ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ময়না কীভাবে মানুষের মতো স্পষ্ট কণ্ঠে কথা বলতে পারে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 21, 2026 ইং
ময়না কীভাবে মানুষের মতো স্পষ্ট কণ্ঠে কথা বলতে পারে ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গ্রামীণ জনপদ কিংবা শহুরে ফ্ল্যাটের বারান্দায় একসময় মানুষের কণ্ঠে কথা বলা ময়না পাখি বেশ দেখা যেত। কেউ বলত ‘কে রে?’ কিংবা জানতে চাইত ‘কেমন আছো?’, যা শুনে মনে হতো পাখিটি বুঝি মানুষের ভাষার মানে বুঝতে পারছে। তবে বন্য প্রাণীর প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বনের পাখিকে খাঁচাবন্দি করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই ময়নাকে এখন ঘরে আটকে রাখার কিংবা তাকে কথা বলানোর দীক্ষা দেওয়ার। কেউ যদি এমন বেআইনি কাজ করে থাকেন, তবে তা অবিলম্বে বন্য প্রাণী সুরক্ষা বিভাগকে অবহিত করতে হবে।

অথচ অতীতে ময়নাকে মানুষ কথা শেখানোর প্রবণতা দেখাত। এই শখের বশবর্তী হয়ে বন্দি করার ফলে বর্তমানে বন্য পরিবেশে ময়নার অবাধ বিচরণ আর সহজে চোখে পড়ে না। মূলত কোন জাদুকরে ভর করে ময়না মানুষের গলায় কথা বলতে সক্ষম হয়, সেটি এক বড় রহস্য।

এই বিস্ময়ের মূল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে পাখিটির শারীরবৃত্তীয় গঠনের ভেতরে। কারণ ময়নার রয়েছে একটি বিশেষ ধরনের শব্দ তৈরির অঙ্গ, ভিন্ন প্রকৃতির শ্বাসকার্য পরিচালনার কৌশল এবং নিখুঁতভাবে শোনা শব্দ আয়ত্ত করার উপযোগী প্রখর মস্তিষ্ক।

সাধারণত মানুষের কথা ফোটার নেপথ্যে কাজ করে ল্যারিংক্স বা স্বরযন্ত্র। ফুসফুস থেকে উৎসারিত বাতাস স্বরতন্ত্রীতে কম্পন সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে মুখবিবর, জিহ্বা ও ওষ্ঠ সেই শব্দের রূপান্তর ঘটায়। পাখির দেহেও ল্যারিংক্সের অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু সেটি স্বর উৎপাদনে মূল ভূমিকা পালন করে না। এ ক্ষেত্রে পাখির প্রধান শব্দযন্ত্রটি পরিচিত সিরিংক্স নামে।

শ্বাসনালির একেবারে প্রান্তভাগে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুই ফুসফুসের সংযোগস্থলে অবস্থান করে এই সিরিংক্স। এর দুপাশে সূক্ষ্ম কিছু পর্দা ঝুলে থাকে এবং এর ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার সময় এগুলোতে কম্পন তৈরি হয়। ক্ষুদ্র পেশিগুলো পর্দার টান নিয়ন্ত্রণ করে শব্দের উচ্চগ্রাম ও ধরন পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।

বেশ কিছু ক্ষেত্রে সিরিংক্সের দুটি পাশ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে কাজ পরিচালনা করতে পারে। এর একপাশ থেকে একধরনের ধ্বনি এবং অপরপাশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি ধ্বনি উৎপাদিত হতে পারে। একই সময়ে দুটি আলাদা শব্দ তৈরি করাও সম্ভবপর হয়। মানুষের কণ্ঠনালিতে এই ধরনের বিশেষ ক্ষমতা বা বৈচিত্র্য নেই, যা ময়নার জটিল ধ্বনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক বিরাট সুবিধা এনে দেয়।

মানব কণ্ঠস্বর একক কোনো কম্পাঙ্কের শব্দ নয়, বরং বহু কম্পাঙ্কের সমাহারে তা গঠিত হয়। মুখ ও গলার সুনির্দিষ্ট গঠনবিন্যাস সেই শব্দকে পরিশ্রুত করে, যার ফলে ফরম্যান্টের উৎপত্তি ঘটে। নির্দিষ্ট কোনো শব্দ ‘আ’ নাকি ‘ই’, তা অনুধাবনের ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ময়না তার সিরিংক্সের সাহায্যে জটিল স্বর তৈরি করে এবং মুখগহ্বর, জিহ্বা ও ঠোঁটের অবস্থান বদলে সেই শব্দকে আরও বেশি নিখুঁত করে তোলে। ফলে তার মুখনিঃসৃত ধ্বনি মানুষের কথার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

বিগত শতকের সত্তরের দশকে মার্কিন গবেষক দল পাহাড়ি ময়নার ডাক নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছিলেন। সেখানে মানুষের উচ্চারিত শব্দের সঙ্গে তুলনীয় নানা কম্পাঙ্ক-গুচ্ছের সন্ধান মিলেছিল, যা ময়নার ধ্বনি সৃষ্টিতে সিরিংক্সের অনন্য অবদানকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছিল।

