ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জে বাউলগানের আসর বাতিলের ঘোষণা আয়োজকের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
সুনামগঞ্জে বাউলগানের আসর বাতিলের ঘোষণা আয়োজকের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গানের নামে অনৈতিকতা ছড়ানোর আশঙ্কা প্রকাশ করে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের নিজ উপজেলা দিরাইয়ে একটি বাউলগানের ঘরোয়া অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই আসরটি প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় লোকজনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও সংঘাত এড়ানোর স্বার্থে স্বয়ং আয়োজক নিজেই পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানটি বাতিল করার ঘোষণা দেন। গত বৃহস্পতিবার এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।

ঘটনাটি ঘটেছে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে। উল্লেখ্য যে, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্মস্থান হলো এই উপজেলারই পাশ্ববর্তী তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রাম।

স্থানীয় জনসাধারণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হাতিয়া গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী তাঁর নিজ বাসভবনে তাঁর কন্যাসন্তানের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাউলসংগীতের আসর বসানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এলাকার পরিচিত দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নীলার সংগীত পরিবেশন করার কথা ছিল।

এই সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে গত বুধবার গ্রামের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে আতাহার আলী ও কামরুল হাসান নামের দুজন ব্যক্তি দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। এই অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আয়োজক শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। পুলিশের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে শওকত আলী অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।

থানায় জমাকৃত ওই লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাতিয়া গ্রামটি দীর্ঘকাল যাবৎ তাদের ধর্মীয় অনুশাসন ও ইসলামী ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য এলাকায় পরিচিত। এই জনপদে একটি আলিম মাদ্রাসা এবং একজন আধ্যাত্মিক সাধক বা ওলির মাজার শরীফ রয়েছে। গ্রামের ভেতরে বহু আলেম-ওলামা বসবাস করেন। অভিযোগকারীদের মূল দাবি ছিল, নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে গানের জলসা চলতে থাকলে তা পুরো এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশের জন্ম দিতে পারে। এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সৌহার্দ্য অটুট রাখার জন্যই তাঁরা এই ব্যাপারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

অভিযোগকারী কামরুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তাঁদের এই গ্রামে অতীতে বাউলগানের প্রচলন থাকলেও বর্তমান সময়ে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। গ্রামে একাধিক মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে এবং প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নারী শিল্পীদের দিয়ে গান বাজানোর সিদ্ধান্তের কারণে গ্রামবাসীর মনে তীব্র অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় লোকজনের অনেকেই মনে করেন যে গানের আড়ালে অশ্লীলতা হতে পারে, আর সেই কারণেই তাঁরা ইসলামের মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন।

আয়োজক শওকত আলী তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, মেয়ের জন্মবার্ষিকীর আনন্দ উদ্‌যাপন করতেই তিনি নিজ বাড়িতে ঘরোয়াভাবে গানের ছোট একটি আসর ডেকেছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের পক্ষ থেকে যখন আপত্তি উঠল এবং দিরাই থানা থেকেও তাঁকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হলো, তখন সামগ্রিক সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করে তিনি স্বেচ্ছায় অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে এটি মূলত একটি বাউলগানের ঘরোয়া আয়োজন ছিল। তবে এলাকাবসীর পক্ষ থেকে জোরালো আপত্তি ওঠার পর পুলিশ নিয়ম অনুযায়ী আয়োজকের সঙ্গে কথা বলে। এর পরপরই আয়োজক নিজে থেকেই থানায় জানিয়ে দেন যে তিনি আর কোনো ধরনের গানবাজনার অনুষ্ঠান করবেন না।

এর আগেও এই একই উপজেলায় ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র পক্ষ থেকে প্রবল বাধা আসার কারণে দিরাই উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় স্টেডিয়ামে নারীদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যকার ওই ফুটবল ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর কথা নির্ধারিত ছিল। ম্যাচটি বাতিল হওয়া নিয়ে পরবর্তীতে সর্বমহলে ব্যাপক আলোচনা এবং সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।

সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে, এর আগে নারীদের ফুটবল খেলায় আপত্তি জানানো হয়েছিল এবং এখন আবার আরেকটি মহলের আপত্তির মুখে বাউলগানের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলো। এভাবে একের পর এক স্থানীয় মহলের আপত্তিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ বা স্থগিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক একটি বিষয়। তাঁর মতে, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার যৌক্তিক দাবি থাকলেও এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের সংস্কৃতিচর্চা এবং নারীদের খেলাধুলার সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই গভীরভাবে ভাবতে হবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
পীরগঞ্জে বাসচাপায় পথচারী নিহত ও চালক আহত, সড়ক অবরুদ্ধ

পীরগঞ্জে বাসচাপায় পথচারী নিহত ও চালক আহত, সড়ক অবরুদ্ধ