকেও তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় জুড়ে দেশবাসীর আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চরম মানসিক চাপ মাথায় নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটবল খেলে যেতে হয়েছে। পরিশেষে সময়ের সঠিক হিসাব বুঝে সেই বিশাল মানসিক চাপ নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর মেসি এখন নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেক বেশি ফুরফুরে ও আনন্দিত মেজাজে রয়েছেন। আর ঠিক এই কারণেই তাঁর ভেতর থেকে সেই পুরোনো ও চেনা আগুনের ফুলকিগুলো আবারও নতুন বেগে ঠিকরে বের হয়ে আসছে।

খেলাধুলার এই অপূর্ব সুন্দর ময়দানকে তিনি এখনো আগের মতোই সমানভাবে উপভোগ করেন কি না, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর স্বয়ং মেসির নিজের কাছেও হয়তো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আবার কেউ কেউ হয়তো মনে মনে এমনটাও ভেবে নিতে পারেন যে ফুটবলে এক হাজার গোলের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই বুঝি মেসি এখনো ফুটবল খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন; এই ধারণটি সত্যও হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ ভুলও হতে পারে। তবে এর পেছনের মূল কারণ যাই হোক না কেন, এই পারফরম্যান্সের সুবাদে একটু অভিমানী ও আবেগপ্রবণ আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাঠগড়া থেকে মেসির যে কোনো মুক্তি মিলছে না, তা একেবারে নিশ্চিত। তখন স্বভাবতই একটি প্রশ্ন মনে জোরালোভাবে জাগতে পারে যে, মেসি যদি সত্যিই ফুটবল জীবনের হাজার গোলের মাইলফলকে পৌঁছাতে এতই আগ্রহী হয়ে থাকেন, তবে সেটা তো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নেমে খেলে গেলে আরও অনেক দ্রুত ও সহজে অর্জন করা সম্ভব হতো! তাহলে ঠিক কোন যুক্তিতে তিনি এই অকাল অবসর বেছে নিলেন?

হ্যাঁ, আদতে পৃথিবীর মানুষের ঠিক এই আক্ষেপের সুরটুকুই তো নিজ কান্নায় শুনতে চেয়েছিলেন ফুটবল জাদুকর মেসি। আর সেটিই হলো তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের সবকিছুর প্রকৃত সার্থকতা—যে অবর্ণনীয় অনুভূতি কেবল একজন মানুষের নিজের অন্তরের গভীরেই চিরকালের মতো সযত্নে লুকিয়ে থাকে। সেই কারণে আপাতদৃষ্টিতে কৃত্রিম বা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে মেসির এই পা দুটিকে যতই অবাস্তব বলে মনে হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কোটি কোটি ভক্তের কাছে এর চেয়ে বড় কোনো পরম সত্য আর কিছু হতে পারে না।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
কুরিয়ারে পার্সেল ছিনতাইচেষ্টা, কনস্টেবল আটক

কুরিয়ারে পার্সেল ছিনতাইচেষ্টা, কনস্টেবল আটক