নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সংসারজীবনে নানা কারণে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে, যা কখনো কখনো পারস্পরিক আকর্ষণ কমিয়ে দেয় কিংবা সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়ে সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। মানবীয় এই আচরণগুলোই মূলত নির্ধারণ করে দেয় যে একটি সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত ভেঙে টুকরো হয়ে যাবে, নাকি পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নতুনভাবে গড়ে উঠবে। প্রাচীনকাল থেকেই স্বামী-স্ত্রীর এমন নানাবিধ পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য সাহাবিরা মহানবী (সা.)-এর শরণাপন্ন হতেন এবং তিনি তাঁদের উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। তাঁর সেই অমূল্য উপদেশগুলোতে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং দাম্পত্যজীবনের গভীর বাস্তবতার এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে।
জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পুরুষদের জীবনের একটি বড় সময় ঘরের বাইরে কাটাতে হয় এবং অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাঁদের নজর অন্য নারীর দিকে পড়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে এমন পরিস্থিতির কারণে পরনারীর প্রতি সাময়িক ভালো লাগাও তৈরি হতে পারে, যা ধীরে ধীরে নিজ স্ত্রীর প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে এবং পরিণামে দাম্পত্য কলহের সূচনা করে। এই ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর পরিষ্কার নির্দেশনা হলো, পরনারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ার ফলে মনে কোনো ধরনের আগ্রহ জাগলে যত দ্রুত সম্ভব নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁকে পর্যাপ্ত সময় ও সঙ্গ দিতে হবে। কারণ, অন্য নারীর মধ্যে যা কিছু রয়েছে, নিজের বৈধ স্ত্রীর মধ্যেও ঠিক তা-ই বিদ্যমান রয়েছে।
কাউকে সাময়িকভাবে ভালো লাগলেই তার পেছনে অন্ধের মতো ছোটা সমর্থনযোগ্য নয়, কারণ ঘরসংসার পরিচালনা করা একটি বড় দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে সেই পরনারীও বর্তমান স্ত্রীর মতোই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের স্ত্রীর মাঝেই নিজের সন্তুষ্টি সীমিত রাখা, আর কেবল শারীরিক আকর্ষণের বশে আরেকটি বিয়ে করার বিষয়টি হাদিসে কঠোরভাবে নিন্দিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে নির্দেশনা রয়েছে যে কোনো দোষ ছাড়া যেন নারীদের তালাক দেওয়া না হয়, কারণ আল্লাহ সেই সব নারী ও পুরুষকে একেবারেই পছন্দ করেন না যারা নিয়মিত বিরতিতে কেবল একের পর এক বিয়ে করে এবং আবার তা ভেঙে দেয়।
দাম্পত্য জীবনের পথপরিক্রমায় প্রায়ই দেখা যায় যে সঙ্গীর কোনো একটি নির্দিষ্ট স্বভাব বা আচরণ অন্য সঙ্গীর কাছে ভীষণ অপছন্দনীয় ঠেকে। কিন্তু কেবল ওই একটিমাত্র ত্রুটির ওপর ভিত্তি করে পুরো মানুষটিকে ঘৃণা করা কিংবা তড়িঘড়ি করে তালাকের পথ খোঁজা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে যদি কেউ সঙ্গীকে অপছন্দ করে, তবে এমন সম্ভাবনাও প্রবল থাকে যে সে কোনো একটি বিষয়কে অপছন্দ করছে অথচ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাতে প্রচুর কল্যাণ লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
এই বিষয়ের ব্যাখ্যায় মহানবী (সা.) বলেছেন যে কোনো ইমানদার পুরুষ যেন তাঁর ইমানদার স্ত্রীকে কখনো ঘৃণা না করে, কেননা সে যদি স্ত্রীর কোনো একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয় তবে নিশ্চিতভাবেই তার অন্য কোনো আচরণে সে ঠিকই সন্তুষ্ট হবে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য বাঁধলে একজন কেবল অন্যজনের মন্দ দিকগুলোকেই বড় করে দেখতে শুরু করে এবং তা নিয়ে কথা বলে। কিন্তু এই হাদিসের মাধ্যমে মহানবী (সা.) আমাদের অন্য একটি বাস্তব সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা হলো মানুষের মন্দ দিক থাকলেও ভালো দিকও নিশ্চয় থাকে এবং আমাদের সেই ভালো দিকগুলোর প্রতিই নজর দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সৃষ্ট দাম্পত্য কলহের জেরে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে লক্ষ্য করে নানা কটুকথা বলে এবং অকথ্য ভাষায় গালগালাজ করে থাকে। এমনকি কখনো কখনো স্বামী মেজাজ হারিয়ে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে এবং তাকে শারীরিক নির্যাতন করে, যা যেকোনো সাজানো সংসারকে মুহূর্তেই অসুখী করে তুলতে পারে। মহানবী (সা.) সব সময়ই স্বামী-স্ত্রীর এই ধরনের হিংসাত্মক আচরণ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে প্রহার করে সে কোনোভাবেই একজন ভালো মানুষ হতে পারে না।
এমনকি তিনি আরও সাবধান করে বলেছেন যে তোমাদের কেউ যেন নিজ স্ত্রীকে ক্রীতদাসের মতো প্রহার না করে, কারণ এই অমানবিক আচরণের কিছুক্ষণ পরেই আবার তাকে দিনের শেষে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে হয়। একবার এক সাহাবি মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে স্ত্রীদের ওপর স্বামীদের কী ধরনের অধিকার রয়েছে, যার জবাবে তিনি বলেন যে স্বামী নিজে যা খাবে স্ত্রীকেও ঠিক তাই খাওয়াবে এবং নিজে যা পরিধান করবে তাকেও সে একই পোশাক পরাবে। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দেন যে স্ত্রীর মুখে কখনো আঘাত করা যাবে না, তাকে কুৎসিত বলে গালি দেওয়া চলবে না এবং রাগ করে তার সঙ্গে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও তা ঘরের সীমানার ভেতরেই সীমিত রাখতে হবে।
স্বামী কিংবা স্ত্রী কারও বিরুদ্ধে পরকীয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ কানে এলে কখনোই আবেগের বশে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পুরো বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। অস্পষ্ট কোনো প্রমাণের ওপর নির্ভর করে কিংবা শুধু কোনো ভিডিও, অডিও বা ছবি দেখেই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না। এমনকী নিজের সঙ্গীকে অন্য কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখতে পেলেও নিজ হাতে তাকে হত্যা করার কোনো অধিকার কারও নেই, কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি ইসলাম দেয়নি।
সহিহ হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে কোনো পুরুষ যদি নিজের স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখতে পায়, তবে সে কি সেই লোকটিকে কতল করতে পারবে কি না? এর জবাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে 'না' বলে উত্তর দিয়েছিলেন এবং মুহাদ্দিসরা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে কেবল স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখামাত্রই স্বামী তাকে হত্যা করতে পারে না। ব্যভিচারের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, যথাযথ সাক্ষী হাজির করতে হবে এবং বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
যদি এই আইনি প্রক্রিয়া বা নিয়মের বাধ্যবাধকতা না থাকত, তবে যেকোনো মানুষ রাগের বশে বা কেবল নিজের তথাকথিত আত্মসম্মানের অজুহাতে অপরকে খুন করে পরে সহজেই দাবি করতে পারত যে নিহত ব্যক্তি ব্যভিচারের সঙ্গে লিপ্ত ছিল। এ ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বজায় থাকলে সমাজের প্রতিটি নিরপরাধ মানুষের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়ত এবং চারদিকে ভয়াবহ নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ত। তাই স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাপারে যেকোনো অভিযোগ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো ধরনের দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রথমে পুরো বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।
আইন রক্ষার এই কঠোর বাস্তব প্রমাণের একটি চমৎকার ঐতিহাসিক ঘটনা পাওয়া যায়, যখন সাহাবি হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) তাঁর নিজ স্ত্রীর বিরুদ্ধে শরিক ইবনে সাহমাহর সঙ্গে ব্যভিচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিলেন। তখন মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন যে হয় এই অভিযোগের পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ হাজির করতে হবে, নতুবা তাঁর নিজের ওপরই মিথ্যা অপবাদ রটনার শাস্তি কার্যকর করা হবে। পরবর্তী সময়ে পুরো বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গড়ায় এবং অভিযুক্ত নারী নানা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সক্ষম হন।
যদিও পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়েছিল যে সেই নারী অবিকল তাঁর পরকীয়া প্রেমিকের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তবুও মহানবী (সা.) তাঁকে কোনো দুনিয়াবি শাস্তি দেননি। কারণ এর আগেই বিচারিক প্রক্রিয়ার আইনানুগ মাধ্যমে সেই নারী সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিলেন, তবে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে আল্লাহর কিতাবে যদি আগে থেকেই বিধান নির্ধারিত না থাকত তবে এই নারীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটত। তাই স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পেলেই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য না হয়ে প্রথমে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের প্রচলিত আইন রক্ষা করেই যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর