ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মহাবিপন্ন চালমুগরা: বন্য উদ্ভিদের সংখ্যা নামল একশর নিচে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 25, 2026 ইং
মহাবিপন্ন চালমুগরা: বন্য উদ্ভিদের সংখ্যা নামল একশর নিচে ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আমাদের দেশের পাহাড়ি বনাঞ্চলের অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুন্দর উদ্ভিদের তালিকায় থাকা চালমুগরা বা ডালমুগরি বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে রয়েছে। আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে লেখক প্রথম এই গাছটির দেখা পান। এরপরের বছর পার্বত্য জেলার আলুটিলা ডাউনের প্রাচীন বটবৃক্ষ দেখতে গিয়ে স্থানীয় বনাঞ্চলেও গাছটির উপস্থিতি লক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। সে সময়ে উদ্ভিদটিকে গভীরভাবে চেনার সুযোগ ঘটেনি কিংবা এটি কতটা আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে, সে বিষয়েও কোনো ধারণা তৈরি হয়নি। পরবর্তীতে চলতি বছরের দিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম এবং আইইউসিএন কতৃক যৌথভাবে প্রকাশিত বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় এই উদ্ভিদটিকে মহাবিপন্ন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সর্বশেষ প্রকাশিত সেই রেড লিস্টে গাছটির এমন সংকটাপন্ন অবস্থার বিবরণ পড়ার পরেই মূলত উদ্ভিদটির স্মৃতি নতুন করে মনে জাগ্রত হয়। দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি বনাঞ্চলে এই গাছের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং সিলেটের মৌলভীবাজারের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা রয়েছে। সামগ্রিক পর্যালোচনায় মাত্র দশটি ভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক পরিবেশে এই গাছগুলোর বেঁচে থাকার প্রামাণিক তথ্য হাতে এসেছে। বিগত ২০২২ সালের সবশেষ পরিচালিত জরিপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিটি নির্দিষ্ট অবস্থানে মাত্র এক থেকে তিনটি পূর্ণবয়স্ক উদ্ভিদ টিকে আছে এবং বর্তমানে সেগুলোর প্রতিটিই চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চিহ্নিত অঞ্চলগুলোর প্রাপ্ত উপাত্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে বনের ভেতরে প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকা মোট গাছের সংখ্যা একশর নিচে নেমে এসেছে।

গড় হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি বনাঞ্চলে উদ্ভিদের এই পরিমাণ পাঁচটিরও নিচে অবস্থান করছে, যা কোনো প্রজাতিকে অত্যন্ত বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়েও অনেক কম। উদ্ভিদটির দ্রুত পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এর বীজ অতিরিক্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা। এর কারণ হলো চালমুগরার বীজে থাকা উপাদান কুষ্ঠরোগসহ নানা ধরনের জটিল চর্মরোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া বন্য পরিবেশে এই উদ্ভিদের প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার বা নতুন চারা তৈরির হারও বেশ শ্লথ বলেই পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। স্থানীয় পরিমণ্ডলের কথা বিবেচনা করলে বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা এলাকায় এই উদ্ভিদ পাওয়া যায়।

একইভাবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা এবং ধোপাছড়ি বনাঞ্চলেও এর দেখা মেলে। কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা, খাগড়াছড়ির আলুটিলা সংলগ্ন অঞ্চল, রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং ও পাবলাখালী এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতিতেও এই গাছ রয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্থানে বনায়নের উদ্দেশ্যে এই গাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুযায়ী চালমুগরা বা বৈজ্ঞানিকভাবে হাইডনোকার্পাস কুর্জি হলো চিরসবুজ প্রকৃতির মাঝারি আকৃতির একটি বৃক্ষ। এই প্রজাতির গাছ লম্বায় প্রায় বারো থেকে পনেরো মিটার পর্যন্ত উঁচুতে পৌঁছাতে সক্ষম। উদ্ভিদটির মূল কাণ্ড বেশ সরল প্রকৃতির, দেখতে গোলাকার এবং সোজাভাবে ওপরের দিকে ওঠে। এর গাছের ছাল বেশ মসৃণ ও পুরু হয়ে থাকে এবং বাকলের বর্ণ সবুজাভ ধূসর প্রকৃতির।

উদ্ভিদটির পাতা বেশ পুরু, দেখতে ভল্লাকার কিংবা আয়ত ভল্লাকার ধরনের এবং পাতার অগ্রভাগ বেশ সুচালো হয়ে থাকে। পাতার চারপাশের কিনারা সরল হলেও এর দুই পাশ কিছুটা ঢেউখেলানো প্রকৃতির হয়ে থাকে। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ এবং এর ভেতরের জালিকাকার শিরাগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। হালকা হলুদ বর্ণের সুবাস ছড়ানো ফুলগুলো কখনো এককভাবে ফোটে, আবার কখনো বড় বড় থোকায় ঝুলে থাকে। গ্রীষ্মকাল থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত এই উদ্ভিদটিতে ফুল ফোটার মূল সময় হিসেবে নির্ধারিত থাকে। পরবর্তীতে ঋতু পরিক্রমায় হেমন্তকালে এর ফলগুলো পুরোপুরি পরিপক্বতা লাভ করে। এই ফলগুলোর আকৃতি গোলাকার হয়ে থাকে এবং পুরোপুরি পাকা ফলগুলো বেশ শক্ত, পুরু ও বাদামি রঙের হয়। প্রতিটি ফলের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি বীজ সুরক্ষিত অবস্থায় অবস্থান করে।

বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সরাসরি এই গাছ সংগ্রহ করার প্রবণতা রয়েছে, তবে এর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছাড়াও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার মতো বিভিন্ন অঞ্চলেও এই উদ্ভিদের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো উপমহাদেশীয় অঞ্চলে বিগত দশ বছরের ব্যবধানে এই প্রজাতির গাছের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, অর্থাৎ প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চালমুগরা মূলত আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি আদি বৃক্ষ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার আটশ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নিতে পারে। যে সকল অঞ্চলে দিনের বেলা সাধারণত আক্ষরিক অর্থে তাপমাত্রা আটাশ থেকে চৌত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সারা বছর জুড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে, সেখানে এই উদ্ভিদ খুব ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।

এই গাছটির জন্য পূর্ণ মাত্রায় সূর্যালোক অথবা হালকা ছায়াযুক্ত পরিবেশ বেশ পছন্দনীয়। এটি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই টিকে থাকতে পারে, তবে বিশেষ করে সুনিষ্কাশিত বেলে ও পলিযুক্ত সমতল ভূমি অথবা কিছুটা আর্দ্র অথচ পানি জমে না থাকে এমন সুনিষ্কাশিত পরিবেশ এর বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চালমুগরা প্রজাতিটি বর্তমানে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও গাছটি অত্যন্ত চমৎকার ও জাদুকরি ঔষধি গুণাবলীতে সমৃদ্ধ। এই উদ্ভিদটি মানবদেহের নানা ধরনের বিচিত্র রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর মহৌষধ হিসেবে বহু প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শরীরের কোনো অংশ যদি চুলকানির কারণে লাল হয়ে ফুলে ওঠে, তবে সে ক্ষেত্রে চালমুগরার তেল সেই নির্দিষ্ট স্থানে ভালোভাবে মালিশ করলে দ্রুত চমৎকার সুফল পাওয়া যায়। মানবদেহের পেটের পুরোনো আমাশয় রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের জন্য এই গাছের পাতা পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি ছেঁকে গরম অবস্থায় পান করলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়।

এছাড়া কুষ্ঠরোগের চিকিৎসায় চালমুগরার বীজ থেকে প্রস্তুত করা তেল হালকা গরম করে প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নিয়মিত সেবন করলে রোগের উপশম ঘটে। মাথার চুলে খুশকির উপদ্রব বাড়লে চালমুগরার তেল মাথার তালুতে ভালোভাবে লাগিয়ে প্রায় ত্রিশ মিনিট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং পরবর্তীতে চুল ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে নিয়মিত পরিচর্যা করলে মাথার খুশকি দ্রুত কমে যায়। যেকোনো ধরনের চর্মরোগ সারাতে চালমুগরার পাতা মিহি করে বেটে তার সঙ্গে তেল মিশিয়ে খেলে রোগটি ভালো হয়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে এক গ্রাম পরিমাণ চালমুগরার বীজগুঁড়া হালকা গরম পানির সঙ্গে সেবন করলে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। চালমুগরার তেল ফুটিয়ে তাতে মৌমাছির চাকের মোম মিশিয়ে একটি বিশেষ মলম তৈরি করে তা খোসপাঁচড়া ও সাধারণ কাটা-ছেঁড়া ঘায়ে লাগালে দ্রুত সেরে যায়। বর্তমান সময়ে চীন ও আর্জেন্টিনার মতো দূরবর্তী দেশেও চালমুগরার তেল ক্যানসার রোগ নিরাময়ের চিকিৎসায় সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটির রচয়িতা হলেন বরেণ্য প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়