ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চিকিৎসক ও ওষুধের অভাবে ধুঁকছে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
চিকিৎসক ও ওষুধের অভাবে ধুঁকছে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের দীর্ঘদিনের অহংকার ছিল তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ফিদেল কাস্ত্রো স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিশাল নেটওয়ার্ককে সমাজতন্ত্রের অনন্য সাফল্য হিসেবে প্রচার করতেন এবং একসময় বিদেশে চিকিৎসক পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের চেষ্টা চালাতেন। যদিও চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে অতীতেও নানা সমালোচনা ছিল, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে চিকিৎসকের তীব্র ঘাটতি এবং ওষুধের চরম সংকটে দেশটির চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অসংখ্য চিকিৎসক দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

সান্তিয়াগো দে কিউবার উপকূলবর্তী কায়ো গ্রানমা দ্বীপে ৫৫ বছর বয়সী নার্স ক্লারা লুয়াসেসের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। প্রায় ৮৭০ জন দ্বীপবাসী ছাড়াও তাঁকে আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বও একা সামলাতে হয়। চিকিৎসকরা দ্রুত দেশত্যাগ করায় রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও নিজের কাজের পরিধি নির্ধারণ করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ছোট্ট চিকিৎসাকেন্দ্রে জ্বরে আক্রান্ত ১২ বছরের এক শিশুকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল এবং পাশেই ত্বকের সংক্রমণে ভোগা আরেকটি শিশু মায়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিল।

লুয়াসেস জানান, দ্বীপটিতে প্রায় তিন মাস ধরে পাইপলাইনের পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির মারাত্মক অভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বর এবং নানা ধরনের ত্বকের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধের সংকট তো রয়েছেই। সীমিত সম্পদ ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তাঁকে প্রতিদিন প্রায় অসম্ভব সব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকের চরম অভাব থাকায় অবসরে যাওয়ারও কোনো উপায় তাঁর নেই, কারণ তাঁর এই দায়িত্ব নেওয়ার মতো বিকল্প কেউ নেই।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সান্তিয়াগো দে কিউবায় সাধারণ মানুষের ভিক্ষাবৃত্তির দৃশ্য দেখে প্রতিবেদক গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন। সমুদ্রসৈকতে ৭৬ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা নারী ও তাঁর মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যাঁদের শারীরিক গঠন অত্যন্ত শীর্ণকায় ছিল। ওই নারী জানান, গত বছর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেটি মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁদের এই করুণ দশা শুরু হয়েছে।

কোনো ধরনের সরকারি সাহায্য না পেয়ে মা-মেয়ে এখন পেটের দায়ে রাস্তায় ভিক্ষা করছেন এবং সামান্য কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় প্লাস্টিকের খালি বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করছেন। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে একটি ছোট ঘরের ভেতর ধাতব খাটে বিছানার বদলে খটখটে কার্ডবোর্ড পেতে তাঁরা ঘুমাচ্ছেন এবং ঘরে জ্বালানোর মতো কোনো বৈদ্যুতিক বাল্বও নেই।

এই চরম পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। অতীতে কিউবায় কমিউনিস্ট সরকারের পক্ষে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে বিপ্লব রক্ষার কমিটিগুলো বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের কাছে সেই কমিটিগুলোর কথা জানতে চাওয়া হলে তাঁরা কেবল হাসাহাসি করেন এবং আগের তুলনায় সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা করতে তাঁরা এখন আর তেমন কোনো ভয় পান না।

বারাকোয়া সমুদ্রসৈকতে এক স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্যে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কমিউনিজম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। প্রথমে আশেপাশের মানুষের মুখে হাসি দেখা গেলেও একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি মন্তব্য করেন যে কিউবা যেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থমকে আটকে আছে, যেখানে মানুষের মনে কোনো আশার আলো নেই এবং কিউবান নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করাটাই তাঁর কাছে চরম দুঃখজনক বলে মনে হয়।

প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে অনেক সাধারণ মানুষই তাঁদের বর্তমান করুণ দশার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করেননি। বরং তাঁদের কেউ কেউ স্পষ্টভাবে জানান যে, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চেয়েও করোনাভাইরাস মহামারি তাঁদের অর্থনীতিতে অনেক বেশি মারাত্মক আঘাত হেনেছিল। মহামারির কারণে কিউবার লাভজনক পর্যটনশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ও প্রাপ্যতাও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।

আলাপকালে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী উল্লেখ করেন যে, অতীতে ভেনেজুয়েলা থেকে যে তেল সরবরাহ করা হতো, তা সাধারণ মানুষের নাগালে ঠিকমতো পৌঁছাত না। রাষ্ট্রে যখন সার্বিক সেবামূলক ব্যবস্থার চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের এই শূন্যতা পূরণ করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিউবায় একসময় ক্যাথলিক ধর্মের গভীর ও ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সরকার নাস্তিকতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করে এবং অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এমনকি বহু ধর্মপ্রাণ মানুষকে জোরপূর্বক পুনর্শিক্ষা শিবিরে পর্যন্ত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তবে বর্তমান সময়ে এসে, বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় ক্যাথলিক গির্জার পাশাপাশি ইভানজেলিক্যাল এবং পেন্টেকোস্টাল গির্জার প্রভাব ও সংখ্যা দ্রুত প্রসার লাভ করছে। বারাকোয়া অঞ্চলের এক ধর্মযাজকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকের ব্যবধানে শুধু অ্যাসেম্বলি অব গডস সম্প্রদায়ের গির্জার সংখ্যা মাত্র দুটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪০টিতে উন্নীত হয়েছে।

বারাকোয়ার পেন্টেকোস্টাল যাজক রাউল দে হেসুস মুনিওস মুন্ডার জানান যে তাঁর নিজস্ব মণ্ডলীতে নিয়মিত প্রায় ১ হাজার ১০০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন, তবে এর বাইরেও আরও বহু মানুষ নানাভাবে তাঁর কাছ থেকে সহায়তা পান। প্রতি সপ্তাহে তিনি তাঁর সহযোগী যাজকদের নিয়ে একটি বৈঠকে অংশ নেন এবং বিভিন্ন এলাকার অসুস্থ, খাদ্যসংকটে জর্জরিত ও ওষুধের প্রয়োজনে থাকা মানুষের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে তিনি দ্রুত সেই অসহায় মানুষগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

গত মে মাসে মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার জন্য ১০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা অনুমোদনের সময় একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিল যে, এই সমস্ত অর্থ সরাসরি বিতরণ করতে হবে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী এবং মানবিক সংস্থার মাধ্যমে। এই সরকারি নীতির ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। অবশ্য কিউবায় এই ধর্মীয় পুনর্জাগরণের পেছনে শুধু বিদেশি সহায়তার হাত রয়েছে বিষয়টি এমন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানে চরম ব্যর্থতা ও অবনতিও এর অন্যতম প্রধান কারণ।

অন্যদিকে, রাজধানী হাভানার একটি ক্যাথলিক বৃদ্ধাশ্রমে গেলে দেখা যায় যে একসময় সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিরাও আজ চরম অসহায় ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের অনেকের সন্তানই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, ফলে তাঁরা রাষ্ট্র ও পরিবার—উভয় দিক থেকেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

সেখানে ৬৫ বছর বয়সি এক সাবেক সেনাসদস্যের সঙ্গে কথা হয়, যিনি অতীতে অ্যাঙ্গোলায় দুই বছর অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বাহুতে চে গুয়েভারার একটি উল্কি আঁকা রয়েছে, যা তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে শখ করে করিয়েছিলেন। এককালের কੱাঠফাটা বিপ্লবসমর্থক এই বৃদ্ধ এখন দেশের বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতিতে ভীষণ ক্ষুব্ধ। তিনি দেশের সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

কিউবার বর্তমান গভীর সংকটের আরেকটি অত্যন্ত দুঃখজনক দিক হলো এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পুরোপুরি অবক্ষয়। সান্তিয়াগো শহরের ৮১ বছর বয়সি এক অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পী জানান যে, অতীতে এই শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন সংগীতের দলের সরব উপস্থিতি দেখা যেত। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে গানের জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থেকেও তিনি এখন আর সেই প্রাণবন্ত দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পান না।

প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাধারণ মানুষের মুখে শুধু তীব্র খাদ্যসংকট, মারাত্মক অসুস্থতা ও অনিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাটের দুঃখজনক চিত্রই উঠে আসেনি; এর পাশাপাশি বেরিয়ে এসেছে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দীর্ঘ হতাশা এবং জনজীবন থেকে সকল আনন্দ ও প্রাণচাঞ্চল্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক অনুভূতি।

দ্য আটলান্টিক পত্রিকার এই দীর্ঘ প্রতিবেদনের একদম শেষাংশে সান্তিয়াগো শহরের সান্তা ইফিজেনিয়া সমাধিক্ষেত্রের একটি অনন্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ফিদেল কাস্ত্রোর দেহভস্ম অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে। পুরো দেশজুড়ে চারপাশের চরম অবহেলা, জীর্ণশীর্ণ ও ভাঙাচোরা পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীতে এই সমাধিক্ষেত্রটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং নিখুঁতভাবে সুপরিচর্যা করা। সেখানে নির্দিষ্ট নিয়মে নিয়মিত সামরিক কায়দায় প্রহরীরা নিজেদের প্রহরী বদল করে থাকে।

কিউবার জাতীয় বীর হোসে মার্তির সমাধিসৌধের মূল ফটকের সামনে সেনাসদস্যদের অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজও নিয়মিত চলতে থাকে। এই সুশৃঙ্খল ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখলে যেকোনো মানুষের মনে ক্ষণিকের জন্য হলেও এই ধারণা জন্মাতে পারে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল স্বপ্ন বোধ হয় এখনো আগের মতোই অটুট রয়েছে।

তবে এই সুসজ্জিত সমাধিক্ষেত্রের সীমানার বাইরে পা রাখলেই বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসে পোড়া আবর্জনার এক তীব্র ও উৎকট গন্ধ। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই পোড়া গন্ধই যেন কিউবার বর্তমান নির্মম বাস্তবতার নিখুঁত প্রতীক—যেখানে একদিকে রয়েছে বিপ্লবের জাকজমকপূর্ণ স্মৃতি ও পুরোনো রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান, আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বুকফাটা ক্ষুধা, দুরারোগ্য অসুস্থতা, চরম অনিশ্চয়তা এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া গভীর হতাশা।

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সৌদি রিয়াদ রুটে ফ্লাইট চালুর অপেক্ষা, প্রবাসীদের জন্য ট্রলি

সৌদি রিয়াদ রুটে ফ্লাইট চালুর অপেক্ষা, প্রবাসীদের জন্য ট্রলি