ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ছয় দশক পর বাংলায় এল দ্য বেঙ্গলি নভেল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
ছয় দশক পর বাংলায় এল দ্য বেঙ্গলি নভেল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটি অব ভিকডনসিনে ১৯৬৭ সালে প্রদত্ত চারটি বিশেষ ভাষণের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল একটি অনন্য গ্রন্থ, যা পরবর্তীতে কলকাতা থেকে 'দ্য বেঙ্গলি নভেল' শিরোনামে আলোর মুখ দেখে। প্রায় ছয় দশক বা ষাট বছর দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর বরেণ্য অনুবাদক সুব্রত বড়ুয়া অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে সেটিকে মাতৃভাষা বাংলায় রূপান্তর করেছেন। মূল বক্তৃতার চারখানি ভিন্ন অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং পরবর্তী সময়ের সমকালীন ঔপন্যাসিকবৃন্দের বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলা কথাসাহিত্যের ক্রমবিকাশকে একটি সুসংবদ্ধ ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন। প্রাবন্ধিক এই বিশেষ শিল্পরীতিকে আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মপ্রকাশ এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে প্রতিটি সাহিত্যিককে তাঁর নিজস্ব শ্রেণিগত অবস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং সময়ের পরিধಿಯ ভেতর থেকেই বিচার করা হয়েছে।

গ্রন্থটির প্রথম ভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা কথাসাহিত্যের আদি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির নেপথ্যে সক্রিয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। সেই সময়কার ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা, পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষার গভীর প্রভাব, সামাজিক নবজাগরণের চেতনা এবং উদীয়মান বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ কীভাবে কথাসাহিত্যের জন্মলগ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল, গবেষক তা অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক ও সামাজিক কাহিনিগুলোর মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেখক মূলত তাঁর অনন্য শিল্পীসত্তা এবং রক্ষণশীল নীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্বকে সবার সামনে উন্মোচন করেছেন। এই ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতে বাস্তব ইতিহাসের চেয়ে রোমান্টিক কল্পনার বিস্তার অনেক বেশি প্রাধান্য লাভ করেছে এবং সেগুলোর বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ ও আচরণে মূলত উনিশ শতকের উদীয়মান মধ্যবিত্ত মানসের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।

বিশেষ করে 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্কান্তের উইল', 'চন্দ্রশেখর' কিংবা 'দেবী চৌধুরাণী'-র মতো বিখ্যাত উপন্যাসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্কিম যখনই কোনো সমাজবিদ্রোহী অথবা স্বাধীনতাপ্রিয় নারী চরিত্র যেমন শৈবলিনী বা রোহিণী সৃষ্টি করেছেন, তখনই তাঁর ভেতরের সনাতন প্রথাগত নীতিবাদী সত্তা জয়ী হয়েছে এবং ওই চরিত্রগুলোকে এক অনিবার্য ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের কথাসাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন এবং একে আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যধারার মুখোমুখি সগর্বে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে বঙ্কিমের ঐতিহাসিক অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না এবং তা অত্যন্ত অপরিসীম।

পরবর্তী অর্থাৎ দ্বিতীয় অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের বিশাল ও বিস্তৃত জগৎকে অনেক বেশি দার্শনিক ও গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন কীভাবে রবীন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যের ধারাকে বঙ্কিমচন্দ্রের দেখানো ইতিহাস ও সংকীর্ণ সামাজিক আবহের গণ্ডি থেকে বের করে এনে বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ দান করেছেন। এই পর্বে রবীন্দ্র-উপন্যাসে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সংকট, পারিবারিক নানা জটিল সম্পর্ক এবং ব্যক্তি বনাম সমাজের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে প্রাধান্য লাভ করেছে। বিশিষ্ট সমালোচকের সুচিন্তিত মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপন্যাসকে নিছক ঘটনানির্ভরতার স্তর থেকে উন্নীত করে অনুভূতিনির্ভরতা ও চরিত্রকেন্দ্রিকতার এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

'চোখের বালি' উপন্যাসের বিনোদিনী চরিত্রটি আধুনিক নারীর এক পরিপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং 'গোরা' নিঃসন্দেহে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তী সময়ে 'চতুরঙ্গ', 'ঘরে-বাইরে' ও 'শেষের কবিতা'র ভাষা অত্যন্ত ঝকঝকে হলেও এসব রচনায় অনেক সময় চরিত্রগুলো লেখকের নিজস্ব মুখপাত্র হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এমনকি 'দুই বোন' ও 'মালঞ্চ' উপন্যাসের ভেতরের চরম নিষ্ঠুরতাকে কবি তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তের নৈরাশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ 'গোরা'-পরবর্তী রচনাগুলোতে বুদ্ধিবৃত্তিক আতিশয্য, চরিত্রের মুখপাত্রসুলভ ভূমিকা এবং শেষ পর্বের একধরনের নৈরাশ্য প্রবণতাকে হুমায়ুন কবির তাঁর নিজস্ব বিচারে একটি সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর পাশাপাশি, রবীন্দ্র-উপন্যাসে সমাজের বিত্তবান ও সংস্কৃতিমান শ্রেণির অতিমাত্রিক প্রাধান্য এবং সাধারণ দরিদ্র বাঙালিজীবনের ব্যাপক অনুপস্থিতির বিষয়টিও সমালোচকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি।

তৃতীয় ভাগে মূলত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বাস্তবধর্মী বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের পুরো সাহিত্যজগৎ আবর্তিত হয়েছে মূলত সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন, নানা সামাজিক অনাচার, পারিবারিক সংকট, প্রেম-ভালোবাসা, বিবাহ, সমাজে নারীর অবমূল্যায়িত অবস্থান এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের ক্রমাগত সংঘাতকে কেন্দ্র করে। তাঁর উপন্যাসের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার মূল নেপথ্যে কাজ করেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও আবেগপূর্ণ অনুভূতিগুলোকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করার এক অসাধারণ ও জাদুকরী ক্ষমতা। তবে প্রাবন্ধিক হুমায়ুন কবির শরৎচন্দ্রের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে কেবল একঘেয়ে আবেগনির্ভর কোনো সাধারণ সাহিত্যিক সাফল্য হিসেবে মূল্যায়ন করেননি। তাঁর সুচিন্তিত মতে, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নিহিত তীব্র সামাজিক প্রতিবাদ, মানবতাবাদী সহমর্মিতা এবং প্রচলিত রক্ষণশীল নৈতিকতার বিরুদ্ধে একজন সাধারণ ব্যক্তিমানুষের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে মূলত সমকালীন বাংলা উপন্যাসের নানা রূপান্তর ও আধুনিক ধারা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আধুনিক কথাসাহিত্যের এই রূপবদলকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে। আধুনিক মানুষের অন্তহীন অস্তিত্বসংকট, সমাজে শ্রেণিবিভাজন, যান্ত্রিক নগরজীবনের জটিলতা, পরিবর্তনশীল গ্রামীণ সমাজ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, যৌনতা, নারী ও পুরুষের জটিল সম্পর্ক এবং নানা রাজনৈতিক চেতনার বহুস্তরীয় দিক সমকালীন উপন্যাসে কীভাবে সফলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, লেখক সেই অন্বেষণে ব্রতী হয়েছেন। এই পর্যায়ে বাংলা উপন্যাসের বিষয়বস্তু এবং তার শিল্পাঙ্গিক উভয় ক্ষেত্রেই এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।

বাস্তবতার গতানুগতিক উপস্থাপন থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে মানুষের মনোজাগতিক চেতনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অস্তিত্বের যাবতীয় জটিলতাকে সরাসরি প্রকাশ করার এই সাহসী প্রবণতা আধুনিক উপন্যাসকে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দান করেছে। সমকালীন কথাসাহিত্যের এই সামগ্রিক বিশ্লেষণে লেখকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো কোনো সাহিত্যকর্মকেই তার নিজস্ব কাল বা সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে না দেখা। যেকোনো সাহিত্যিক উপাদানের সঠিক মূল্যায়নে তার সুনির্দিষ্ট সামাজিক পটভূমি, ঐতিহাসিক অবস্থান এবং মানুষের বহুমাত্রিক জীবন-অভিজ্ঞতাকে সর্বদাই বিবেচনায় নেওয়ার গভীর প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সার্বিকভাবে এই মূল্যবান গ্রন্থে গবেষক মূলত উপন্যাসকে বিচার করতে চেয়েছেন সমাজবিজ্ঞান, দর্শন এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড় তুলনার মাধ্যমে, আর বাংলা উপন্যাসের এই ধারাবাহিক বিবর্তনকে ফুটিয়ে তুলেছেন সুনির্দিষ্ট যুগবাস্তবতার নিরিখে। ফলে সূচনাপর্বের নানা সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে লেখক বঙ্কিমচন্দ্রকে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছেন, যার এক সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ থেকে শরৎচন্দ্র পর্যন্ত এই সামগ্রিক তুলনামূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশিষ্ট অধ্যাপক হুমায়ুন কবির রচিত 'বাঙলা উপন্যাস' নামক এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির মূল শক্তি মূলত নিহিত রয়েছে এর অত্যন্ত সুসংহত তুলনামূলক ও সমাজতাত্ত্বিক বিচারপদ্ধতির মধ্যে। পরিশেষে, সুব্রত বড়ুয়ার অত্যন্ত অনবদ্য অনুবাদ এবং স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির এই চমৎকার প্রকাশনা বাংলাভাষী সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের জন্য এক চিরস্থায়ী অমূল্য সম্পদ হিসেবে সমাদৃত হবে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড