ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নতুন পিকআপের চাকায় প্রাণ গেল ১৮ বছরের ইয়াছিনের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং
নতুন পিকআপের চাকায় প্রাণ গেল ১৮ বছরের ইয়াছিনের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গত বৃহস্পতিবার রাত দশটার প্রাক্কালে মা শওকত আরা টেলিফোন করেছিলেন তাঁর সন্তান মোহাম্মদ ইয়াছিনের নিকট। সেই সময়ে পুত্র ব্যস্ত ছিলেন একটি পিকআপ ভ্যানে শাকসবজি বোঝাই করার কাজে। মায়ের প্রশ্নের জবাবে তরুণের বয়স আঠারো বছর হওয়া মোহাম্মদ ইয়াছিন জানিয়েছিলেন যে, তিনি দ্রব্যাদি নিয়ে টেকনাফের পথে রওনা দিচ্ছেন এবং সূর্যোদয়ের আগেই নিজগৃহে ফিরে আসবেন। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে মায়ের কর্ণগোচর হলো এক মর্মান্তিক সংবাদ, তাঁর আদরের ছেলে আর ইহজগতে নেই।

মায়ের সঙ্গে করা ওয়াদা অনুযায়ী ইয়াছিন ঠিকই সকালবেলা ফিরেছিলেন, তবে তা কোনো সজীব মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি হিমশীতল নিথর দেহ হিসেবে। যে গাড়িটি নিজের আয়ত্তে নেওয়ার জন্য তিনি মাতা-পিতার কাছে জিদ ধরেছিলেন, মাত্র পনেরো দিন পূর্বে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করে অর্জিত সেই বাহনটিতেই সমাপ্ত হলো তাঁর ইহজীবনের পথচলা।

ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া বারোটার দিকে, যখন কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া সবুজ পাহাড় এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ওই পিকআপ ভ্যানটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মোহাম্মদ ইয়াছিনসহ মোট দুজন ব্যক্তি প্রাণ হারান।

গত শুক্রবার বিকালের দিকে চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা অঞ্চলে অবস্থিত নানাবাড়ির প্রাঙ্গণে শায়িত ছিল মোহাম্মদ ইয়াছিনের মৃতদেহ। তাঁকে অন্তিমবারের মতো একনজর দেখার জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বহু আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিরা। গৃহের বারান্দা থেকে অবিরাম কান্নার আওয়াজ আসছিল, যার ভেতর সবচেয়ে প্রকট ছিল জননী শওকত আরা বুকফাটা শোক ও আর্তনাদ।

কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চারণ করছিলেন, পুত্রকে উদ্দেশ্য করে তাঁর না পাওয়ার বেদনা। একমাত্র সন্তানকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলার এই চরম সত্যটি তিনি কোনোভাবেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না এবং বারবার শোকে মুর্ছা যাচ্ছিলেন।

পূর্বের দিনগুলোতে ইয়াছিন স্থানীয় এলাকায় একটি ইজিবাইক পরিচালনা করতেন, কিন্তু তাঁর সুপ্ত বাসনা ছিল নিজস্ব একটি পিকআপের মালিক হওয়ার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদে তিনি মাতা-পিতার নিকট বিশেষ আবদার করেন। সন্তানের সেই মনের ইচ্ছা পূর্ণ করার লক্ষ্যে পরিবার থেকে মাত্র পনেরো দিন পূর্বে সাত লক্ষ টাকা খরচ করে তাঁকে একটি নতুন পিকআপ কিনে দেওয়া হয়েছিল।

ক্রয় করার পর প্রথম দশ থেকে বারো দিন পর্যন্ত বাহনটি অন্য একজন চালক চালালেও, গত বুধবার সেই চালককে বাদ দিয়ে ইয়াছিন নিজে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। সেদিন একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার ট্রিপ নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে গমন করেন এবং সেখান থেকে বৃহস্পতিবার চকরিয়া এলাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ওই রাতেই পুনরায় সবজি বোঝাই করে টেকনাফের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ইয়াছিন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সর্বশেষ যাত্রায় পর্যবসিত হয়।

দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর নানাবাড়ির উঠানে উপস্থিত হয়ে ইয়াছিনের অগ্রজ বোন জান্নাতুল নাইমা গণমাধ্যম বা উপস্থিত লোকজনের কাছে তাঁর ভাইয়ের অতীত ও শখের গাড়ি কেনার বিষয়টি তুলে ধরে জানান যে, ভাইয়ের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা এভাবে মর্মান্তিকভাবে শেষ হয়ে যাবে তা কেউ ভাবেনি।

চার ভাইবোনের মধ্যে মোহাম্মদ ইয়াছিন ছিলেন ক্রমানুসারে তৃতীয়। তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেনের বয়স ছাব্বিশ বছর এবং তিনি মালয়েশিয়া প্রবাসী। বড় বোন জান্নাতুল নাইমার বয়স বাইশ বছর এবং কনিষ্ঠ ভাই মোহাম্মদ রবিউল হোসাইনের বয়স পনেরো বছর, যে জীবিকার তাগিদে রাজমিস্ত্রির কাজ করে থাকে। তাদের পিতা মোহাম্মদ দুলাল লামা এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করেন।

তাদের আদি পৈতৃক আবাসস্থল বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় হলেও, এই পরিবারটি দীর্ঘ প্রায় বিশ বছর ধরে চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা গ্রামে নানাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে।

যে তরুণ নিজের পরিশ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন দেখছিল এবং পরিবারের কাছে বায়না ধরে নিজের পছন্দমতো গাড়ি কিনেছিল, তাঁর সেই সমস্ত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ এখানেই থেমে গেছে। বাড়ির আঙিনায় সন্তানের lifeless শরীরের পাশে স্বজনদের আহাজারি এটাই স্পষ্ট করে দেয় যে, একটি কমবয়সী যুবকের অকালমৃত্যু কীভাবে পুরো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

এই একই দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী অপর ব্যক্তি হলেন সাতাশ বছর বয়সী আবদুল্লাহ। তাঁর পারিবারিক ঠিকানা কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকা এবং তাঁর পিতার নাম আবুল কালাম। দুর্ঘটনাকবলিত পিকআপে চড়ে চকরিয়া থেকে নিজের বাসগৃহে ফিরে যাওয়ার পথেই তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন এবং তাঁরও ঘরে ফেরা হয়নি।

শুক্রবার বিকেল পাঁচ ঘটিকায় শাহপুরা জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে মোহাম্মদ ইয়াছিনের জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। এরপর মসজিদের পার্শ্ববর্তী নির্ধারিত সামাজিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

ভোরবেলা যে সন্তানের ঘরে ফিরে আসার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিলেন মাতা, সেই পুত্রকেই আজ চিরবিদায় জানাতে হলো পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। মাত্র পনেরো দিন আগে কেনা সাত লক্ষ টাকার স্বপ্নময় সেই পিকআপটিই শেষ পর্যন্ত এক মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনল তাঁর জীবনে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল ভ্যানযাত্রী জুলেখার

ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল ভ্যানযাত্রী জুলেখার