ঢাকা | বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আক্রমণ ঠেকাতে প্রস্তুত তেহরান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আক্রমণ ঠেকাতে প্রস্তুত তেহরান ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং নতুন সমরাস্ত্র ও রণকৌশল হাতে নিয়েছে। দেশটির সামরিক মহলের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে ফের কোনো সংঘাত লাগলে তাদের অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে। শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। গত বছরের জুন মাসের পর এটি হবে এই পক্ষগুলোর মধ্যে তৃতীয় বড় আকারের সামরিক সংঘাত।

আমেরিকা এবং তাদের মিত্র শক্তির বিরুদ্ধে এবার সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অস্ত্র ও যুদ্ধপদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা করেছে তেহরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আজকের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরেই সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে চলা এই সংঘাত খুব দ্রুত এবং যেকোনো উপায়েই হোক শেষ হতে চলেছে। তেহরানকে একটি চুক্তিতে আসতেই হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন যে অন্যথায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তথা আইআরজিসির সাবেক শীর্ষ কমান্ডার হোসেইন কানানি মোগাদ্দাম সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের গোড়ার দিকে শত্রুর হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও বর্তমানের যুদ্ধ সামলানোর ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি।

সাবেক এই জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রমণাত্মক সামর্থ্য বিবেচনায় তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা এখন বহুগুণ বড় হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানার পাল্লা, নিখুঁত নিশানার ক্ষমতা এবং ওয়ারহেডের কার্যকারিতা উন্নত করা হয়েছে, পাশাপাশি ড্রোনের ব্যবহারও আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করা হয়েছে। শত্রুর নতুন সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জাম শনাক্ত করার কাজ চলছে এবং আরও বৃহৎ ভৌগোলিক এলাকায় অভিযান পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, দেশটিতে পুনরায় হামলা চালানো হলে এর আগে জনসমক্ষে আনা হয়নি এমন গোপন সামরিক সক্ষমতা ও টার্গেটের তথ্য প্রকাশ করা হবে এবং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগও ঘটানো হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ, আইআরজিসি এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। সম্ভাব্য নতুন হামলা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ নিয়ে এই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং তাঁরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন যে ইরানের প্রতিউত্তর হবে তাৎক্ষণিক এবং তা পশ্চিম এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও বিস্তার লাভ করতে পারে।

রোববার সন্ধ্যায় আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি দাবি করেন যে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে তাদের বাহিনী শতভাগ প্রস্তুত রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনই তাদের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ব্যবধান কমাতে কমান্ডাররা অসম যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আকরামিনিয়া।

গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেই সুযোগে বেশ কিছু অস্ত্রের আধুনিকায়ন করা হয়েছে, নতুন সরঞ্জাম যুক্ত করা হয়েছে এবং নতুন রণকৌশল সাজানো হয়েছে। গত মাসে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভূগর্ভস্থ ড্রোন উৎপাদনের একটি কেন্দ্র প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া উন্নত সংস্করণের আরাশ অ্যাটাক ড্রোন সামনে আনা হয়, যার ওয়ারহেডের ওজন বাড়িয়ে ১০০ কেজিতে উন্নীত করা হয়েছে এবং এর দিকনির্দেশনা ব্যবস্থাও অনেক বেশি উন্নত করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সামরিক সংস্থা নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে সমরাস্ত্র আমদানিতে শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে। আইআরজিসির অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূর্ণ করতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চীন, রাশিয়া এবং জার্মানি থেকে এসব সরঞ্জাম আনা হয়। এর মধ্যে রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, টাইটানিয়াম ও ভারী ট্রাক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলো মূলত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

পূর্বের সংঘাতে ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হলেও কানানি মোগাদ্দাম দাবি করেছেন যে সচল থাকা এবং নতুন করে গড়ে তোলা ব্যবস্থাগুলোর নির্ভুলতা ক্রমাগত বাড়ছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য বিমান ও ড্রোনে সফলভাবে আঘাত হানার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি এবং পরিধি আরও বৃদ্ধি করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জলযান চলাচলকে অননুমোদিত বলে মনে করে তেহরান। এই প্রসঙ্গে কানানি মোগাদ্দাম উল্লেখ করেন যে সমুদ্রে বিশাল আকৃতির তেলবাহী জাহাজেও তারা অত্যন্ত সহজে হামলা চালাতে সক্ষম। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের ওপর ইরানি বাহিনী হামলা চালানোর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে তাদের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

তবে এর বিপরীতে দক্ষিণ ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ আগের মতোই বহাল রয়েছে। যুদ্ধ যদি পুনরায় শুরু হয়, তবে দেশটির সাধারণ মানুষ এবং অবকাঠামোগুলো এখনো মারাত্মকভাবে অরক্ষিত অবস্থায় থাকবে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের অন্যান্য শহরে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য কোনো পর্যাপ্ত শেল্টার বা আগাম সতর্কবার্তা প্রচারের উপযোগী কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি কিংবা জনসচেতনতা তৈরির ব্যবস্থায় ঘাটতি পূরণে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতির কথা জানানো হয়নি। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা এবং সড়ক ও রেলপথগুলো সরাসরি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এতে চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

দুই দফা সশস্ত্র সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা প্রাণ হারিয়েছেন। গত মার্চ মাসের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি কিংবা তাঁর কোনো বক্তব্যও শোনা যায়নি। সম্পূর্ণ নিরাপত্তার কারণেই তাঁকে জনসমক্ষ থেকে দূরে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এহেন পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বলয় আরও কঠোর করা হয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা রক্ষা করতে না পারার বিষয়ে তীব্র জবাবদিহির দাবি উঠেছে। এমনকি খোদ ইরানের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ভেতরের অনেকেই এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রিমান্ডের পূর্বে আনিসুল হকসহ চার হাইপ্রোফাইল আসামির স্বাস্থ্

রিমান্ডের পূর্বে আনিসুল হকসহ চার হাইপ্রোফাইল আসামির স্বাস্থ্