নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সারাজীবনের জমানো অর্থ ব্যয় করে ঢাকার আশপাশে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত পেশাজীবী প্রবীণ মজুমদার। বিকਰপক্ষের সরবরাহ করা নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাঁর ধারণা জন্মেছিল যে সব প্রক্রিয়া সঠিক রয়েছে। চুক্তি সম্পাদনা ও দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পরও তিনি কোনো ধরনের সংশয়ে ছিলেন না; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে সক্ষম হন যে ওই আবাসনটির ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা বিদ্যমান। যে আবাসনকে তিনি নিজের স্থায়ী নিবাস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, সেটিই তাঁর জন্য পরবর্তীতে আইনি ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রবীণ মজুমদারের মতো এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি যেকোনো ক্রেতার সঙ্গেই ঘটতে পারে। সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কোনো বাসস্থান ক্রয়ের সময় কেবল ভবনের গঠনশৈলী, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা অর্থমূল্য বিবেচনা করলেই যথেষ্ট হয় না; বরং বাসস্থানের স্বত্ব, সব ধরনের আইনি দলিল, বৈধ অনুমোদন, সম্পত্তি বন্ধক আছে কি না, দলিলের নিবন্ধন এবং চুক্তির প্রতিটি শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত আবশ্যক।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ তানজিম আল ইসলামের অভিমত হলো, আবাসন ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা ব্যক্তি হোন কিংবা কোনো আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হোন না কেন, তাঁদের স্বত্ব বা আইনি বৈধতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সর্বাগ্রে প্রয়োজন।
যে জমির ওপর সংশ্লিষ্ট বাসস্থানটি নির্মিত হয়েছে, সেই ভূমির মালিকানা ও আনুষঙ্গিক নথিপত্রও যাচাই করতে হবে। স্থানীয় ভূমি অফিসে তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে জমির স্বত্ব ও দখলসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানা সম্ভব। এর পাশাপাশি বাসস্থানের জমির দলিল সঠিক আছে কি না, বিক্রেতা বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত স্বত্ব রয়েছে কি না এবং স্থাবর সম্পত্তিটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বন্ধক রাখা হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পের সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক। প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক অনুমতি আছে কি না, সেটিও সুনিশ্চিত করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক এলাকার ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তবে নির্মিত কাঠামোর মিল আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তিপত্র সম্পাদন ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিষয়। কেবল মূল্য ও আয়তন উল্লেখ করলেই চুক্তি সম্পন্ন হয় না। আবস্থানের বিবরণ, পরিমাপ, নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী, অনুমোদিত নকশা, হস্তান্তরের নির্দিষ্ট সময়সীমা, গাড়ি রাখার স্থান, সেবাভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা এবং অন্যান্য শর্ত সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকা উচিত।
আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ফ্ল্যাট কেনার প্রক্রিয়া শুরুর সময়ই আইনি সহায়তা নিয়ে চুক্তি করা বুদ্ধিমানের কাজ। চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের বিষয়ে ক্রেতাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, কারণ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তা থেকে সরে আসা প্রায়শই জটিল হয়ে ওঠে।
দলিল নিবন্ধনের পূর্বে আবাসনটির সব তথ্য পুনরায় যাচাই করা বাঞ্ছনীয়। বিক্রেতার পরিচয়, স্বত্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র, পরিমাপ, অবস্থান, খতিয়ান ও দাগ নম্বর এবং অন্যান্য বিবরণ দলিলে নিখুঁতভাবে লেখা আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখতে হবে। বাসস্থানটি পূর্বে অন্য কারও কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে কি না বা কোনো মামলার বেড়াজালে আছে কি না, তাও দেখা দরকার।
গৃহঋণ বা হোম লোন নিয়ে ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে নথিপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা আবাসনটির আইনি অবস্থান ও স্বত্ব সম্পর্কে ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হয়।
প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানান, কোনো সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ মঞ্জুর করার পূর্বে ব্যাংক জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা, দলিলপত্র, নামজারি, কর পরিশোধের হালনাগাদ তথ্য এবং কোনো দায় বা মামলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে। পাশাপাশি আইনি বৈধতা ও বাজারমূল্য নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়।
এম নাজিম এ চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, মূল দলিল, বিক্রেতার স্বত্ব, দখল, অনুমোদিত নকশা এবং কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, তা স্বতন্ত্রভাবে আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করা অপরিহার্য। ব্যাংকের এই যাচাইপ্রক্রিয়া ক্রেতার সুরক্ষায় সহায়ক হলেও কেবল ঋণ অনুমোদন হয়েছে বলেই আইনি ঝুঁকি নেই বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়।
বাসস্থান ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার কথায় অতিমাত্রায় বিশ্বাস স্থাপন করে দ্রুত বায়না বা বুকিং করা সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। আকর্ষণীয় মূল্য বা স্বল্পসময়ের অফারের চাপ থাকলেও যথাযথ যাচাই ছাড়া অর্থ প্রদান করা উচিত নয়।
চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করা হলে আইন ও চুক্তির বিধান অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবাসন ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয়ে ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’ প্রযোজ্য হতে পারে। সালিসের ব্যবস্থা থাকলে সেই পথ বা প্রয়োজনে উপযুক্ত আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর