ঢাকা | বঙ্গাব্দ

শীতে ডিম ছাড়ে পারশে, পনেরো মাসেই বাড়ে দ্বিগুণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
শীতে ডিম ছাড়ে পারশে, পনেরো মাসেই বাড়ে দ্বিগুণ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

শীতকালের শীতল ভোরে দক্ষিণ অঞ্চলের যেকোনো মৎস্য ঘেরে জাল টানলে যে মাছটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ধরা পড়ে, তার নাম হলো পারশে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই মাছটিকে চেলন সাবভিরিডিস (Chelon subviridis) নামে চিহ্নিত করা হয়, যদিও অতীতে একে লাইজা পারসিয়া (Liza parsia) হিসেবে ডাকা হতো এবং সম্প্রতি এর গণ পরিবর্তিত হয়েছে। মুজিলিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই জলচর প্রাণীটি দেখতে বেশ সরু ও চকচকে হয়ে থাকে, যার পিঠের দিকটা কালচে এবং পেটের অংশটি রুপালি রঙের হয়। শরীর বা আকারের তুলনায় এই মাছের চোখজোড়া একটু বড় আকারের হয়ে থাকে, যা দেখে মনে হয় তারা সর্বদা সজাগ থেকে নতুন কিছু খুঁজছে। দক্ষিণাঞ্চলের নানা খাল-বিল, সুন্দর প্যারাবন এবং অগভীর নোনা জলাশয়গুলোতে মূলত এদের আসল সংসার ও বিচরণক্ষেত্র গড়ে ওঠে।

মাছচাষিদের আলোচনার টেবিলে একটি কথা অত্যন্ত জনপ্রিয় যে পারশে চাষ করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশ কম থাকে। বাগদা চিংড়ির বাজারমূল্য এবং নানা ধরনের রোগবালাই নিয়ে যেখানে চাষিদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, সেখানে পারশে মাছ বেশ নিশ্চিন্ত মনেই বড় হতে থাকে। পুকুর বা ঘেরে পোনা মজুদ করার ঠিক চার থেকে পাঁচ মাসের মাথাতেই একেকটি পারশে মাছের ওজন ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামের কোঠায় পৌঁছে যায়। বাজারে এই মাছের যেমন ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তেমনি এর দামও বেশ চড়া। তবে এই লাভের অঙ্কের পেছনে মূলত কাজ করে এক অদ্ভুত জৈবিক জেদ, যা গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

অন্যান্য সাধারণ মাছের তুলনায় পারশের প্রজনন-স্বভাব কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। সাধারণত দেখা যায় যে অধিকাংশ মিঠাপানির মাছ বর্ষা ঋতুতে ডিম ছেড়ে থাকে, কিন্তু পারশে মাছ সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অর্থাৎ একদম জাঁকিয়ে বসা শীতের মধ্যেই পারশে ডিম ছাড়ার কাজ সম্পন্ন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ার ঘটনা ঘটে ডিসেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহ এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দুই সপ্তাহে। ঠিক সেই সময়ে জলাশয়ের জলের তাপমাত্রা কমতে শুরু করে এবং লবণাক্ততার মাত্রাও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে, আর সম্ভবত এই পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনই মাছের শরীরে এক বিশেষ ধরনের প্রজনন সংকেত পৌঁছে দেয়।

প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য পারশে মাছ সাধারণত বেশি লোনাযুক্ত পানি বেছে নিয়ে থাকে। মিষ্টি পানি ও নোনা পানির মিশ্রণে যাদের দিন কাটে, সেই পারশে মাছ ডিম ছাড়ার সঠিক মুহূর্তে এমন সব অংশে সরে যায় যেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। মুজিলিডি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও ঠিক এই একই ধরনের প্রজনন প্যাটার্ন বা ধারা লক্ষ্য করা যায়। গ্রে মুলেট প্রজাতির মাছেরা প্রজনন মৌসুমের শুরুতে দল বেঁধে বা ঝাঁক বেঁধে নদীর মোহনায় এসে জড়ো হয়, এরপর তারা গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। চারপাশের শীতল স্রোত এবং বায়ুচাপের ওঠানামাসহ এই জাতীয় নানা প্রাকৃতিক উপাদান নাকি তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার জন্য ইশারা দিয়ে থাকে।

মুগিল সেফালাসের (Mugil cephalus) মতো অপেক্ষাকৃত বড় প্রজাতির একটি স্ত্রী মাছে পাঁচ লাখ থেকে বিশ লাখ পর্যন্ত ডিম পাওয়ার তথ্য জানা গেছে। পারশে মাছ আকারে ছোট হওয়ায় ডিমের সংখ্যাটা হয়তো কিছুটা কম হবে, তবে তাদের প্রজনন কৌশলটা একেবারেই একই রকমের থাকে। একই প্রজননকালের ভেতরে স্ত্রী মাছের ডিম্বাশয়ের সব ডিম একসঙ্গে পাকে না, বরং তা ধাপে ধাপে পরিণত হয় এবং কয়েক দফায় পানিতে ছাড়া হয়।

মাত্র পনেরো মাস সময়ের মধ্যেই পারশে মাছের মোট সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আসলে এই সংখ্যাটি মুখের কথা নয় বা সহজ কোনো বিষয় নয়। বেশিরভাগ প্রজাতির মাছের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হতে সাধারণত অনেক বেশি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে সেই সমস্ত প্রজাতির ক্ষেত্রে যারা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছাতে বেশ দেরি করে। পারশে মাছ খুব অল্প বয়সেই প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে এবং তারা প্রতিটি প্রজনন মৌসুমে একাধিকবার ডিম ছাড়ে, ফলে ডিমের মোট সংখ্যাও অনেক বেশি হয়।

মুগিল সেফালাসের মতো বড় আকারের প্রজাতির একটি স্ত্রী মাছে পাঁচ লাখ থেকে বিশ লাখ পর্যন্ত ডিম পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। পারশে যেহেতু আকারে কিছুটা ছোট, তাই হয়তো ডিমের সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু তাদের মূল কৌশলটা একই থাকে।

মাছটির নিষিক্ত ডিমগুলো সাধারণত ভাসমান, স্বচ্ছ ও হালকা প্রকৃতির হয় এবং পানির স্রোতের সঙ্গে ভেসে বেড়ায়। মুজিলিডি পরিবারের অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে, এবং সদ্য জন্ম নেওয়া সেই লার্ভার তখনো মুখ কিংবা জোড়া পাখনা তৈরি হয় না। এই ক্ষুদ্র লার্ভাগুলো তখন ভেসে ভেসে মোহনা এবং উপকূলীয় জলাশয়ের দিকে চলে যায়, যেখানে খাদ্যের পরিমাণ বেশি থাকে এবং শিকারির চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। পরবর্তীতে বড় হতে হতে এই লার্ভাগুলোই একদিন বাজারের ঝুড়িতে পরিচিত সেই পারশে মাছে পরিণত হয়।

অবশ্য প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া সব ডিম বা লার্ভা শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে না। এক হাজারটি লার্ভার মধ্যে হয়তো একটি লার্ভাও শেষ পর্যন্ত পূর্ণবয়স্ক মাছে পরিণত হতে পারে না। শিকারি মাছ, নানা ধরনের পাখি, প্রতিকূল পানির স্রোত এবং খাদ্যাভাব—এই সবকিছু মিলিয়ে বেশিরভাগ লার্ভাই পথিমধ্যে হারিয়ে যায়। মাছটির খাদ্যাভ্যাসও এই টিকে থাকার লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পারশে মাছ ক্ষুদ্র প্রাণিকণা ভক্ষণ করে, আর বড় হওয়ার পর তারা শেওলা ও ডায়াটমসহ নানা জৈব পদার্থ খায়। এই বহুমুখী খাদ্যাভ্যাসের কারণে অন্যান্য মাছের সাথে তাদের খাদ্যের প্রতিযোগিতা কম করতে হয়, বিশেষ করে যেখানে খাদ্যসীমিত জলাশয় রয়েছে। খাল-বিল কিংবা প্যারাবনের ঘোলা জলেও তারা খুব সহজে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, আর এই বিশেষ সহনশীলতাটাই মূলত তাদের জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখার প্রধান কারণ।

এক হাজারটি লার্ভার মধ্যে হয়তো একটি লার্ভাও পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। শিকারি মাছ, পাখি, প্রতিকূল স্রোত এবং খাদ্যের অভাব—সব মিলিয়ে অধিকাংশ লার্ভাই পথিমধ্যে বিনষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তাদের খাদ্যাভ্যাসও একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

মাছ চাষের ক্ষেত্রে পারশের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগাচ্ছেন চাষিরা। বাগদা চিংড়ির মতো সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো সামান্য রোগবালাই দেখা দিলেই মড়কের মুখে পড়ে যায়, অথচ পারশে সেখানে অত্যন্ত জেদি ও টিকে-থাকা এক প্রাণী। দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার অর্থ হলো দ্রুত ফলন পাওয়া, যার ফলে পুঁজি বা বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সময়কালও অনেক কমে আসে। মাছের ওজন ৪০ থেকে ৮০ গ্রাম হলেই তা বাজারজাত করা সম্ভব হয়, আর এই স্বল্পকালীন চক্রটিই দক্ষিণাঞ্চলের ঘেরগুলোতে পারশেকে দিন দিন বাগদার এক দারুণ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

তবে যে মোহনা ও উপকূলীয় জলাশয়গুলোতে পারশে মাছ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছেড়ে থাকে, সেই জায়গাগুলোই বর্তমানে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। যত্রতত্র দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিতভাবে চিংড়িঘেরের বিস্তারের কারণে মাছটির প্রজননক্ষেত্রগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। মাছটি যতই দ্রুত তার বংশ বৃদ্ধি করুক না কেন, তার জন্মভূমি বা নিরাপদ আশ্রয়স্থলটাই যদি টিকে না থাকে, তবে সেই প্রজনন ক্ষমতার প্রকৃত অর্থ আর কী থাকতে পারে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
ঘুরিয়ে ও চাপ দিয়ে যেভাবে ডিমের কাঁচা-সেদ্ধ অবস্থা চেনাবেন

ঘুরিয়ে ও চাপ দিয়ে যেভাবে ডিমের কাঁচা-সেদ্ধ অবস্থা চেনাবেন