নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কোনো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাকে বিশেষ কিছু নিয়মে যোগফল হিসেবে প্রকাশ করার ভিন্ন দুটি পদ্ধতি বিবেচনা করা যাক। প্রথম শর্ত অনুযায়ী, পদগুলোর মধ্যকার ব্যবধান হতে হবে কমপক্ষে দুই। দ্বিতীয় শর্ত অনুসারে, সংখ্যাগুলোকে পাঁচ দ্বারা ভাগ করলে ভাগশেষ থাকবে এক কিংবা চার। সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এই দুটি নিয়মের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছয় সংখ্যাটির জন্য উভয় পদ্ধতিতেই যোগফল তৈরির উপায় পাওয়া যায় ঠিক তিনটি করে। মজার ব্যাপার হলো, কেবল নির্দিষ্ট এই অংকটির জন্যই নয়, যেকোনো ধনাত্মক পূর্ণমানের ক্ষেত্রেই উক্ত দুই পদের উপায়সংখ্যা সর্বদা সমান হয়ে থাকে। গাণিতিক পরিভাষায় এই বিস্ময়কর সত্যটিকে রজার্স–রামানুজন অভেদ হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের নামী গবেষকরা এটি নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ চালিয়ে আসছেন। বর্তমান সময়ে নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে এটি আসলে অত্যন্ত বিশাল মাপের একটি কাঠামোর অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ মাত্র এবং এর মাধ্যমে আরও অগণিত নতুন অভেদের সন্ধান লাভ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।
এই যুগান্তকারী সাফল্যের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন ক্ষণজন্মা ভারতীয় গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজন, যুক্তরাষ্ট্রের এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী গবেষক ইফেং হুয়াং সহ আরও কতিপয় খ্যাতনামা বিজ্ঞানী। তাঁদের এই আধুনিক গবেষণার মূল ধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়েছে জ্যামিতিক বিশ্লেষণ এবং জটিল গাণিতিক গিঁটের অভিনব ধারণা। এমনকি সম্পূর্ণ প্রমাণটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি। পুরো আবিষ্কারের পেছনের সঠিক ইতিহাস অনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে একশো বছরেরও বেশি আগের অতীতে। তখনকার দিনে এই প্রতিভাবান ব্যক্তির বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ বছর এবং তিনি জীবিকা নির্বাহের তাগিদে মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে সাধারণ কেরানির দায়িত্ব পালন করতেন। অফিসের দাপ্তরিক কাজের ভিড়েও তাঁর মন পড়ে থাকত গণিতের অদ্ভুত ও রহস্যময় দুনিয়ায়। কর্মঘণ্টার ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিজের নোটখাতা পূর্ণ করে তুলতেন সম্পূর্ণ মৌলিক সব সূত্রে। যদিও সেগুলোর অনেকগুলোরই যথাযথ প্রমাণ তাঁর কাছে উপস্থিত ছিল না, তবুও নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টির ওপর তাঁর ছিল অবিচল বিশ্বাস।
নিজের উদ্ভাবিত এসব অমূল্য সূত্রপত্র একসময় ব্রিটিশ গবেষকদের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠাতে শুরু করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই সেই যুগে অনেকের পক্ষ থেকেই খামে ভরা কাগজগুলো অবহেলায় উপেক্ষিত হয়। এমনকি সামান্য একজন কেরানির পাঠানো খামগুলো কেউ কেউ কোনো গুরুত্ব না দিয়েই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন। তবে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সব মানুষ তো আর একরকম হন না। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো চিঠিপত্রগুলোর মধ্য থেকে একটি গিয়ে পৌঁছেছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক জি এইচ হার্ডির কাছে। অচেনা ও অখ্যাত এক কর্মীর পাঠানো কাগজের পাতাগুলোতে চোখ বুলিয়ে প্রথমে তাঁর মনে তীব্র সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই সংশয় ঝেড়ে ফেলে তিনি গভীর মনযোগ দিয়ে অংকগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করেন। একটু সময় নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনার পর তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে এগুলো কোনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজ হতে পারে না। এই তরুণ মনীষীর অসাধারণ প্রতিভায় তিনি সম্পূর্ণ বিমোহিত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে সরাসরি ইংল্যান্ডে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। পরবর্তীতে এই দুই দিকপালের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহযোগিতায় গবেষণার সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছিল।
তৎকালীন সময়ে পাঠানো রামানুজনের সূত্রগুলোর মাঝে বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছিল এমন দুটি সমীকরণ, যার একদিকে ছিল অসীম সংখ্যক পদের যোগফল এবং অন্যদিকে অসীমসংখ্যক পদের গুণফল। এই দুটি রাশির অভ্যন্তরীণ গঠন এতটাই ভিন্ন প্রকৃতির ছিল যে সেগুলোর সমান মান পাওয়ার পেছনে কোনো সহজ বিন্যাস বা প্যাটার্ন সহজে ধরা দিত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমীকরণগুলো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছিল যে এই দুই ভিন্ন পদের যোগফল এবং গুণফল আদতে সম্পূর্ণ সমান। সুদূর ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ পার্সি ম্যাকমোহন এই বিশেষ সূত্র দুটির গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্তর্নিহিত সম্পর্ক অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তিনি এই অদ্ভুত বিষয়গুলোকে সংখ্যার বিভাজন বা পার্টিশন নামক প্রচলিত একটি গাণিতিক ধারণার সাথে যুক্ত করেন। পার্টিশন বলতে সহজ কথায় বোঝানো হয় যেকোনো পূর্ণসংখ্যাকে ছোট ছোট পূর্ণমানের যোগফল আকারে প্রকাশ করার বিভিন্ন সম্ভাব্য উপায়। উদাহরণস্বরূপ চার সংখ্যাটিকে বিভিন্নভাবে লেখা সম্ভব এবং এর মোট পাঁচটি পার্টিশন রয়েছে।
রজার্স–রামানুজন অভেদের একপাশে এমন কিছু পার্টিশনের সংখ্যা অবস্থান করে, যেখানে পাশাপাশি থাকা যেকোনো দুটি পদের ব্যবধান অন্তত দুই। অন্যদিকে এর বিপরীত পাশে রয়েছে এমন সব পার্টিশনের সংখ্যা, যেখানে প্রতিটি পদকে পাঁচ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ অবধারিতভাবে এক বা চার হবে। এই নিয়ম দুটি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও যেকোনো সংখ্যার জন্য উভয় প্রকৃতির পার্টিশনের সংখ্যা সবসময় সমান পাওয়া যায়। স্বয়ং রামানুজন এই সমীকরণগুলোর শক্ত কোনো প্রমাণ উপস্থাপনের আগেই ব্রিটিশ গণিতবিদ লিওনার্ড জেমস রজার্সের বহু পুরোনো একটি গবেষণাপত্রে এগুলোর একটি নির্ভুল প্রমাণ খুঁজে পান। যেহেতু রজার্স এর অনেক আগেই বিষয়গুলো প্রমাণ করেছিলেন, তাই এই অভেদগুলো তাঁর এবং রামানুজনের যৌথ নামে পরিচিতি লাভ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য গণিতবিদ জর্জ অ্যান্ড্রুজের মতে, বিংশ শতাব্দীর সিংহভাগ সময়জুড়ে এই অভেদকে গণিতের একাকী একটি রত্ন হিসেবেই গণ্য করা হতো। কেউ তখনো কল্পনাও করতে পারেননি যে এর পেছনের চাবিকাঠিতে এত বিশাল কোনো তত্ত্ব লুকিয়ে আছে।
গত শতকের সত্তরের দশকের সূচনালগ্নে রজার্স–রামানুজন অভেদের সমকক্ষ আরও অসংখ্য সূত্রের একটি আস্ত পরিবার খুঁজে পান জর্জ অ্যান্ড্রুজ। পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর বহু আগেই গণিতবিদ বেসিল গর্ডন একই ধরনের ফলাফল বের করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নতুন কিছু আবিষ্কারের অনাবিল আনন্দের বদলে অ্যান্ড্রুজ তখন খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন বৈকি। তবে পরবর্তীতে এই নতুন অভেদগুলো বিজ্ঞানী মহলে অ্যান্ড্রুজ–গর্ডন অভেদ হিসেবে স্থায়ী পরিচিতি অর্জন করে। কালক্রমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে এই সূত্রগুলোর পরিধি কেবল সংখ্যার সাধারণ হিসাব-নিকাশের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং গণিতের আরও বেশ কিছু জটিল শাখায় এগুলোর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো রিপ্রেজেন্টেশন থিওরি, সিমেট্রিক ফাংশন এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত জনপ্রিয় হার্ড হেক্সাগন মডেল। এই মডেলে মূলত নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা হয় কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট পৃষ্ঠের ওপর গ্যাসের পরমাণুগুলো ত্রিভুজ আকৃতিতে সুবিন্যস্ত হতে পারে। বিষয়টি প্রাথমিক দৃষ্টিতে সংখ্যার হিসাব থেকে বহু দূরে বলে মনে হলেও গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে সেখানে রজার্স–রামানুজন অভেদের সাথে অদ্ভুত এক গাণিতিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর