ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সব সংস্কার মানতে হবে, সরকারকে হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
সব সংস্কার মানতে হবে, সরকারকে হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের উদ্দেশ্যে গণভোটের রায় মেনে চলার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতা ও বিরোধীদলীয় প্রধান শফিকুর রহমান। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে অতীতে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেও পরবর্তীতে তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল সংশ্লিষ্টরা, ঠিক একইভাবে এখন ভিন্ন কোনো পথ না রেখে কাঠামোগত সব সংস্কার বাধ্যতামূলকভাবে মেনে নিতেই হবে।

রাজধানীর মগবাজার অঞ্চলের পরিচিত আল ফালাহ মিলনায়তনে জুমার পর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরী উত্তর শাখা এই আলোচনা সভার সুচারু আয়োজন সম্পন্ন করেছিল।

বর্তমান ক্ষমতার অংশীদার দলটির বিগত ভূমিকার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান জানান যে ভোটের আগের দিনগুলোতে গণভোটে ইতিবাচক রায় দেওয়ার জোরালো প্রচার চালানো হলেও এখন তারা সেই রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছে না। বরং তারা পুরনো এককেন্দ্রিক বা বাকশালি শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কূটকৌশলে লিপ্ত রয়েছে এবং সেই অপচেষ্টা এখন প্রায় চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে চলেছে।

প্রশাসনের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের সব কটি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই উপস্থাপন করা হয়নি বলে তিনি কঠোর অভিযোগ করেন। যে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইন হিসেবে পাস হলে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা পুনরুত্থানের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত, সেই তালিকা থেকে প্রায় কুড়িটি অধ্যাদেশ বর্তমান প্রশাসন সুকৌশলে বাদ দিয়েছে বলে তিনি জানান।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল ক্ষেত্রগুলোতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দলীয়করণের নোংরা থাবা বিস্তার করা হয়েছে বলে বিরোধীদলীয় নেতা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে জবরদখল করার সুদূরপ্রসারি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের শীর্ষ পদে যাঁকে সম্প্রতি বসানো হয়েছে, তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের বিবরণ ইতিমধ্যে দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের দিয়ে কখনো দেশের দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুজন সম্মানিত সদস্যকে অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে চায়ের নিমন্ত্রণ জানানোর নাম করে পদ থেকে বিদায় দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সরকারের এহেন কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে বিরোধী দল হিসেবে তাদের অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের অতি অল্প সময়ের মধ্যে বর্তমান প্রশাসন এমন কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেগুলোর বিরুদ্ধে টু শব্দ না করলে তা হবে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের আমানতের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। দেশের ৫৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এ ভূখণ্ডে ন্যায়বিচারের দাবিতে বারবার সফল বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে না।

ভুল নীতি ও পথ থেকে অবিলম্বে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জামায়াত আমির প্রশ্ন তোলেন যে আধিপত্যবাদের বিরোধিতার কথা মুখে বললেও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে প্রশাসন পর্দার অন্তরালে কী কী চুক্তি করেছে তা জাতির কাছে পরিষ্কার করতে হবে। সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের অদৃশ্য বা গোপন চুক্তি কখনোই মেনে নেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন যে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর চালানো অপমান ও উপহাসের উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতেই সেদিন ওই ঘটনা ঘটেছিল। এরপর ওই বছরের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল।

৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ আকস্মিক এক পাল্টা অভ্যুথান পরিচালনা করলেও শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর অন্য কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

৭ নভেম্বরের প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরে শফিকুর রহমান জানান যে ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণ বন্দি অবস্থায় ছিলেন এবং সেই পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিল না বরং তিনি সম্পূর্ণ নিরুপায় ছিলেন। সাধারণ সিপাহিরাই তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আলোয় ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং এই জনবিক্ষোভে সিপাহিরা বিপ্লব ঘটালেও সাধারণ জনতা তাতে সংহতি জানিয়েছিল বলেই এর নামকরণ হয়েছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস।

ঐতিহাসিক ওই ঘটনার পর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করে জিয়াউর রহমান নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। একাত্তর কিংবা পঁচাত্তর সালের কোনো সময়ই দৃশ্যপটে বিএনপি নামের কোনো দল ছিল না, তবে দুই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই জিয়াউর রহমানের সরব উপস্থিতি ও ভূমিকা ছিল।

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হলেও তাঁর আশপাশে অবস্থান করা দলীয় নেতাকর্মীদের সামান্য আঁচড়ও না লাগার বিষয়টি এখনো গভীর এক রহস্যের আবরণে ঢাকা রয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যাঁদের যতটুকু অবদান রয়েছে, তাঁদের কাউকেই অবমূল্যায়ন না করে যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো দাবি জানান শফিকুর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার কোনো অবকাশ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন যে যিনি ঘোষণা পাঠ করেছেন, পুরো দেশবাসী তা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শুনেছে।

সেদিনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যিনি সাহসিকতার সঙ্গে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, সেই আ স ম আবদুর রবের নাম আজ আর কেউ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করতে চায় না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অন্য কারও নাম বললে যদি নিজের কৃতিত্ব ম্লান হয়ে যায়, এমন হীনম্মন্য মানসিকতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সফল ও দক্ষ সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নাম বর্তমান প্রজন্ম প্রায় ভুলতেই বসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে তাঁর অবদান স্মরণ করলে যদি নিজের দলের অহংকার কমে যায়, তবে সেই সংকীর্ণতা ত্যাগ করতে হবে। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন করে যার যেখানে ঐতিহাসিক অবদান রয়েছে, রাষ্ট্রকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দিতেই হবে।

আলোচনা সভার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা মহানগরী উত্তর শাখার জামায়াতের শীর্ষ নেতা সেলিম উদ্দিন এবং পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লা। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বিশেষ অতিথি হিসেবে মূল্যবান বক্তব্য পেশ করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এছাড়াও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আবদুর রহমান মূসা, গোলাম মোস্তফা এবং সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাতসহ অন্যান্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সভায় উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ঘরে ঘরে প্রচার চালিয়ে সার্বিয়ার নেতাকে হটাল শিক্ষার্থীরা

ঘরে ঘরে প্রচার চালিয়ে সার্বিয়ার নেতাকে হটাল শিক্ষার্থীরা