ঢাকা | বঙ্গাব্দ

৭ নভেম্বরে জাসদের পতন ও কর্নেল তাহেরের ভুল হিসাব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
৭ নভেম্বরে জাসদের পতন ও কর্নেল তাহেরের ভুল হিসাব ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

যেকোনো ধরনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো জনমত ও পর্যাপ্ত জনবলকে নিজ পক্ষে নিয়ে আসা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে জাসদের অভ্যুত্থান সফল করার মতো যথেষ্ট শক্তি বা জনবল তাদের নিজেদের অনুকূলে ছিল না। মূলত ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের বিরুদ্ধে পরিচালিত পাল্টা অভ্যুত্থানটিই জাসদের রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে আঘাত হেনেছিল। আর এই ঘটনার মধ্য দিয়েই জাসদের রাজনৈতিক সম্ভাবনার সম্পূর্ণ সমাপ্তি ঘটেছিল। তৎকালীন সময়ের জাসদ কর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতা থেকে জানা যায় যে, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তে জাসদ এই অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়নি। বরং কর্নেল তাহেরের একান্ত একক সিদ্ধান্তেই নভেম্বরের উত্তাল ঘটনাবৃত্তে জড়িয়ে পড়েছিল জাসদ। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কর্নেল তাহেরের সঙ্গে দলের গুটি কয়েক শীর্ষ নেতা সম্পৃক্ত ছিলেন।

বিশিষ্ট লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ নামক গ্রন্থে বিশদভাবে লিখেছেন যে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সকালে কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনু সরাসরি সেনানিবাসে গিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সেই সময় জিয়াউর রহমান জাসদের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন দলের প্রধান নেতা সিরাজুল আলম খান সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ ছিলেন। তাঁর এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে এটিই ধারণা করা হয় যে, সিরাজুল আলম খান মূলত কর্নেল তাহেরের সাফল্যের ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দिহান ছিলেন এবং কোনোভাবেই এই বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় নিজেকে জড়াতে চাননি। এভাবেই শেষ পর্যন্ত কর্নেল তাহেরের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের চড়া মূল্য চুকাতে গিয়ে জাসদের রাজনীতি তার যথাযথভাবে বিকশিত হওয়ার আগেই পতনের শেষ ধাপে এসে উপনীত হয়েছিল।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জাসদের পক্ষ থেকে যোগাযোগের মূল সেতুটি রক্ষা করতেন মেজর জলিল। কিন্তু দুর্ভাগবশত মেজর জলিল জেলবন্দী হয়ে পড়লে কর্নেল তাহের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ওই সময়ে দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মাঝে চরম মাত্রায় অসন্তোষ ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুকরণে 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' নামক ব্যানারে একধরনের গোপন গণবাহিনী গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন কর্নেল তাহের। পরবর্তীতে ১৯৭৫-এর নভেম্বর মাসে ওই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তিনি পাল্টা অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর্নেল তাহারের হিসাবে বিরাট এক মারাত্মক ভুল ছিল। সামরিক বাহিনীতে জিয়াউর রহমানের প্রকৃত জনপ্রিয়তা এবং সেনাবাহিনীর অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের তখনকার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে সম্ভবত তাঁর পরিষ্কার কোনো ধারণা বা সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। এমনকি সাধারণ সেনাদের ওপরও তাঁর কোনো পূর্ণ বা কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, খালেদ মোশাররফও অবিকল একই ভুল করেছিলেন। সেনাবাহিনীর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ অবস্থান এবং জিয়ার ব্যাপক জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সম্ভবত তিনিও মারাত্মক ভুল হিসাব করেছিলেন। যে কারণে এই দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বই শেষ পর্যন্ত ৭ নভেম্বরের বাস্তব ঘটনাবৃত্তের আড়ালে হারিয়ে যান। পরিণামে খালেদ মোশাররফ অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হন এবং কর্নেল তাহের রাজনীতির ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে পড়ে যান।

বরং ৭ নভেম্বর প্রকৃত বাস্তবতায় সামরিক বাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগেই জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করেছিলেন। যাঁরা আদতে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেছিলেন, পরবর্তীতে তাঁরাই তাঁর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, জাসদের পক্ষে এককভাবে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যদিও পরবর্তী সময়ে জাসদের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয় যে, তারাই মূলত জিয়াকে মুক্ত করেছিল। জাসদের এই দাবির বিপরীতে খুব জোরালোভাবে বলাই যায় যে, বরং জিয়ার ব্যক্তিগত উচ্চ জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই জাসদ তৎকালীন সময়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। কিন্তু বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা কর্তৃক সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খুব দ্রুতই কর্নেল তাহের কিংবা জাসদ সেই সময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনাবৃত্তের ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। চারদিকে একধরনের তীব্র বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। পরিশেষে সামরিক বাহিনী ও সাধারণ দেশবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগের ফলেই জাসদের ক্ষমতা দখলের সুদূর প্রসারী চক্রান্ত পুরোপুরি ভেস্তে গিয়েছিল।

সে সময় জিয়াউর রহমানের সমর্থনে সামরিক বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যসহ সাধারণ দেশবাসী দলে দলে রাজপথে নেমে এসেছিল। কারণ জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন পরীক্ষিত রণাঙ্গনের লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। যিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে সূচনালগ্নে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। প্রচলিত আছে যে ভাগ্য সবসময় সাহসীদের পক্ষেই থাকে, আর জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৯৭১ সালের অন্যতম অমিত সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। মূলত এই সমস্ত ঐতিহাসিক কারণগুলোর জন্যই সাধারণ মানুষের মনে জিয়ার প্রতি এক গভীর ও অটুট আস্থা তৈরি হয়েছিল। আর জনগণের এই পুঞ্জীভূত আস্থাই ১৯৭৫-এর উত্তাল নভেম্বরে জিয়াকে বন্দী অবস্থা থেকে সসম্মানে মুক্ত করে দেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

এর পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করে আমূল বদলে দিয়েছিলেন পুরো বাংলাদেশকে। নানান ধরনের বাস্তবমুখী রাজনৈতিক ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেশকে এক নতুন অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা যে মহান সোনালী স্বপ্ন ধারণ করে স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তার বাস্তব রূপায়ণ শুরু হয়েছিল এই সময়েই। দীর্ঘদিনের একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষ এই দেশের মাটিতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শুভ সূচনা ঘটেছিল। স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি পুনরায় দ্রুত গতি ফিরে পেয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি ও নিরাপত্তার সুবাতাস ফিরতে শুরু করেছিল। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন একদলীয় বাকশালের অবদমনের শাসনব্যবস্থার পর ৭ নভেম্বরই মূলত এই দেশের মাটিতে প্রকৃত গণতন্ত্রের মিষ্টি স্বাদ ফিরিয়ে এনেছিল।

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
ছাগলনাইয়ায় সরকারি পুকুর থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

ছাগলনাইয়ায় সরকারি পুকুর থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার