নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গত সোমবার প্রাতঃকালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অনুশীলনী ঘাঁটিতে একটি মোটরগাড়ি প্রবেশ করে, যেটির চালকের আসনে বসেছিলেন খোদ মাইকেল ক্যারিক। দৃশ্যটি আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সাধারণ ঠেকলেও সেদিন ওই ব্যক্তির গাড়ি চালিয়ে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে পৌঁছানোই সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
এর আগের দিন নিজেদের ভেন্যুতে বোর্নমাউথ দলের কাছে তিন গোল হজম করে পরাজিত হয় ইউনাইটেড। তখন স্টেডিয়ামের সমর্থকরা মুখিয়ে ছিলেন কখন তৎকালীন কোচের চাকরি হারানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে সেই বার্তা শোনার জন্য। অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন অল্প সময়ের ব্যবধানেই পদচ্যুত হতে চলেছেন ইউনাইটেড বস, কিন্তু ফুটবল মাঝেমাঝে ভিন্নধর্মী নাটকীয়তা উপহার দেয়। ফুটবল ক্লাবটির নীতিনির্ধারকরা ওই ম্যানেজারের মেয়াদের সঙ্গে আরও কিছু সময় যোগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সেই বর্ধিত সময় আসলে কতটা দীর্ঘ? সম্ভাব্য সেই উত্তর হয়তো পাওয়া যেতে পারে স্টামফোর্ড ব্রিজের আজকের লড়াই শেষে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে অবস্থান করা চেলসির মোকাবিলা করবে ইউনাইটেড দল। অবনমন অঞ্চলের চেয়ে কেবল এক পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ক্যারিকের বহরের জন্য এই ম্যাচটি এখন এক প্রকার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
সমস্ত প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট মিলিয়ে টানা আটটি ম্যাচে জয়খরায় ভুগছে ইউনাইটেড। বিগত চল্লিশ বছরের মধ্যে ঘরোয়া লিগে এটিই তাদের সবচেয়ে হতাশার সূচনা। এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে চেলসি শিবিরের বিপক্ষে একটি জয়ই হয়তো ওই কোচকে আরও কিছুকাল নিজের পদে টিকে থাকতে সহায়তা করবে।
অবশ্য নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রকার অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে নারাজ ম্যানেজার। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতি তিনি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন এবং নিজের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কেও সম্যক ধারণা রয়েছে, তাই কারও কাছ থেকে কোনো ধরণের অতিরিক্ত আশ্বাসের প্রয়োজন নেই।
তবে কেবল সবুজ গালচের পারফরম্যান্সই নয়, অন্দরের কোন্দলও কোচের দুশ্চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে দলনেতা ব্রুনো ফার্নান্দেজকে। একই সঙ্গে ক্লাবের দলবদলের নীতির সমালোচনা করায় আর্থিকভাবে দণ্ডিত হয়েছেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।
নামে মাত্র ইউনাইটেড হলেও দলটির অভ্যন্তরে যে বিন্দুমাত্র ঐক্য অবশিষ্ট নেই, তা স্পষ্ট।
২০২৪ সালে ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবটির আংশিক মালিকানা কিনে নেন জিম র্যাটক্লিফ। তাঁর মালিকানাধীন যুগে ইতোমধ্যে দুজন কোচকে ছাঁটাই করা হয়েছে, এখন ক্যারিক সেই তালিকার তৃতীয় ব্যক্তি হন কি না সেটাই মূল প্রশ্ন।
এদিকে ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের ক্লাব ফ্লিটউডের নাম শুনলে অতীতে আর্সেনাল ভক্তদের মনে বিশেষ কোনো চাঞ্চল্য তৈরি হতো না, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর সেই পরিবর্তন সুখকর নয় বললেই চলে।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত লিগ কাপের নকআউট পর্বে সেই ফ্লিটউডের কাছেই পরাস্ত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিয়েছে মিকেল আরতেতার শিষ্যরা। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলা এক গোলে অমীমাংসিত থাকার পর টাইব্রেকারে পরাজয় ঘটে। ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও সফল দলটির ইতিহাসে এটি অন্যতম লজ্জাজনক একটি হার।
অথচ গত মৌসুমজুড়ে দুর্দান্ত আধিপত্য বজায় রেখে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল এই আর্সেনালই। নতুন প্রতিযোগিতার প্রাক্কালেও মনে হচ্ছিল নিজেদের শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখতে বদ্ধপরিকর তারা। কিন্তু ফ্লিটউডের বিরুদ্ধে মাঠে সেই চিরচেনা রূপটিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি তাদের।
পরাজয়ের সেই অপমানজনক স্মৃতি পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ অবশ্য দ্রুতই পেয়ে যাচ্ছে গানাররা। আগামী কাল অ্যানফিল্ডের আঙিনায় তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে লিভারপুল।
পয়েন্ট তালিকায় চার নম্বরে থাকা লিভারপুল যদি এই ম্যাচে জয় তুলে নিতে পারে, তবে আর্সেনালের সঙ্গে তাদের ব্যবধান কমে তিনে নেমে আসবে। অর্থাৎ শিরোপা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে এটি নতুন করে উত্তাপ ছড়াতে পারে।
দলের এমন পরিস্থিতিতে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড সতীর্থদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত মানের ছিল না এবং অতীত অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চমানের ফুটবল উপহার দিতে হবে।
অন্যদিকে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটিকে। প্রথম দেখায় জয় পেলেও দ্বিতীয় সাক্ষাতেও যে জয়ের ধারা বজায় থাকবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।
সিটির ট্যাকটিশিয়ান এনজো মারেসকা ব্রাইটনকে নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
গত বুধবার ইতিহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত লিগ কাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ব্রাইটনের বিপক্ষে দুবার পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে আসে সিটি। নির্ধারিত সময়ের খেলা দুই গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকার ভাগ্যে জয় নিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় তারা।
আসন্ন শনিবারেও একই ভেন্যুতে ফের লড়বে দুই দল, তবে তা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে।
লিগ টেবিলের শীর্ষস্থানে থাকা সিটির জন্য এই লড়াই বেশ কণ্টকাকীর্ণ হবে বলেই ধারণা করছেন মারেসকা। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে ব্রাইটন বর্তমানে তালিকার তৃতীয় শক্তিশালী দল এবং আগের ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার তীব্র মানসিকতা কাজ করবে ফাবিয়ান হুরৎসেলারের খেলোয়াড়দের মধ্যে। প্রতিপক্ষের উচ্চ প্রশংসা করে সিটি কোচ জানান যে তারা দারুণ ফর্মে আছে এবং নিয়মিত বড় ব্যবধানে ম্যাচ জিতছে।
ব্রাইটনের খেলার ছক খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এই কোচ। মৌসুমের শুরু থেকেই তাদের প্রতিটি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখেছেন যে তারা সবসময় আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং ফুটবল খেলে থাকে এবং আসন্ন শনিবারের ম্যাচেও তার ব্যত্যয় ঘটবে না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রিমিয়ার লিগের এই সপ্তাহান্তে একাধিক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি বিভিন্ন ক্লাব। যেখানে ক্যারিকের কাঁধে রয়েছে নিজের পদ রক্ষার কঠিন দায়িত্ব, আর্সেনালের সামনে নিজেদের ম্লান হওয়া আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার চ্যালেঞ্জ এবং ম্যানচেস্টার সিটির লক্ষ্য টেবিলের মর্যদাপূর্ণ শীর্ষস্থান ধরে রাখা।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর