ঢাকা | বঙ্গাব্দ

২৬ বছর পর সীমান্তে মৃত বাবার দেখা পেলেন মেয়ে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 5, 2026 ইং
২৬ বছর পর সীমান্তে মৃত বাবার দেখা পেলেন মেয়ে ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

প্রায় ছাব্বিশ বছর ধরে নিজ জন্মদাতার সঙ্গে সামনাসামনি কোনো সাক্ষাৎ ঘটেনি এক সন্তানের। যদিও যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যমের কল্যাণে মুঠোফোনের পর্দায় নিয়মিতই কথা হতো তাঁদের মধ্যে এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে দূর থেকেই দেখা হতো মুখখানি। গত প্রায় সাত বছর যাবৎ বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানাতেই শুয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন সেই প্রবীণ পিতা। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার কারণে ভারতে গিয়ে বাবাকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি সেই নারীর।

সংসার জীবনের নানাবিধ অভাব-অনটন এবং ভারতে যাতায়াতের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসার খরচ সংগ্রহের অক্ষমতা মিটিয়ে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বয়োবৃদ্ধ বাবার সান্নিধ্যে যাওয়ার একটা পথ উন্মুক্ত হয়েছিল সেই মেয়ের জন্য। কিন্তু সেই উপস্থিতি কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক সীমানার শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে হলো এক ঠান্ডা নিথর দেহের।

গত বৃহস্পতিবার সকাল একাশটা নাগাদ মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সড়কের ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের নিকটবর্তী শূন্যরেখার বেলতলা নামক স্থানে এমন এক মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী হন দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়োজিত সদস্যরা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার স্থায়ী বাসিন্দা প্রয়াত মোনরুদ্দিন শেখের নশ্বর দেহাবশেষ অন্তিম মুহূর্তে দেখার মানসেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ফিরদৌসী খাতুন।

আজ থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কি পঞ্চাশ বছর পূর্বে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন ফিরদৌসী খাতুন। তাঁর স্বামী ইসরাফিলের বসতি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের সোনাপুর নতুনপাড়া এলাকায়। বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গেই ওই ঠিকানায় থিতু হন তিনি। অন্যদিকে তাঁর পিতা মোনরুদ্দিন শেখ সপরিবারে বসবাস করতেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামে। বার্ধক্যের তীব্র কোপে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। টানা সাত বছর ধরে শয্যাশায়ী থাকার পর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তিন পুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে ফিরদৌসী হলেন সবার জ্যেষ্ঠ সন্তান।

সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ফিরদৌসী খাতুন জানান যে, যখন তাঁর বিয়ে হয়েছিল, তখন বর্তমানের মতো এই আন্তর্জাতিক সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মিত হয়নি। সেই সময় কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে সীমান্ত পারাপার করে দুই দেশের মানুষ আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাতায়াত করতে পারত। তবে বর্তমান সময়ে ভারতে প্রবেশ করতে হলে যথাযথ পাসপোর্ট ও ভিসার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। তা সত্ত্বেও প্রযুক্তির সহায়তায় বাবা ও ভাইদের সঙ্গে নিয়মিত ইমো অ্যাপের মাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা হতো তাঁর।

পিতার শারীরিক অসুস্থতার দুঃখজনক অধ্যায় স্মরণ করে ফিরদৌসী আরও বলেন যে, বিগত প্রায় সাত বছর ধরে বৃদ্ধ পিতা বার্ধক্যের বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ বিছানাসংশ্লিষ্ট জীবন কাটাচ্ছিলেন। নিজ সন্তান লালনপালন ও সংসারের নানামুখী ঝামেলার জালে জড়িয়ে পড়ার কারণে তিনি অসুস্থ পিতার কাছে উপস্থিত হতে পারেননি। তাছাড়া তাঁদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে ভারতে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্যও তাঁদের ছিল না।

অতীতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ফিরদৌসী জানান, ২০০০ সালের মার্চ মাসে তিনি এবং তাঁর স্বামী দুজনে মিলে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রায় তাঁর স্বামীকে অবৈধভাবে দেশ অতিক্রম করার অভিযোগে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে কারাভোগের মেয়াদ শেষ মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা পুনরায় নিজ দেশ বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তাঁরা আর কখনো ভারতে যাওয়ার সাহস করেননি।

বয়োবৃদ্ধ পিতার মৃত্যুর সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যেকোনো মূল্যে অন্তত জীবনের শেষ সময়ে তাঁর মুখখানি দেখার তীব্র আকুলতা প্রকাশ করেন মেয়ে ফিরদৌসী। শোকার্ত পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ তথা বিজিবি এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ উভয়ের মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমানার শূন্যরেখায় মৃতদেহ দর্শনের এই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।

ভারতের ভূখণ্ড থেকে প্রিয়জন মোনরুদ্দিন শেখের মৃতদেহ নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হন তাঁর অন্যান্য স্বজনেরা। অপরপ্রান্ত থেকে বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ঠিক একই সময়ে সেখানে গিয়ে হাজির হন কন্যা ফিরদৌসী। সেই আবেগঘন মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি তদারকি করেন বিজিবির মুজিবনগর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন। অন্যদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব প্রদান করেন বিএসএফের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার।

চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের ছয় বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শোকস্তব্ধ পরিবারের পক্ষ থেকে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ বিচার করে এই আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় মৃত পিতার মরদেহ শেষবারের মতো দেখার অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
কক্সবাজারে নিয়ম লঙ্ঘন করে চলছে অর্ধশতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট

কক্সবাজারে নিয়ম লঙ্ঘন করে চলছে অর্ধশতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট