নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ সাধারণত নরম স্বভাবের হয়ে থাকে এবং কারও ওপর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ধরনের রাগ পুষে রাখতে পছন্দ করে না। তবে প্রতিটি মানুষের জীবনচক্রেই এমন কিছু নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যাদের ক্ষেত্রে চাইলেও অতীতের কোনো ক্ষোভ বা রাগ সহজে ভুলতে পারা সম্ভব হয় না। জীবন চলার পথে এমনই কিছু তিক্ত স্মৃতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা আজও মনের কোণে গভীর দাগ কেটে আছে।
স্মৃতির পাতা উল্টালে ছোটবেলার একটি ঘটনার কথা স্পষ্টভাবে মনে পড়ে যায়, যখন বয়স কম ছিল এবং তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াশোনা করা হতো। সেদিনের একটি টিফিন পিরিয়ডের সময় নিজের স্কুলব্যাগ খুলে টিফিন বক্স খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল যে কৌটোটি সেখানে নেই, অথচ সেদিন শখ করে টিফিনে স্যান্ডউইচ নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রতিদিনের নিয়মিত খাবার হিসেবে তো সাধারণত ডিমভাজি আর রুটিই কপালে জুটত, কিন্তু সেদিন বিশেষ আয়োজন থাকা সত্ত্বেও খাবারটি উধাও হয়ে যায়।
শ্রেণীকক্ষের সবাই যখন নিজেদের টিফিন খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিল, তখন পুরো ক্লাসের ভেতর চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছিল কিন্তু কোনোভাবেই টিফিন বক্সের হদিস মিলছিল না। পরবর্তীতে জানা গেল যে সহপাঠী বন্ধু মাইশা ক্লাসের একদম প্রথম পিরিয়ডেই ব্যাগ থেকে সেই টিফিন বক্স চুরি করে পেটপুরে খেয়ে ফেলেছে। বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝে এমন বিশ্বাসঘাতকতার নজির দেখার পর মনে প্রশ্ন জাগে যে মানুষের জীবনে আর শত্রুর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে?
স্কুলজীবনেই সাকিব নামের আরেকটি ছেলের করা এমন একটি ঘটনা এখনও মনে পড়লে চোখের কোণে জল চলে আসে। তখনকার দিনে পিঠে ঘন ও লম্বা চুল ছিল এবং সেই চুলে নানা ধরনের রং ও স্টাইল করে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া হয়েছিল। শিক্ষক যখন গম্ভীরভাবে ক্লাস নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ওই দুষ্টু ছেলেটি চুলের ভেতরে একটি চুইংগাম অত্যন্ত শক্তভাবে লাগিয়ে দেয়।
চুইংগামটি এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে শখের সেই লম্বা এবং ঘন চুলগুলো আর কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বাড়ি ফেরার পর অবস্থা দেখে বাবা সোজা নাপিতের দোকানে নিয়ে যান এবং সব চুল একেবারে ছেঁটে ছোট করে কেটে ফেলতে নির্দেশ দেন। টাক মাথা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পর সহপাঠীদের তীব্র হাসাহাসির সেই লজ্জাজনক ইতিহাসের কথা আর না–ই বা বলা হলো, কারণ একটিমাত্র চুইংগামের জন্য এত বড় চড়া মূল্য যে দিতে হবে তা তখন ধারণার বাইরে ছিল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের পরিধি যখন আরেকটু প্রসারিত হলো, তখন স্কুলে নিজের চেয়ে বয়সে তিন বছরের বড় একজন সিনিয়র ভাইয়ার প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল। সেই সিনিয়র ভাইয়া একবার বেশ ভালোবেসে একটি চকলেট এবং একটি সুন্দর গোলাপ ফুল উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন, আর সেই উপহারের কাগজের প্যাকেটটি পর্যন্ত পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল।
কিন্তু এত যত্ন ও অনুভূতির শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি, কারণ কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা গেল সেই স্কুলেরই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড তিশা এবং সেই সিনিয়র ভাইয়া একে অপরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বন্ধু এবং ভালোবাসার মানুষ—দুটি জায়গাতেই একসঙ্গে এমন ভয়াবহ ডাবল ধাক্কা খাওয়ার পর সাধারণ মানুষ আর কাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবে?
স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বড় হওয়ার পর একসময় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে একটি চাকরিও জুটিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং শুরুর দিকে সবকিছু বেশ ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু কাল হয়ে দাঁড়াল দপ্তরে থাকা এক অতি চাটুকার বা তেলবাজ সহকর্মী, যে বসের সামনে মাত্রাতিরিক্ত তোষামোদ করে শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করে ফেলল।
পেশাগত ওই পদোন্নতি বা প্রমোশনটি পেলে নিজের জমানো টাকায় একটি স্কুটি কেনার সুপ্ত ইচ্ছা মনে পুষে রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্কুটি কেনা তো দূরের কথা, ওই তেলবাজ মোখলেসকে যে পছন্দ করা হয় না তা সে টের পেয়ে বসের কাছে গিয়ে এমন সব মিথ্যা দুর্নাম রটাতে শুরু করে যে শেষ পর্যন্ত চাকরিটিই পুরোপুরি হারাতে হলো।
মানবজীবনের চলার পথে এই ধরনের অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনাই ঘটে থাকে, যেগুলো পরবর্তীতে মানুষ নিজের ভেতর থেকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার প্রাণপণ চেষ্টা করে থাকে। এই ক্ষতিকারক মানুষগুলোও জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এসে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, যেখানে কেউ বলেছে যে তারা কাজটা ইচ্ছা করে করেনি, কেউ বলেছে তখন তারা পরিস্থিতি বোঝেনি, আবার কেউ কেউ সরাসরি এসে সর্তহীনভাবে স্যরি বলেছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রশ্নই থেকে যায় যে কেবল একটিমাত্র স্যরি শব্দ উচ্চারণ করলেই কি জীবনের সব সমস্যার সমাধান বা ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়? যে মানুষটি ছোটবেলায় টিফিন খেয়ে ফেলেছিল, সে কি আজ সেই স্যান্ডউইচ আগের মতো ফিরিয়ে দিতে পারবে? যে ব্যক্তি শখের চুল কেটে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, সে কি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া চুল ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হবে?
যিনি জীবনের প্রথম ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের জায়গাটি কেড়ে নিয়েছিলেন, তিনি কি সেই পুরোনো গোলাপ ও চকলেটের মধুর দিনগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন? আর কর্মক্ষেত্রের সেই মোখলেসের কথা তো নতুন করে আর কিছুই বলার নেই।
তবে আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে মানুষ হিসেবে স্বভাবটা অত্যন্ত নরম এবং ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে মানুষ তিন দিন কেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাগ পুষে রাখতে পারে না। তাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে এই ক্ষতিকর মানুষগুলোকেও একদিন মনের দিক থেকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, তারা সবাই জীবনে বেশ সুখে শান্তিতে থাকুক আর কেবল নিজের বুকেই যেন আজীবন এই যন্ত্রণার আগুন জ্বলতে থাকে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর