নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক উদ্যোগে জয়ী হওয়ার পূর্বশর্তটি বর্তমানে পুরোপুরি অনিশ্চিত ও ধূসর এক বিষয়ের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে নতুন করে সংঘাত শুরুর নানা লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ থামার সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট বা নির্ণায়ক জয় ছাড়াই যদি এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে, তবে তা কোনো পক্ষের জন্যই চূড়ান্ত বিজয় বা পরাজয় বয়ে আনবে না। আর ঠিক এই অবস্থাকেই তেহরানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সাফল্য হিসেবে মূল্যায়ন করা সম্ভব।
যুদ্ধের এমন সম্ভাব্য পরিণতি ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে। বর্তমান বিশ্ব যখন ক্রমেই একমেরুকেন্দ্রিক অবস্থা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন এই রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য, ক্ষমতা অর্জনের হিসাব-নিকাশ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটাতে পারে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ানকে যখন বিগত দুই দশক ধরে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া এবং তা বারবার পিছিয়ে দেওয়ার মূল কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি জানান যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এমন কোনো নির্বাচনের অনুকূলে নেই। তাঁর এই বক্তব্য মূলত ফিলিস্তিনি প্রশাসনের ভেতরের গভীর রাজনৈতিক সংকটের দিকটিকেই স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন ধরে ভোটগ্রহণ না হওয়া, জনগণের যথাযথ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং নেতৃত্বের জবাবদিহিতার ঘাটতি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনকে সামগ্রিকভাবে বেশ দুর্বল করে তুলেছে।
পাশাপাশি, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পালাবদলের ওপর ফিলিস্তিনিদের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বড় ধরনের সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে।
ফিলিস্তিনিদের কাছে ইসরায়েলি নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়, কারণ এর চূড়ান্ত ফলাফল তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অবাধ চলাচল, কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিজ ভূখণ্ড এবং ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে থাকে। কিন্তু ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনের নির্দিষ্ট কোনো শিবির বা পক্ষ ক্ষমতায় এলেই ফিলিস্তিনিদের কাঙ্ক্ষিত সমস্যার সমাধান অবধারিতভাবে মিলে যাবে—এমন ধারণা পুরোপুরি বাস্তবতাবিবর্জিত ও অমূলক।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য পরাজয় ইসরায়েলের সবচেয়ে চরমপন্থী রাজনৈতিক ধারাটির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে বটে, তবে এর মানে এই নয় যে এটি দেশটির সামগ্রিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের পরাজয়। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো মূলত জায়নবাদী কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা আবর্তিত হচ্ছে ডানপন্থী এবং আরও অধিকতর চরম ডানপন্থী শক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে।
এই পুরো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ফিলিস্তিনিদের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, নেতৃত্বগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তোলার তাগিদকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। নির্বাচন আয়োজন, নেতৃত্বে পরিবর্তন কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে না থেকে যদি ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্য পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্যদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপরই নির্ভরশীল থেকে যাবে।
যদি গাদি আইজেনকট কখনো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সীমিত পরিসরে সহযোগিতা বজায় রাখা, আটকে রাখা রাজস্বের অর্থ ছাড় করা, ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং গাজা উপত্যকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রতি তুলনামূলক নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করা। এ ছাড়া আরব দলগুলোর পক্ষ থেকে পাওয়া সংসদীয় সমর্থন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু সংস্কার সাধন ও নাগরিক অধিকার আদায়ের নতুন সুযোগ উন্মুক্ত করতে পারে।
তবে এই ধরনের সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলোকে ফিলিস্তিন ইস্যুসংক্রান্ত ইসরায়েলের মূল রাষ্ট্রীয় নীতির কোনো মৌলিক রূপান্তর হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থান কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অনুকূল নয়। এমনকি তাঁর সম্ভাব্য কোনো সরকারের মূল লক্ষ্যও পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপন প্রকল্প চিরতরে বন্ধ করা কিংবা ফিলিস্তিনিদের পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে না। বরং নিজ ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলি একক নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি অপেক্ষাকৃত সংযত কৌশল গ্রহণের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
এখানে সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো নেতানিয়াহু একা কেবল ইসরায়েলের ফিলিস্তিননীতির একমাত্র স্রষ্টা বা নির্মাতা নন। তিনি মূলত দেশটির প্রচলিত রাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি অত্যন্ত প্রকাশ্য ও আগ্রাসী বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাই তাঁর বিদায়ের মাধ্যমে সেই কাঠামোগত বাস্তবতার সমস্ত ভিত্তি রাতারাতি ভেঙে পড়বে না। কারণ ইসরায়েলের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল অংশ এবং দেশের সাধারণ ইহুদি ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার পাশাপাশি সামরিক শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করার বিষয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত ঐকমত্য বিদ্যমান রয়েছে।
সুতরাং, গাদি আইজেনকট প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আগ্রাসন পরিচালনার ভাষা, কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আসলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
নেতানিয়াহুর পতন ইসরায়েলের উগ্র চরমপন্থী রাজনীতির জন্য একটি রাজনৈতিক বিপর্যয় হতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনের ওপর চলা ইসরায়েলি অবৈধ দখলদারত্বের চিরতরে অবসান নয়। মূলত শাসকের মুখ বদল হলেই কোনো রাষ্ট্রের মূল চরিত্র বদলে যায় না। আর ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে রয়েছে ঠিক এখানেই: আগ্রাসন যদি প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে কূটনৈতিক সংযমের নান্দনিক মুখোশ পরে হাজির হয়, তবে তাকে ভুলবশত শান্তি বলে মনে করার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর