ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অধিকার আদায়ের বিশ্বজোড়া আন্দোলনে তরুণদের নতুন ইতিহাস

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 25, 2026 ইং
অধিকার আদায়ের বিশ্বজোড়া আন্দোলনে তরুণদের নতুন ইতিহাস ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

যুগের পর যুগ ধরে নতুন প্রজন্মের তরুণেরাই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল অঞ্চলে যে প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল, তার ঢেউ আজ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আছড়ে পড়ছে। মরক্কো, তিউনিসিয়া ও মিসরের তরুণ সমাজ সর্বপ্রথম রাজপথে নেমে এসেছিল তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবিতে। তাদের সেই জোরালো দাবিগুলোর মধ্যে প্রধানত অন্তর্ভুক্ত ছিল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করা। এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরটি ক্রমান্বয়ে এক দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা অগ্নিবীজে রূপান্তরিত হয়, যা পরবর্তীতে এশিয়া মহাদেশ, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ের জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্ম মূলত ডিজিটাল যুগের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাদের হৃদয়ের গহীনে প্রজ্বলিত হয়েছে বিদ্রোহের এক দুর্দমনীয় অগ্নিশিখা।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাজপথে যে বিশাল রাজনৈতিক তরঙ্গ ও গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল বিশ্ববাসীর জন্য এক অভাবনীয় ও জ্বলন্ত অগ্নিবীজ। সে সময় সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ—বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা এবং এমনকি স্কুলপড়ুয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরেরাও—রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান দুর্নীতি, মারাত্মক বৈষম্য এবং তীব্র বেকারত্ব ও সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রবল সাহসিকতায় রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই ঐতিহাসিক গণআন্দোলন কেবল তৎকালীন সরকারের পতনই নিশ্চিত করেনি, বরং গোটা পৃথিবীকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে জেনারেশন জেড কেবল বিলাসী বা ভোগবাদী জীবনযাপনে অভ্যস্ত নয়, বরং তারা নিজেদের অধিকারের জন্য সাহসিকতার সাথে লড়াই করতে এবং জীবন দিতেও পিছপা হয় না। এটি ছিল এক সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব আন্দোলন, যেখানে শুধু সরকারের পতনই ঘটেনি, বরং শাসকগোষ্ঠী দলেবলে সপরিবার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল, যার নজির বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় অত্যন্ত বিরল।

পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে নেপালের সরকার যখন দেশের ভেতরে হঠাৎ করেই ২৬টি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দেশটির তরুণ প্রজন্মের রক্তে প্রচণ্ড ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল। সেই সময় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো বহুল ব্যবহৃত মাধ্যমগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলেও প্রতিবাদী তরুণদের স্বাধীন কণ্ঠস্বর কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান সংসদ ভবনটি বিক্ষুব্ধ জনতার তীব্র আগুনে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল এবং একপর্যায়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়েছিল, যা ইতিহাসের বুকে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

ইন্দোনেশিয়ার সংসদ সদস্যরা যখন নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে বিলাসবহুল বাসস্থান ভাতা দেওয়ার ঘোষণা প্রদান করেন, যা ছিল দেশের সাধারণ শ্রমিকদের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির ঠিক ১০ গুণেরও বেশি, তখন ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে রাজপথে নেমে আসে। সে সময় তাদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছিল জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমেশন ‘ওয়ান পিস’ কার্টুনের সেই পরিচিত পাইরেট বা জলদস্যুর পতাকা। এই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে তরুণেরা নিজেদের কোনো সাধারণ জলদস্যু হিসেবে পরিচয় দেয়নি, বরং নিজেদের দেশের স্বাধীনতাকামী বীর যোদ্ধা হিসেবে জোরালোভাবে ঘোষণা করেছিল।

অন্যদিকে মাদাগাস্কার রাষ্ট্রে যখন চরম বিদ্যুৎ সংকট এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব দেখা দেয়, অথচ দেশটির শাসকেরা তখন চরম বিলাসবহুল জীবনযাপনে মত্ত ছিলেন, তখন ২০২৫ সালের সেই দিনগুলোতে তরুণ সমাজ রাস্তায় নেমে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করেছিল যে, সাধারণ মানুষের অন্ধকারে থাকার বিনিময়ে শাসকদের কোনো প্রাসাদ আলোকিত হতে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্টকে বাধ্যতামূলকভাবে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, যা আফ্রিকার মাটিতে চিরকালের সেই বিখ্যাত বাণী ‘অন্ধকারে আলো জ্বালো’-র বাস্তব প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছিল।

যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি সমাজ পরিবর্তনের এই তীব্র আগুন প্রজ্বলিত করতে সক্ষম হয়, সেই একই শক্তি যদি পরবর্তী সময়ে কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রদান করতে না পারে এবং নিজস্ব শক্তিতে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ধরনের গণআন্দোলনের আবেগ ও উত্তাপ খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানব ইতিহাসের পাতায় এমন বহু যুববিদ্রোহ বা ছাত্ররক্তের আন্দোলন প্রচণ্ড ঝড়ের মতো সাময়িক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একটি নতুন ও টেকসই সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে সফল হতে পারেনি।

উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর তরুণেরা দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের অভিশাপে ক্লান্ত এবং সমাজের নানা ধরনের বৈষম্যের কারণে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। তাদের সেই প্রতিবাদী মিছিল একসময় মরুর উত্তপ্ত বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে তারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিল যে, তারা মরুভূমির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও কোনো মরীচিকার পিছু ছুটতে চায় না, বরং তারা বাস্তবভিত্তিক ও স্থায়ী সমাধান চায়।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের পবিত্র ভোট প্রদানের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশটির রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে বড় ধরনের বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে, তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে পদত্যাগের জোরালো দাবি। এই আন্দোলনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী রূপ ধারণ করে, তা দেখার জন্য আমাদের বর্তমান সময়ে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে।

বর্তমান সময়ে ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন দেশে পরপর যে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত জেন-জি প্রজন্মের দীর্ঘমেডিক্যাল ও গভীর বিদ্রোহেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভাঙন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপযোগী বাসস্থানের চরম সংকটই মূলত এই তরুণদের বাধ্য করেছে রাজপথে নেমে আসতে। ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, স্লোভাকিয়া থেকে শুরু করে আলবেনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কালক্রমে ইউরোপের মাটিতে একটি নতুন ও বৈপ্লবিক সামাজিক মহাকাব্যের রূপ পরিগ্রহ করছে।

সার্বিকভাবে পুরো ইউরোপের আন্দোলন পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উত্তাল ও জটিল হয়ে উঠেছে। ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ধীরে ধীরে বৈদেশিক ঋণ এবং বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ ফ্রান্সে স্কুল পর্যায়ে তীব্র শিক্ষক সংকট, স্কুলের ভাঙাচ্ড ছাদ এবং প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস করার নিয়মের কারণে তরুণদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে স্পেনে গত এক দশকের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের বাড়িভাড়া প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে তরুণ প্রজন্মের পক্ষে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও আলবেনিয়ায় যে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’-এর সূচনা হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল একটি সংরক্ষিত পরিবেশগত দ্বীপে বিশাল বাণিজ্যিক রিসোর্ট নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করা, যা পরবর্তীতে কালক্রমে দুর্নীতি এবং ক্ষমতাসীন শাসকের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

ফ্রান্সের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বর্তমানে অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছে যে তাদের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক অনুদান প্রদান করতে হবে, কোনোভাবেই দমনপীড়নমূলক নীতি চালানো চলবে না। রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু করে তাদের এই প্রতিবাদের মিছিল সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের বিখ্যাত পুয়ের্তা দে সল চত্বরে সমবেত হয়ে তরুণরা স্লোগান দিচ্ছে যে তাদের মাথা গোঁজার ঘর নিয়ে যেন কোনো ধরনের নোংরা খেলা না খেলা হয়। সাধারণ মানুষের বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং অন্যায়ভাবে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের এই আন্দোলন বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সংকটের রূপ ধারণ করেছে।

গ্রিস এবং স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবনতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহিতার ব্যাপক অভাবেই মূলত তরুণদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। আলবেনিয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণের পবিত্র দাবি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় এখন দেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত বৃহৎ গণতরঙ্গে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও বেলজিয়াম এবং অস্ট্রিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতেও শিক্ষার বরাদ্দ ও বাজেট কাটছাঁটের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে চলেছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, দেশের ভোটার তালিকা থেকে যদি সাধারণ মানুষের নামই অনিশ্চিত বা ভুয়া হয়ে যায়, তবে সম্পূর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তিটাই চিরতরে ফাটল ধরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই তাদের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বরে আজ জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিবাদের সুর, এবং সেই একই সুরের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের অতি ন্যায্য দাবি।

বিশ্বজুড়ে সংঘটিত এই বর্তমান যুগের আন্দোলনগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত ও দৃশ্যমান সাযুজ্য বা মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান যুগের আধুনিক সামাজিক মাধ্যম টিকটকের কল্যাণে প্রতিবাদী স্লোগানগুলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কোটি কোটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে দুর্নীতিপরায়ণ ও অর্থলোভী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাত্রার গোপন ছবি ও তথ্য জনগণের চোখের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও ডিসকর্ড এবং টেলিগ্রামের মতো আধুনিক অ্যাপ ব্যবহার করে এই গণআন্দোলনগুলোর অত্যন্ত গোপনীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের ইন্টারনেট মিম এবং পপ কালচার তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে আরও অনেক বেশি রঙিন, গতিশীল ও প্রাণবন্ত করে তুলছে।

যখন কোনো দেশের নির্যাতিত তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, তখন দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক চক্রের ভেতরে গভীর ভয়ের জন্ম নেয়। এই অন্তর্নিহিত ভয় থেকেই শাসকেরা নানা ধরনের মনগড়া যুক্তি বা বয়ান তৈরি করতে শুরু করে, যা মূলত তাদের নৃশংস দমনপীড়নের নীতি ঢাকবার এক ধরনের মোক্ষম মুখোশ মাত্র। তরুণদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের বিপরীতে দেশের শাসকগোষ্ঠী নানা রকম মনগড়া ব্যাখ্যা ও অজুহাত দাঁড় করায়—কখনো তারা এই প্রতিবাদকে দমন করে কঠোর আইনশৃঙ্খলার নামে, কখনো আবার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পবিত্র দোহাই দিয়ে, এবং কখনো বা তথাকথিত উন্নয়নের ধুয়ো তুলে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জোরালো যুক্তি দেখিয়ে দেশের শাসকেরা প্রায়শই দাবি করতে থাকে যে তরুণদের এই আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিতিশীল করে তোলার একটি গভীর চক্রান্ত। তারা খুব জোরেশোরে প্রচার করে যে এটি কোনো সাধারণ আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং বহিরাগত কোনো শক্তির গোপন প্ররোচনা। অথচ এই তরুণদের প্রতিবাদী কণ্ঠ আসলে তাদের নিজেদের পেটের ক্ষুধা, তীব্র বেকারত্ব এবং সমাজের চরম বৈষম্যের বাস্তব প্রতিধ্বনি মাত্র। শাসকেরা সবসময় প্রচার করে যে রাজপথে মিছিল করার অর্থই হলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এবং প্রতিবাদের নামে প্রকাশ্যে ভাঙচুর চালানো। এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তারা মূলত পুলিশ প্রশাসনের যথেচ্ছ দমনপীড়নকে আইনি বৈধতা দিতে চায়। কিন্তু মানব ইতিহাস বারবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর যেখানেই অন্যায় ও অবিচার বিদ্যমান থাকবে, সেখানেই প্রতিবাদ করাটাই একমাত্র ন্যায়সঙ্গত কাজ।

সমাজের রক্ষণশীল ও প্রাচীনপন্থী মানুষেরা প্রায়শই বলে থাকে যে তরুণেরা নাকি বয়সে অপরিণত এবং তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক অভিজ্ঞতা পর্যাপ্ত নয়। তারা মনে করে যে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলো এই তরুণ সমাজ আদৌ বুঝতে পারে না। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, তথাকথিত অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে যুগ যুগ ধরে সমাজের যাবতীয় অন্যায় ও শোষণকে জিইয়ে রাখা হয়েছে, আর পৃথিবীর প্রকৃত ও যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো সর্বদা এই তরুণদের হাত ধরেই সাধিত হয়েছে।

ইউরোপে সংঘটিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় রাজধানী বা শহরগুলোতে যে ধরনের লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোকে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাধারণ অবনতি হিসেবে বিবেচনা করলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্রটি সম্পূর্ণ ধরা পড়বে না। সমাজবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই ধরনের ঘটনাগুলোকে সাধারণত গভীরতর ও দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক অসন্তোষের প্রধান লক্ষণ হিসেবে অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে থাকেন।

যখন কোনো নির্দিষ্ট সমাজের একটি বিশাল অংশ মনে করতে শুরু করে যে তাদের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর দেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না, তখন সেই প্রতিবাদের ভাষা অনেক সময় সাধারণ যুক্তির চত্বর ছেড়ে ক্ষোভ ও ধ্বংসের আগুনে রূপ নেয়। রাজপথে পুড়ে যাওয়া মোটরগাড়ি, ভেঙে ফেলা কাচের জানালা কিংবা জোরপূর্বক লুটপাট করা কোনো দোকানপাট তখন নিছক কোনো বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয় না; বরং সেগুলো হয়ে ওঠে সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা, সীমাহীন বঞ্চনা এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক একটি অত্যন্ত অস্থির ও প্রকাশ্য প্রতীক।

অবশ্য সমাজের সাধারণ প্রতিবাদ এবং সুনির্দিষ্ট লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ কখনোই এক ও অভিন্ন জিনিস নয়। যে কোনো বড় গণআন্দোলনের ভেতর যেমন বহুসংখ্যক শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক বিক্ষোভকারী উপস্থিত থাকে, ঠিক তেমনি কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী বা ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। সুতরাং হাতে গোনা কিছু মানুষের সংঘটিত এই সহিংসতা কখনোই সেই সামগ্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত সকল সাধারণ অংশগ্রহণকারীর মূল উদ্দেশ্য বা আদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

বিশ্বজুড়ে চলমান বর্তমান রাজনৈতিক প্রবণতা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হয় যে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন ভবিষ্যতে মূলত তিনটি বড় ও সুনির্দিষ্ট পথে বিস্তার লাভ করতে পারে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিতে—পৃথিবীর নানা দেশের তরুণেরা আগামী দিনে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকারের প্রশ্নটিকে সামনে রেখেই ঐক্যবদ্ধভাবে সংগঠিত হচ্ছে। তারা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কেবল পেশিশক্তিতে বলীয়ান নয়, বরং জনগণের প্রতি সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রূপগঞ্জে পূর্বাচল গ্রীন হার্টের ফটক ভাঙল ভ্রাম্যমাণ আদাল�

রূপগঞ্জে পূর্বাচল গ্রীন হার্টের ফটক ভাঙল ভ্রাম্যমাণ আদাল