ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রাজনীতির হাতিয়ার না সর্বজনীন অঙ্গীকার: কেন মলিন সংবিধান দিবস

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
রাজনীতির হাতিয়ার না সর্বজনীন অঙ্গীকার: কেন মলিন সংবিধান দিবস ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রোমান পুরাণে জানুস দেবতাকে দুইমুখী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর একটি মুখ অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং অন্য মুখটি ভবিষ্যতের পানে নিবন্ধ থাকে। প্রবেশপথ ও পরিবর্তনের এই দেবতার প্রতীকী অর্থ হলো, কোনো রাষ্ট্রকে সামনে অগ্রসর হতে হলে একই সঙ্গে তার সুদূর অতীতের দিকেও ফিরে তাকাতে হয়।

আমাদের দেশের সংবিধান দিবসটিও আমাদের সামনে অবিকল একটি দুইমুখী আয়নার মতো চিত্র তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-উত্তর গণপরিষদ গঠন এবং একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। অন্যদিকে রয়েছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ক্ষমতার বৈধতা অর্জনের চেষ্টা, প্রবল রাজনৈতিক বিরোধ এবং নানা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস।

খুব কম রাষ্ট্রে রাজনীতিতে সংবিধান এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে সংবিধান দিবসটি এত মলিন কেন, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। যে মূল দলিলকে ঘিরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা চালায়, সেই পবিত্র দলিলের জন্মদিনটিই কেন আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হলো না।

এই মৌলিক প্রশ্নটি নিছক কোনো একটি বিশেষ দিবস পালনের গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সাংবিধানিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক জটিল রাজনৈতিক প্যারাডক্স। বাংলাদেশের সংবিধান দিবসটি সরকারিভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল ২০২২ সালে, যা ছিল মূলত সংবিধান গৃহীত হওয়ার সুদীর্ঘ ৫০তম বছর।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংবিধান গ্রহণ করেছিল এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর তা কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ, স্বাধীনতার পর যে স্বাধীন রাষ্ট্রটি তার নিজস্ব আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছিল একটি লিখিত সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে, সেই রাষ্ট্রের একটি সংবিধান দিবসকে সরকারি অনুমোদন দিতে প্রায় অর্ধশতাব্দী সময় লেগে যায়।

এই দীর্ঘ বিলম্বের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কেবল সাধারণ কালপঞ্জির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে বড় প্রশ্নটি হলো, এই সংবিধানকে কি আমরা একটি রাষ্ট্রের অভিন্ন ও সর্বজনীন অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছি, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেদের ব্যবহারের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছি।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, সংবিধান কোনো সাধারণ নির্বাচনী ইশতেহার নয়, কিংবা এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রচারপত্রও হতে পারে না। একটি সংবিধান রাষ্ট্রের প্রধান ক্ষমতা সংগঠিত করে, সেই ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে যেকোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

সংবিধানের প্রতি প্রকৃত আনুগত্য প্রদর্শনের অর্থ কেবল এর কয়েকটি নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ মুখে আওড়ানো নয়; বরং ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল—যাই হোক না কেন, প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তির জন্যই একই ধরনের সাংবিধানিক মানদণ্ড যথাযথভাবে মেনে চলা উচিত।

আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি স্বীকার করতেই হবে যে, দেশের ইতিহাসে সংবিধান বহুবার পারস্পরিক বৈধতা অস্বীকার করার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এক পক্ষ সবসময় সংবিধান কঠোরভাবে রক্ষার দাবি তুলেছে, অন্য পক্ষ আবার সংবিধান সংশোধনের জোরালো দাবি নিয়ে সামনে এসেছে।

ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই সংবিধানের মনগড়া ব্যাখ্যা, ঘনঘন সংশোধন এবং এর রাজনৈতিক ব্যবহারের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এই সংবিধান দেশের সাধারণ মানুষের অভিন্ন আশ্রয় হয়ে ওঠার বদলে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

এই প্রসঙ্গে সাংবিধানিকতাবাদ বা কনস্টিটিউশনালিজম ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নিছক একটি সংবিধান থাকা আর সংবিধানের প্রতিটি অক্ষর মেনে সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কখনোই এক বিষয় হতে পারে না।

সাংবিধানিকতাবাদের মূল কথাটি হলো সরকার সবসময় সংবিধানের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং কোনো অবস্থাতেই সীমাহীন বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না। সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যেকোনো অপব্যবহার কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা, প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা করা এবং সরকারের প্রতিটি কাজের সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হলো সাংবিধানিকতাবাদের মূল উদ্দেশ্য। আমেরিকান সাংবিধানিক চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দ্য ফেডারেলিস্ট পেপার্স-এর ৫১ নম্বর প্রবন্ধ।

এই প্রবন্ধে বিখ্যাত চিন্তাবিদ জেমস ম্যাডিসন লিখেছিলেন যে মানুষ যদি জন্মগতভাবে দেবদূত হতো, তবে কোনো ধরনের সরকারেরই প্রয়োজন হতো না। তাঁর এই বিখ্যাত যুক্তির মূল কথাটি ছিল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, কারণ ক্ষমতাধারীরাও ভুল করতে পারেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন।

ম্যাডিসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান দিবসের মূল শিক্ষা হওয়া উচিত যে কোনো সরকার, সংসদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা কোনো জনপ্রিয় নেতা কখনোই সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারেন না।

সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো সাধারণ অনুমতিপত্র নয়, এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের প্রধান সুরক্ষাকবচ। অতএব, সংবিধান দিবসের প্রয়োজনীয়তা হলো রাষ্ট্রকে সবসময় তার নিজের কাজের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো।

এই বিশেষ দিনটি যদি কেবল কিছু চটকদার সরকারি বক্তৃতা, আলোচনা সভা কিংবা গতানুগতিক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর আসল সাংবিধানিক তাৎপর্য চিরকাল অধরাই থেকে যাবে।

২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এবং ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস পালিত হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

সেখানে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায় ক্ষমতার সঠিক বিভাজন, চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস, আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই ধরনের আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।

অন্য কোনো দেশের, বিশেষ করে আমেরিকার মতো প্রাচীন সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার মধ্যে কোনো ধরনের হীনম্মন্যতা নেই, বরং এটি যেকোনো দেশের প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতারই একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়, আর সেটি হলো বাংলাদেশের নিজস্ব সংবিধান দিবসকে জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ঠিক একই ধরনের রাষ্ট্রীয় আগ্রহ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধানটি প্রণীত হয়েছিল ১৭৮৭ সালে। তাদের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল সাংবিধানিক ইতিহাসে দেশটি বহুবার গৃহযুদ্ধ, তীব্র বর্ণবৈষম্য, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে পথ পাড়ি দিয়েছে।

তাদের এই সাংবিধানিক ঐতিহ্যকে কোনো অবস্থাতেই কোনো ত্রুটিহীন গণতন্ত্রের রূপকথার গল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং তাদের কাছ থেকে শেখার মতো দিক হলো সংবিধানের অন্তর্নিহিত অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক, সংশোধন, বিচারিক পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক জীবনের নিত্যদিনের অংশ।

ব্রিটিশ সাংবিধানিক অভিজ্ঞতাও আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাজ্যের কোনো একক সংকলিত লিখিত সংবিধান নেই বললেই চলে; তাদের পুরো সাংবিধানিক ব্যবস্থাটি মূলত গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আইন, বিচারিক সিদ্ধান্ত, দীর্ঘদিনের প্রথা এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির নিখুঁত সমন্বয়ে।

বিখ্যাত লেখক ওয়াল্টার ব্যাজট তাঁর দ্য ইংলিশ কনস্টিটিউশন নামক গ্রন্থে সংবিধানের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবে কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার বিশাল পার্থক্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

তাঁর সেই পর্যবেক্ষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল কতগুলো শুকনো আইনি বিধান দিয়ে চলতে পারে না। বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি রাজনৈতিক দলের আচরণ, জনগণের সম্মতি এবং দীর্ঘদিনের চর্চাও তাদের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে।

আমাদের দেশের মূল সমস্যাটি ঠিক এই জায়গাতেই নিহিত রয়েছে। আমরা সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা তর্কে লিপ্ত হই, কিন্তু সাংবিধানিক রীতিনীতি ও রাজনৈতিক সংযমের মৌলিক প্রশ্নের বেলায় প্রায়ই সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করি।

সংবিধানের শুধু অক্ষরগুলোকে সামনে রেখে যদি তার অন্তর্নিহিত পবিত্র চেতনাকে নিয়মিত উপেক্ষা করা হয়, তবে সাংবিধানিকতার বাহ্যিক কাঠামো হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু তার আসল প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ক্ষয় হয়ে যাবে।

পরিশেষে বলা যায় যে সংবিধান কেবল কোনো ভারী বইয়ের পাতায় বন্দী থাকার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি মুহূর্তের বাস্তব চর্চায় থাকতে হবে। সাংবিধানিক সংস্কৃতি বা কনস্টিটিউশনাল কালচার বলতে মূলত সেই অবস্থাকে বোঝায় যেখানে সংবিধানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, সকল রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। সংবিধান কেবল কোনো আইনজীবী, বিচারক কিংবা পেশাদার রাজনীতিবিদদের আলোচনার একচেটিয়া বিষয়বস্তু নয়; এটি এই রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
৩৪ বছর বয়সে মারা গেলেন আলোচিত অস্ট্রেলীয় মডেল সাহারা রে

৩৪ বছর বয়সে মারা গেলেন আলোচিত অস্ট্রেলীয় মডেল সাহারা রে