ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 29, 2026 ইং
ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপামজয়ী খ্যাতিমান ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিকে একটি নতুন বিচারিক মামলায় পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন তেহরানের আদালত। একই সঙ্গে বিচারিক আদেশে তাঁর সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী দুই বছরের জন্য তাঁর বিদেশ গমন ও যেকোনো ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে এই নির্মাতা এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন, যার ফলে ৬৬ বছর বয়সী এই শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন আবারও মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবে বুধবার ২৮ অক্টোবর ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও মার্কিন বিনোদন সাময়িকী ভ্যারাইটি প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক এই নতুন মামলায় ঠিক কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

সংস্কারপন্থী ইরানি সংবাদমাধ্যম এমতেদাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পানাহির ডিফেন্স কাউন্সেল বা আইনজীবী মোস্তফা নিলি জানিয়েছেন যে, বিচারকগণ তাঁর মক্কেলের কোনো ধরনের উপস্থিতি ছাড়াই গোপনে এই নতুন মামলার রায় ঘোষণা করেছেন এবং আদালতের পক্ষ থেকে শুনানির নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কেও পানাহিকে পূর্বে কোনো ধরনের নোটিশ বা তথ্য দেওয়া হয়নি।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই জাফর পানাহির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবগুলো সম্পূর্ণ জব্দ করা হয় এবং এই আকস্মিক ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে তিনি স্বয়ং পানাহিকে সঙ্গে নিয়ে তেহরানের প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে যাওয়ার পরই তাঁরা জানতে পারেন যে আদালত ইতিমধ্যে তাঁর অনুপস্থিতিতে নতুন এই মামলার বিচারিক রায় প্রদান করেছেন।

ভ্যারাইটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচারিক মামলার মূল নথিতে নির্মাতা পানাহিকে ইরানের ভূখণ্ডের বাইরে বসবাসকারী একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অথচ তিনি নিজেই চলতি বছরের ৩০ মার্চ নিজ দেশ ইরানে ফিরে এসেছেন। বর্তমানের এই নতুন বিচারিক রায়ের পাশাপাশি তাঁর আগের সেই এক বছরের কারাদণ্ডাদেশটিও আইনগতভাবে বহাল রাখা হয়েছে, তবে এই দুটি আলাদা রায়ের সাজা কীভাবে বা কী প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি।

আইনজীবী মোস্তফা নিলি দ্য গার্ডিয়ান সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমানে পরিচালক পানাহির বিরুদ্ধে মোট তিনটি পৃথক মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ার নানা পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপে বসবাসকারী পানাহির একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন যে, গত সোমবার সন্ধ্যায় নির্মাতার সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা হয়েছিল এবং সেই সময় পর্যন্ত তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেনি। তবে এর পর থেকে বুধবার পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে তাঁকে আটকের সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে পরিচালক জাফর পানাহির ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার এই বিচারিক আদেশের বৈধতা নিয়েও গভীর আইনি প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের বিভিন্ন অধিকারকর্মীদের আইনি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দাদবানের মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী মইন খাজায়েলি দ্য গার্ডিয়ানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সম্পত্তির সঙ্গে আনীত অপরাধমূলক অভিযোগের যদি সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষ কোনো আইনগত সম্পর্ক প্রমাণ করা না যায়, তবে এ ধরনের বাজেয়াপ্তকরণের নির্দেশ সরাসরি ইরানের সংবিধানের মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করতে পারে।

এই নতুন রায় ঘোষণার পর থেকেই ইরানের চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন স্তরের শিল্পীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। মোহাম্মদ রাসুলফ পরিচালিত আলোচিত ‘দ্য সিড অব দ্য স্যাক্রেড ফিগ’ চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি দ্য গার্ডিয়ানকে নিজের মত প্রকাশ করে বলেছেন যে, পানাহির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতাদের সুনির্দিষ্ট গল্পগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়াই মূলত দেশের বর্তমান কতৃপক্ষের প্রধান অস্বস্তির মূল কারণ।

ইরানি বংশোদ্ভূত জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বনিয়াদিও আদালতের এই কঠোর রায়ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী, সুদীর্ঘ সময় ধরে নির্মাতা পানাহি তাঁর অনন্য চলচ্চিত্রের শক্তিশালী মাধ্যমের সাহায্যে ইরানের সাধারণ মানুষের বঞ্চনা, দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধের কথা তুলে ধরেছেন এবং এই নতুন কারাদণ্ড হলো তাঁর সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চিরতরে রুদ্ধ করার আরেকটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা মাত্র।

উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বর্ণপাম জয় করেছেন এই প্রভাবশালী ইরানি নির্মাতা। গত দুই দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধিকবার নিজ দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নানা আইনি বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়েছেন। ২০১০ সালে তাঁর ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যেকোনো ধরনের কথা বলা এবং বিদেশ ভ্রমণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।

তবে তৎকালীন সেই সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উপেক্ষা করে তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ কাজ চালিয়ে গেছেন। ‘দ্য সার্কেল’, ‘অফসাইড’, ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’, ‘ট্যাক্সি’ এবং ‘নো বেয়ার্স’-এর মতো বিশ্বমানের চলচ্চিত্রগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দারুণ খ্যাতি এনে দিয়েছে। ২০১৫ সালে ‘ট্যাক্সি’ ছবির কল্যাণে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার স্বর্ণভালুক জয় করেছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ‘থ্রি ফেসেস’ চলচ্চিত্রের জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ চিত্রনাট্য পুরস্কার অর্জন করেন পানাহি। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ইরানের বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে আটকের প্রতিবাদ জানানোর কারণে পানাহি নিজেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। প্রায় সাত মাস একটানা কারাবন্দী থাকার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি শেষ পর্যন্ত জামিনে মুক্তি লাভ করেন।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ নামক চলচ্চিত্রের সুবাদে কান উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম জয় করেন এই গুণী নির্মাতা। ছবিটি পরবর্তীতে ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ফ্রান্সের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিচারকদের মনোনয়নও লাভ করে। পানাহির নিজের বাস্তব কারাবাসের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ অনুপ্রাণিত হয়ে এই চলচ্চিত্রটির মূল চিত্রনাট্য তৈরি করা হয়েছিল।

ছবির গল্পে দেখা যায়, কয়েকজন সাবেক রাজনৈতিক বন্দী এক ব্যক্তিকে তাঁদের ওপর একসময়ে নির্যাতন চালানো কারারক্ষী বলে সন্দেহ করতে শুরু করেন। এরপর সুনির্দিষ্ট প্রতিশোধের স্পৃহা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের মতো জটিল বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে ছবির মূল কাহিনি সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

কারাদণ্ডের খড়্গ মাথায় নিয়েই ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন এই নির্মাতা। এর আগে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরানের আদালত পানাহিকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর ওপর বিদেশ ভ্রমণ এবং যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

সেই নির্দিষ্ট সময়ে তিনি তাঁর নতুন চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক প্রচারণামূলক কাজের জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের স্পষ্ট ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি চলতি বছরের মার্চ মাসে সাহসের সঙ্গে ইরানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশে ফেরার এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এর আগে তিনি মার্কিন সাময়িকী ভ্যারাইটিকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি নিজের জন্ম দেশেই চিরকাল থাকতে চান এবং সেখানেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান। এমনকি কারাদণ্ড কঠোরভাবে কার্যকর করা হলেও তিনি নিজের দেশে ফেরার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তন করবেন না।

এদিকে চলতি বছরের একেবারে শুরুর দিকে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া অন্য একটি সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ চরম সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে নিজের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এই চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, যদি সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন ও নির্যাতন অব্যাহত থাকে, তবে দেশের এই তীব্র সহিংসতার দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ প্রকাশিত এই বিচারিক রায় নির্মাতা জাফর পানাহির ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর নতুন করে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তবে বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, রায় বাস্তবায়নের সঠিক সময় এবং আগের এক বছরের কারাদণ্ডের সঙ্গে নতুন এই সাজা কীভাবে সমন্বয় করে কার্যকর করা হবে—এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইসরায়েলি নির্বাচনের প্রাক্কালে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের স্পষ

ইসরায়েলি নির্বাচনের প্রাক্কালে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের স্পষ