নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিদায় ও পলায়নের ঘটনা একটি সশস্ত্র সংগ্রামের অর্জনের সমতুল্য, তবে বৃহত্তর সংগ্রাম এখানেই সমাপ্ত হয়নি। সাম্য, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘ পথচলার সূচনা মাত্র এটি। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়া যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রাথমিক ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলা। বিগত স্বৈরশাসনের দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সেগুলো বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে শ্রীলঙ্কার আর্থিক পুনরুদ্ধার কিংবা নেপালের রাজনৈতিক রূপান্তরের তুলনা করলেও, সেই তুলনা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে তিউনিসিয়া কিংবা আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর বিগত অভিজ্ঞতার শরণাপন্ন হওয়া শ্রেয়। কারণ ওই নির্দিষ্ট দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও দীর্ঘ সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিটি অঙ্গ ধ্বংসের মুখে পড়েছিল।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচন কিংবা সরকার বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বহুবিধ প্রতিষ্ঠান, নিয়ম এবং কাঠামোর সুশৃঙ্খল সমাহার। বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে নিজ নিজ সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। দীর্ঘকাল ধরে দেশে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ অনুপস্থিত ছিল, যার দরুন বর্তমান প্রশাসনকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রশাসনিক বহুবিধ সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশাও পূরণ করতে হচ্ছে সরকারকে।
জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণ-অভুত্থানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল। জনসাধারণের কাছে গণতন্ত্রের প্রাথমিক অর্থ হলো তাদের অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ, যেখানে তারা নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি ও সরকার নির্বাচন করতে পারবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নাগরিকেরা এই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ চায়। পাশাপাশি, নির্বাচিত প্রশাসন যেন তাদের কল্যাণের বিষয়টি তদারকি করে, সেটিও জনগণের কাম্য। সচেতন নাগরিক সমাজ মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত।
বর্তমান প্রশাসনের আট মাসের কর্মকাণ্ড বিচার করতে হলে এই সমস্ত প্রত্যাশার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ যতটা অগ্রগতির আশা পোষণ করেছিল, বাস্তব প্রাপ্তি তার চেয়ে কিছুটা কম। তবে এর পাশাপাশি কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ শুরু হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে উপলব্ধি করেছি যে আমলাতন্ত্রের বড় একটি অংশের দীর্ঘকাল ধরে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক উপায়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের সঙ্গে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। নির্বাচিত দলের একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ইশতেহার থাকে এবং সেই ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক যন্ত্রপাতিকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, তা তাদের নতুন করে শিখে নিতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার।
রাজনৈতিক অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ ও সাধারণ নাগরিকেরা এখন প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। কখনো কখনো কিছু বক্তব্য শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে হতে পারে, তবুও প্রশাসন অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সেগুলো হজম করে চলেছে। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এই ধরনের সহনশীলতা অত্যন্ত অপরিহার্য।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে অর্থনীতিই সবচেয়ে নির্ধারক বিষয়। সাধারণ মানুষের আয় এবং জীবনযাত্রার মান বিপন্ন হয়ে পড়লে অন্য সব সমস্যা বহুগুণ ভারী হয়ে ওঠে। অত্যন্ত দক্ষ কোনো প্রশাসন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও নানা রকম সমস্যা থেকেই যায়, তবে অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে মানুষ সেই কষ্টের চাপ আরও তীব্রভাবে অনুভব করে থাকে।
বর্তমান সময়ে অর্থনীতির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিগত মাফিয়া সরকারের আমলের ভয়ংকর লুণ্ঠনের নেতিবাচক ফল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নানা প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকট। বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এই সংকটের মুখে পতিত হয়েছে যখন দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বিগত শাসনামলে অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চরম মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, অন্যদিকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য তাৎক্ষণিক সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও করছে। চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই প্রায় একান্ন লাখ পরিবারের কাছে বিশেষ ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসবে। প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি ভিজিএফ কর্মসূচি ও খাদ্য সহায়তা প্রকল্পের পরিধিও প্রসারিত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য হিসেবে চালের বরাদ্দ সরাসরি দ্বিগুণ করা হয়েছে। এই সমস্ত কল্যাণমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপে থাকা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও কূপ খননের কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। ভোলায় সদ্য আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করার ওপরও বিশেষ জোর দিচ্ছে প্রশাসন। সাধারণ মানুষ যাতে নিজেদের বাড়িতে খুব সহজেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে এবং উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় পর্যায়ে বিক্রি করতে পারে, সে জন্য নানা প্রণোদনা ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই সমস্ত বহুমুখী প্রচেষ্টার সুফল হয়তো রাতারাতি দৃশ্যমান হবে না। তবে জ্বালানি সংকটকে কোনোমতে সামাল দিতে পারলে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, যার ফলে নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গেলে ৫ আগস্টের আগের দিনগুলোতে পুলিশ বাহিনীকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সে কথা স্মরণ রাখতে হবে। বিগত সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীকে একধরনের সামরিক বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়েছিল, যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীকে যে ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সহজ কোনো কাজ ছিল না। আমার মূল্যায়নে, বর্তমান সময়ে পুলিশ বাহিনী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক ভালো দায়িত্ব পালন করছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রাথমিক সময়ের সঙ্গে তুলনা করলেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সেই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ দলগুলো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। বিভিন্ন স্থানে গান গাওয়ায় বাধা দেওয়া হচ্ছিল, নারীদের ফুটবল খেলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, এবং যাত্রা বা মেলার মতো লোকজ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত পণ্ড করা হচ্ছিল। এমনকি দেশের অন্যতম প্রধান কিছু মাজার ভয়ংকর সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল, যেখানে শতাধিক মাজারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়েছিল। এর বাইরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার কার্যালয়গুলোতে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হলেও পূর্বের প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব দর্শক হয়ে ছিল।
আজকের বাংলাদেশ সেই অন্ধকার অবস্থা থেকে প্রায় পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে। বিক্ষিপ্ত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে একেবারে ঘটছে না, তা নয়—যদিও সেগুলোর পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়। তবে সার্বিক বিবেচনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর