ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ভার্চুয়াল মাধ্যমে মুমিনের জন্য মেনে চলা জরুরি ছয় নিয়ম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 31, 2026 ইং
ভার্চুয়াল মাধ্যমে মুমিনের জন্য মেনে চলা জরুরি ছয় নিয়ম ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আধুনিক যুগে অনলাইন মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধেয় বা কন্টেন্টগুলো মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। প্রতিদিনের চেনা ঘটনার তালিকায় এখন নিয়মিত যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ভাইরাল হওয়া সংবাদ, ছবি কিংবা ভিডিও এবং তা কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নানা ধরনের বিতর্ক। এই বাস্তবতায় ভার্চुअल প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শিত কোনো উপাদানের বিপরীতে একজন মুমিনের প্রতিক্রিয়া ঠিক কী ধরনের হওয়া উচিত, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

ইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল জগতের অসত্য প্রচারের পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো কিছু শেয়ার করা মূলত অন্যের কথা প্রচারেরই সমান। ব্যক্তিগত আইডিতে কোনো স্ট্যাটাস দেওয়ার অর্থ হলো জনসমক্ষে নিজের সুনির্দিষ্ট মতামত প্রকাশ করা, আর কোনো পোস্টে মন্তব্য করার বিষয়টি বাস্তব জীবনের কোনো বিষয়ে মন্তব্য করার সঙ্গেই তুলনীয়। ফলে ইসলাম ধর্মে কথা বলা, দেখা কিংবা কোনো কিছু প্রচারের ক্ষেত্রে যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাগুলো রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও হুবহু সেই নিয়মগুলোই প্রযোজ্য হবে।

বাস্তব জীবনের সাধারণ মিথ্যার চেয়ে অনলাইনে সংঘটিত এই মিথ্যাগুলো অনেক বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এর মূল কারণ হলো, ভার্চুয়াল জগতের মিথ্যা খুব দ্রুত অসংখ্য মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেটে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি এক ব্যক্তির শাস্তি নিজের চোখে দেখেছিলেন যাকে মিথ্যা প্রচারের কারণে কেয়ামত পর্যন্ত দূর-দূরান্তে তা বয়ে বেড়ানোর এবং ছড়িয়ে দেওয়ার আজাব ভোগ করতে হবে বলে সহিহ বুখারি শরিফের ১৩৮৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো কন্টেন্ট বা উপাদান ব্যবহারকারীর সামনে উপস্থিত হলে তাতে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা স্ট্যাটাস প্রকাশের পূর্বে অন্তত ছয়টি বিশেষ বিষয়ের প্রতি গভীর সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। প্রথমত, ইসলাম ধর্মে বাস্তব জীবনে যা দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, মুঠোফোনের স্ক্রিনেও সেই একই জিনিস দেখা নিষিদ্ধের আওতাভুক্ত। পবিত্র কোরআনের সুরা নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে মুমিন বান্দাদের নিজেদের দৃষ্টি কঠোরভাবে সংযত রাখার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কোনো অশ্লীল ছবি কিংবা নাচের ভিডিও এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তি বা অনলাইন পেজ নিয়মিত এজাতীয় কন্টেন্ট বা উপাদান প্রচার করে থাকে, তাদের ফলো করা কিংবা তাদের পোস্টে লাইক দেওয়া থেকেও মুমিনদের বিরত থাকা উচিত। কারণ ব্যবহারকারীর একটি মাত্র লাইক বা ফলোর মাধ্যমেই সেই ক্ষতিকর কন্টেন্টটি আরও অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যায়, যা পবিত্র কোরআনের সুরা মায়িদার ২ নম্বর আয়াতের শিক্ষার পরিপন্থী যেখানে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো ধরনের নেতিবাচক কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যে সমস্ত কন্টেন্টের ভেতরে মানবজাতির জন্য কোনো ধরনের কল্যাণকর কিছু নেই, তা নতুন করে শেয়ার করারও কোনো প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন যে, অনর্থক বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ পরিহার করা মানুষের ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য, যা সুনানে তিরমিজির ২৩১৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, অনলাইনে কন্টেন্টের প্রসার ঘটাতে কোনো ধরনের প্রতারণামূলক পোস্ট দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমান সময়ে ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে লাইক, কমেন্ট কিংবা ভিউ সংখ্যা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেকে জেনেশুনে ভুল শিরোনাম বা কাল্পনিক তথ্য দিয়ে পোস্ট প্রকাশ করেন, যা স্পষ্টতই এক ধরনের প্রতারণা। মহানবী (সা.) এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে কস্মিনকালেও আমাদের দলভুক্ত নয়, যা সহিহ মুসলিম শরিফের ১০১ নম্বর হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

চতুর্থত, তথাকথিত এক্সপোজ করার প্রবণতার নামে অন্য কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি জনসমক্ষে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সহিহ মুসলিম শরিফের ২৬৯৯ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ বা ত্রুটি গোপন রাখবে, মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার সেই দোষ গোপন রাখবেন। একইভাবে নিজের অতিরিক্ত সম্পদ, পার্থিব সাফল্য কিংবা ইবাদত-বন্দেগি ফলাও করে প্রচার করা বা ফ্লেক্স করা থেকেও বিরত থাকতে হবে, কারণ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যেকোনো কাজ করাই হলো ইসলামের পরিভাষায় রিয়া।

মানুষকে শোনানোর উদ্দেশ্যে কেউ কোনো আমল করলে আল্লাহ তার আসল অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন এবং দেখানোর উদ্দেশ্যে কেউ কিছু করলে আল্লাহ তার আসল অবস্থা সবাইকে দেখিয়ে দেবেন বলে সহিহ বুখারি শরিফের ৬৪৯৯ নম্বর হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কমেন্ট বক্সে কোনো অবস্থাতেই কাউকে উদ্দেশ্য করে গালাগালি বা কটুকথা বলা যাবে না। মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া পরিষ্কার পাপাচার বা ফাসেকি কাজ, যা সহিহ বুখারি শরিফের ৪৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।

বাস্তব জীবনে কাউকে গালি দিলে যেমন কবিরা গুনাহ হয়, ঠিক তেমনি ভার্চুয়াল জগতের কমেন্ট বক্সে কাউকে গালি প্রদান করলেও অবিকল একই পাপাচার অর্জিত হয়। ষষ্ঠত, ইন্টারনেটে কোনো ভাইরাল কন্টেন্ট বা সংবাদ দেখতে পেলে তা না জেনে-বুঝে অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে সবার আগে ভালোভাবে যাচাই বা তাহকিক করে নেওয়া জরুরি। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন যে, কোনো ফাসেক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো ধরনের সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ওপর তোমরা আঘাত বা ক্ষতি করে না বসো।

মহানবী (সা.) বলেছেন যে, মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য কেবল এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তার সত্যতা যাচাই না করেই তা চারদিকে বলে বেড়ায়, যা সহিহ মুসলিমের মুকাদ্দিমা ও ৫ নম্বর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। যদি কোনো সংবাদের সত্যতা যাচাই করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব না হয়, তবে সেটির ব্যাপারে অপেক্ষা করা উচিত এবং কোনো অবস্থাতেই তা যাচাই ছাড়া শেয়ার করা যাবে না। ফেসবুকে কোনো কিছু দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানানোই সব বিষয়ের একমাত্র সমাধান নয়, বরং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলার অর্থ এই নয় যে আমাকে সব বিষয়েই নিজের মতামত প্রকাশ করতে হবে।

কোনো বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে নিজের অবস্থান জানানোর সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা ইন্টারনেটে নেই এবং এতে বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো সুফল আসে না, বরং বাস্তব জীবনের জরুরি কাজগুলোতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। মহানবী (সা.) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ ও পরকালের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে, সে যেন সর্বদা ভালো কথা বলে অথবা অন্যথায় চুপ থাকে, যা সহিহ বুখারি শরিফের ৬০১৮ নম্বর হাদিস থেকে জানা যায়। যেকোনো জটিল বা অনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই একজন বুদ্ধিমান মানুষের প্রধান কাজ।

সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো ধরনের অন্যায় কিংবা অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করাই আমাদের প্রকৃত ও যথাযথ নৈতিক দায়িত্ব। কারও অন্যায় আচরণ সম্পর্কে অবগত হলে তাকে সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করা যায়, কিংবা যাদের জানালে সেই অপরাধ বন্ধে যথাযথ কাজ হবে তাদের বিষয়টি জানানো উচিত। কিন্তু নিজের ফেসবুক ওয়ালে সেই অন্যায়কারী বা অপরাধীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে জনসমক্ষে লেখালেখি করলে তাতে আদতে কোনো ইতিবাচক লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয় না।

বরং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উল্টো সেই অপরাধী ব্যক্তির দোষ বা গোপনীয় বিষয় মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, যা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনুচিত। হাদিসের আলোকে অন্যায় কাজ দেখলে তা প্রথমে হাত দিয়ে, তাতে ব্যর্থ হলে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ করে পরিবর্তন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর সেই ক্ষমতাও না থাকলে অন্তত অন্তরে সেই অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে বলা হয়েছে, যা সহিহ মুসলিম শরিফের ৪৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

এই পুরো ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো সমাজে সংঘটিত যেকোনো অন্যায় ও অপরাধ কঠোরভাবে বন্ধ করা, কেবল তা নিয়ে সস্তা প্রচার বা প্রোপাগান্ডা চালানো নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে কোনো অন্যায়ের বিষয়ে জানানোর পরও যদি তারা কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে সেটির দায়ভার সাধারণ মানুষের ওপর বর্তাবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি কোনো মানুষকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো দায়িত্বের ভার দিয়ে কষ্ট দেন না।

সবশেষে এটি সবসময় মনে রাখা আবশ্যক যে, বর্তমান যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলত সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো সম্পূর্ণ কল্যাণকর ও বৈধ কাজের জন্য তৈরি হয়েছে। এই মাধ্যমটি যেন কোনো অবস্থাতেই মানবজাতির জন্য পাপাচারে লিপ্ত হওয়া কিংবা অপরাধের আখড়ায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কাজ সবসময় কল্যাণময় হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এর বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটা কাম্য নয়।

পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ৩৬ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, মানুষের কান, চোখ এবং অন্তর—এই প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার সম্পর্কে কিয়ামতের দিন মহাশক্তিধর আল্লাহর দরবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে এবং এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আলোচিত এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেম ও এম.ফিল গবেষক নাজমুস সাকিব।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মানসিক চাপ দূর করতে দারুণ কার্যকর বেকিং

মানসিক চাপ দূর করতে দারুণ কার্যকর বেকিং