অবশ্য কেবল সিরিংক্সের উপস্থিতি থাকলেই ময়না মানুষের বুলি হুবহু নকল করতে পারত না। পাখির শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফুসফুসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বায়ুথলিগুলো দেহে বাতাসের সাবলীল প্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ফলস্বরূপ ধ্বনি তৈরির সময় একটি তুলনামূলক স্থায়ী বায়ুপ্রবাহ পাওয়া যায়, যার দরুন ময়না একটানা দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক শব্দ বা বাক্য অনায়াসে বলে যেতে পারে।

এরপর প্রশ্ন আসে অর্জিত শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে। ময়না হলো মূলত ভোকাল লার্নার বা অনুকরণপ্রিয় পাখি। অর্থাৎ অন্যের উৎপাদিত শব্দ অবলীলায় শুনে তা রপ্ত করার জন্মগত ক্ষমতা তার আছে। পাখির জগতের সব প্রজাতিতে এই দুর্লভ বৈশিষ্ট্য সমানভাবে দেখা যায় না।

ময়না যেকোনো ধ্বনি শ্রবণ করার পর তা মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তীতে নিজে যে শব্দ উৎপন্ন করছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে দেখে। যদি ঠিক না হয়, তবে সে আবারও তা সংশোধনের চেষ্টা চালায়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে একটি শব্দ নিজের কণ্ঠে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নেয়। মানুষের শিশুর ভাষা শেখার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে একে হুবহু এক করে দেখা সঠিক হবে না, তবে শুনে শুনে শেখা এবং অনুশীলনের দিক থেকে দুটোর মাঝে বেশ মিল রয়েছে।

ময়না ঠিক কী ধরনের শব্দ শুনছে, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের কাছ থেকে অর্জিত শিক্ষা তার জন্য সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয়। এর কারণ হলো ময়না একটি সামাজিক জীব। বন্য পরিবেশে তাকে তার নিজ দলের অন্যান্য পাখির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। খাঁচার বন্দিদশায় সেই স্বাভাবিক পরিবেশ ময়না আর পায় না। ফলে বাধ্য হয়ে গৃহস্থালির মানুষকেই তার একমাত্র সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হয় এবং মানুষের কণ্ঠস্বরই তখন তার শেখার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়।

তবে ময়না যখন মানুষের মতো স্পষ্টভাবে ‘ভাত খাইছ?’ উচ্চারণ করে, তখন সে যে সেই বাক্যটির প্রকৃত অন্তর্নিহিত অর্থ মানুষের মতো উপলব্ধি করছে—এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কোনো একটি শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিবেশ বা পরিস্থিতির সংযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র। কিন্তু মানুষের ভাষার মতো কোনো বিমূর্ত অর্থ কিংবা ব্যাকরণের নিয়মকানুন বোঝার কোনো শক্ত প্রমাণ মেলেনি। মূলত ময়না মানুষের নিখুঁত ভাষা বলে না, সে কেবল মানুষের ভাষার শব্দগুলো দারুণভাবে অনুকরণ করে।

অতীতকালে পাহাড়ি ময়না মানুষের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় এক পোষা পাখি হিসেবে গণ্য হতো। এই অতিরিক্ত জনপ্রিয়তার কারণে দীর্ঘকাল ধরে বন্য পরিবেশ থেকে নির্বিচারে ময়নার ছানা চুরি করে আনা হয়েছে। অথচ ময়না অত্যন্ত সামাজিক স্বভাবের পাখি হওয়ায় একটি ছোট খাঁচায় তাকে একা আটকে রাখলে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

মানুষের কথা নিখুঁতভাবে নকল করার অসাধারণ ক্ষমতাই তাকে সবার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে। আবার সেই আকর্ষণই একপর্যায়ে তাকে চিরতরে বন্দি করে রাখার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ময়নার কথা বলার মুন্সিয়ানার পেছনে যেমন রয়েছে এক অদ্ভুত বিস্ময়, ঠিক তেমনই জড়িয়ে আছে বন্য পাখিকে বলপূর্বক পোষ মানানোর নৈতিক প্রশ্ন।

একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র পাখির অবয়বের ভেতর কাজ করে একটি জটিল শব্দযন্ত্র। সিরিংক্স মূল ধ্বনি তৈরি করে, আর মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট সেই শব্দকে ভিন্ন রূপ দেয়। ফুসফুস ও বায়ুথলি বাতাসের অবিরাম প্রবাহ সচল রাখে, আর মস্তিষ্ক শোনা শব্দ মনে রেখে তা পুনরায় সৃষ্টি করতে শেখে। এভাবেই একটি ময়না পাখি তার শরীরের নিজস্ব শব্দযন্ত্রের জাদুতে আমাদের কথা শুনিয়ে চমকে দেয়।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ফ্রান্সে চরম বামদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও ব্যবসা বাণিজ্যে ব

ফ্রান্সে চরম বামদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও ব্যবসা বাণিজ্যে ব