ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মোরাল পুলিশিংয়ের প্রতিবাদে খিলক্ষেতের দণ্ড বাতিলের দাবি বিশিষ্টজনদের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 25, 2026 ইং
মোরাল পুলিশিংয়ের প্রতিবাদে খিলক্ষেতের দণ্ড বাতিলের দাবি বিশিষ্টজনদের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রাজধানীর খিলক্ষেতে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। গোয়েন্দা পুলিশের এই অভিযানে ২৬ জন নারীসহ সর্বমোট পঁচাশি জনকে আটক করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রiyay তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এই পুরো ঘটনায় গভীর উৎকণ্ঠা ও তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট একশো একজন নাগরিক।

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিবৃতিতে অবিলম্বে আটক ও দণ্ডিত সব ব্যক্তিকে কারামুক্ত করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা রক্ষা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করার ব্যাপারেও কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন বিবৃতিদাতারা।

রোববার গণমাধ্যমের নিকট পাঠানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে পরিচালিত এই অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনজীবীর সঙ্গে আইনি পরামর্শ নেওয়ার নূন্যতম সুযোগ না দেওয়ার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কার বা কাদের নির্দেশনায়, কী সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এবং কোন আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এই অভিযান চালানো হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা।

সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক পুরুষদের ত্রিশ দিন এবং নারীদের পনেরো দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ঠিক কী সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং কোন মজবুত প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছেন, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনে একেবারেই অস্পষ্ট ছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়েছে যে, মাদকবিরোধী অভিযানের কথা বলে পুলিশ বাহিনী ক্যামেরাসহ কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সামাজিক আয়োজনে হানা দিচ্ছে। সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষা করার পরিবর্তে তাদের ছবি ও ব্যক্তিগত পরিচয় সংবাদমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে, যা আইনসম্মত নয়।

অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই গণমাধ্যমে তাদের মাদকসেবী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে প্রকাশ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষার অধিকারকে দারুণভাবে ব্যাহত করে। আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই জনসমক্ষে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা মূলত বিচার শুরুর আগেই সামাজিক শাস্তির নামান্তর মাত্র।

দেশের প্রচলিত আইনে ব্যক্তিগত পরিসরে একত্রে আড্ডা দেওয়া, গান বাজনার আসর বসানো কিংবা নারী-পুরুষের যৌথ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কোনোভাবেই অপরাধের আওতাভুক্ত নয়। নাগরিকের পোশাক-আশাক, জীবনযাপনের ধরণ কিংবা বিনোদনের পছন্দকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

আইন প্রয়োগের আড়ালে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের হেয় করার এই প্রক্রিয়াকে ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নৈতিকতার নামে এক ধরণের পুলিশি নিয়ন্ত্রণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সামনে এনে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আইনের সুরক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাংবিধানিক নিশ্চয়তাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের গৃহের সুরক্ষা এবং অনধিকার প্রবেশ ও তল্লাশির বিরুদ্ধে আইনগত অধিকার রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মোট চার দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মামলার এজাহার, জব্দতালিকা এবং প্রদত্ত দণ্ডাদেশের অনুলিপি দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি ভিত্তির ঘাটতি থাকলে দণ্ড বাতিল করতে হবে। চতুর্থত, ছবি ও তথ্য প্রচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।

নাগরিকের স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়। নৈতিকতার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ এবং প্রমাণ ছাড়া গণহারে শাস্তি দেওয়ার এই অপসংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

উল্লেখ্য, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি প্রদানকারী একশো একজন নাগরিকের মধ্যে লেখক, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় নাম রয়েছে ইফতেখারুজ্জামান, শামসুল হুদা, নূর খান লিটন, খুশী কবির, আনু মুহাম্মদ, শহিদুল আলম, তানজীমউদ্দিন খান, কামরুল হাসান মামুন, সামিনা লুৎফা, ফাহমিদুল হক, সারা হোসেন, রেহনুমা আহমেদ, কল্লোল মোস্তফা ও দিলরুবা শরমিনসহ বিশিষ্টজনেরা।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দিনাজপুরে দুর্ঘটনা এড়াতে গতিরোধক রাঙাল বন্ধুসভা

দিনাজপুরে দুর্ঘটনা এড়াতে গতিরোধক রাঙাল বন্ধুসভা