নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
পুরো দিনের চরম ব্যস্ততা ও শোকের মাঝে শায়ন্তীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর বাড়ি ফিরে এশার নামাজে দাঁড়ান শামীম। আসরের পর দাফন শেষে দীর্ঘ সময় কবরস্থানে কাটানোর পর মাগরিবের অব্যবহিত পরেই তারা সকলে আবাসস্থলে ফেরেন। ড্রয়িংরুমে জায়নামাজে দাঁড়িয়েই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তার মুঠোফোনে একটি কল আসে। সারাদিন অজস্র অজানা নম্বর থেকে ফোন আসার কারণে তিনি কিছু ধরতে পেরেছিলেন ও কিছু মিস করেছিলেন, কিন্তু এই নির্দিষ্ট ফোনটির দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সোফায় বসে সংযোগটি গ্রহণ করেন।
প্রান্ত বদল হতেই অপর পাশ থেকে এক ব্যক্তি জানতে চান এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যবহৃত মুঠোফোন কি না, যার জবাবে তিনি নিজের পরিচয় দেন। কথা বলার কণ্ঠস্বর শুনেই তিনি বুঝতে পারেন কলদাতা কে এবং তাকে কী বলতে পারেন, তাই শান্তভাবে তাকে কথা বলার আহ্বান জানান। এমদাদ নামের সেই ব্যক্তি অত্যন্ত উত্তপ্ত কণ্ঠে অভিযোগ করেন যে আজ তার সন্তানকে কবরে শায়িত করা হলেও তাকে কোনো তথ্য জানানোর আবশ্যকতা বোধ করা হয়নি।
উত্তেজিত কণ্ঠের অভিযোগ শোনার সময় তিনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি ফেলেন, যেখানে পাশের বাড়ির রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান কেউ মশলা পিশছে এবং শব্দ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে নিশ্চিত করেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই বিষয়টি জানাননি। এই আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য নানা প্রস্তুতি নিয়ে রাখা কলদাতা প্রথমে একটু স্তব্ধ হয়ে যান, কারণ তিনি ভেবেছিলেন তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং তার বাবা হিসেবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।
ক্রোধ সংবরণ করে অপর প্রান্তের ব্যক্তি জানতে চান কেন এমন তথ্য গোপন রাখা হলো, যার জবাবে তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে আজ সন্তান হারিয়েছে পরিবার এবং এই মুহূর্তে মৃত ব্যক্তির আত্মার মাগফিরাত কামনা করার সময়। এই কথা শুনে এমদাদের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেন যে তিনি সব জেনেও কেন তাকে বাদ দিয়ে দাফন সম্পন্ন করলেন।
উত্তেজনাপূর্ণ কথোপকথনের মাঝে এমদাদ নিজের পিতৃত্বের অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে শামীম শান্তভাবে তা স্বীকার করেন, কিন্তু না জানানোর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দেখাতে পারেননি। কথপোকথনের একপর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়ার সময়কাল নিয়ে আলোচনা শুরু হলে জানা যায় যে মারণরোগটি এক বছর আগে ধরা পড়েছিল এবং সেটি ছিল হাড়ের ক্যানসার বা বোন ক্যানসার।
অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়া অসুস্থ মেয়েটির ব্যথার উপশমের জন্য নিয়মিত ইনজেকশন দেওয়া হতো এবং শেষ এক মাস তিনি প্রার্থনা করেছিলেন যেন এই যন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এমদাদ নরম সুরে জানতে চান সন্তানটি কখনো তার খোঁজ করেছিল কি না এবং তার ঠিকানা বা ফোন নম্বর জানতে চেয়েছিল কি না।
শামীম জানান যে তার সন্তান একবার তার অবস্থান এবং মুঠোফোন নম্বর জানতে চেয়েছিল এবং তিনি তা তাকে সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু এর বেশি কিছু ঘটেনি এবং অসুস্থ মেয়েটি কখনো সামাজিকভাবে বা সরাসরি দেখা করার কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেনি বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শামীমের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগের রাতের এক করুণ দৃশ্য, যেখানে মারাত্মক অসুস্থ শায়ন্তী হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল এবং কোনো খাবার গ্রহণ করতে না পেরে নল দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। নিশ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হওয়ায় সে হাঁপাতে থাকে এবং তার সেই কষ্টকর মুহূর্তের কথা মনে করে তিনি চোখ বন্ধ করেন।
আলোচনার একপর্যায়ে এমদাদ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে হয়তো তাকে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং তাকে আসল পিতার কাছে আসতে দেওয়া হয়নি, যা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়। সন্তানের মুখে পিতার নাম উচ্চারিত হওয়ার কথা উঠে এলে এমদাদ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং অভিযোগ করেন যে তার সন্তান ও তার স্ত্রী রূপাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
শামীম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি কাউকে ছিনিয়ে নেননি এবং রূপার চলে যাওয়া বা ঘর ছাড়ার ঘটনাটি ছিল অন্য এক পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিণতি। অতীতের কোনো সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে আনা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে অপ্রয়োজনীয় বা অসত্য অভিযোগের বিপরীতে সোজাসাপটা না বলতে বাধ্য হন তিনি।
কোনো রকম অজুহাত বা মিথ্যা যুক্তির আশ্রয় না নিয়ে সরলভাবে না জানার কথা স্বীকার করার কারণে এমদাদের আক্রমণের সমস্ত স্পৃহা ও ক্ষোভের তীব্রতা অনেকটা কমে আসে। শামীমের এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ও শান্ত মনোভাবের সামনে পড়ে ঝগড়া করার বা আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর