নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্লেনারি সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করা হয়েছে। সাধারণ অধিবেশনের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার ইউএনওয়েব টিভি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পুরো সভার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সভার কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রাক্কালে জি-৭৭ জোটের প্রতিনিধি হিসেবে উরুগুয়ের কূটনৈতিক বাংলাদেশ এবং নেপাল রাষ্ট্রের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর একটি খসড়া প্রস্তাব সবার সামনে পেশ করেন।
প্রস্তাবটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জানানো হয় যে, বিগত করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাত এবং নানা ধরনের বৈশ্বিক সংকটের কারণে দুই দেশের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি থেকে গেছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত কোনো দেশের প্রতিনিধিই এই খসড়া প্রস্তাবের বিপক্ষে কোনো ধরনের দ্বিমত পোষণ করেননি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ড ছাড়াও ফ্রান্স ও কানাডার প্রতিনিধিরা বক্তব্যে বাংলাদেশ ও নেপালের সময় বাড়ানোর আবেদনকে সমর্থন জানান। তবে তারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এই বাড়তি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে হবে। জাতিসংঘ জানিয়ে দিয়েছে যে, দুই দেশের ক্ষেত্রে গৃহীত এই দীর্ঘায়িত করার পদক্ষেপটি একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন সুবিধা আর উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। এছাড়া জাতিসংঘ আরও ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২০২৭ সালের সমাপনীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রস্তুতির সামগ্রিক অগ্রগতির একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন পরিচালনা করা হবে।
নির্ধারিত সময়ের আগেই যদি এই উত্তরণ ঘটে যেত, তবে বাংলাদেশ যেসব বাণিজ্য সুবিধা হারাত, তার সবগুলোই অন্তত ২০২৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। সুরক্ষাপ্রাপ্ত এই বাণিজ্য সুবিধার দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাওয়ার অধিকার, নানাবিধ ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার সুযোগ এবং সহজ ও নমনীয় শর্তে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটানোর বড় চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বর্তমান জাতীয় অর্থনীতিতে নানা ধরনের বহুমুখী চাপ বিরাজ করছে। এই কঠিন চাপের সময়গুলোতে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া দেশের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের মনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
এদিকে দেশের অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা জোরালো তাগিদ দিয়ে বলেছেন যে, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য পাওয়া এই অতিরিক্ত তিন বছরের মধ্যে রাজস্ব খাত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় সহায়ক পরিবেশ এবং বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাতসহ সমস্ত চলমান সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রতিটি সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
চল-তি বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিজেদের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে সুনির্দিষ্ট অনুরোধ পাঠায় বাংলাদেশ সরকার। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ধরে চলা নানা প্রক্রিয়া শেষ করে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশ ও নেপালের অনুকূলে এই অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করে জাতিসংঘ। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে এই সময়সীমা বাড়ানোর ফলে এখন থেকে আগামী ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটবে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট পোশাক উৎপাদকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এটি সরকার ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তির সংবাদ। তিনি বলেন, যদি এ বছরই উত্তরণ ঘটে যেত, তবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ছাড়া বাকি সবকিছুই বাতিল হয়ে যেত। এই তিন বছরের সময়টাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেমন পুরো বছর ধরে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, ঠিক তেমনি আগামী তিন বছরজুড়ে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ করে যেতে হবে। শুধু সময় পাওয়া গেছে বলেই এক বছর নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে চলবে না।
ব্যবসায়ী নেতা ফজলুল হক আরও যোগ করেন যে, আমাদের এলডিসি উত্তরণের সমস্ত প্রস্তুতি মূলত শুধু পোশাক খাতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধশিল্প নিয়েও কিছু আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক শিল্প এবং কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়াতে এখনই ভাবনা শুরু করা দরকার। তিনি জানান, এই বিষয়গুলো নিয়ে আগামী নভেম্বর মাস থেকেই নিজেদের কার্যক্রম শুরু করবে এফবিসিসিআই।
মূলত এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি সবচেয়ে বেশি ও মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ত। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, এই তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে আর কোনো শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে না, অথচ তৈরি পোশাক খাতই দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের বা বিএফটিআইয়ের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধাগুলো যদি তুলে নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। যার আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। এই হিসাবটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বা ডব্লিউটিও-এর প্রণীত।
স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী ২০২৯ সাল পর্যন্ত এমনিতেই এই শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এমনকি এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পরেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের মতো বড় অর্থনৈতিক বাজারগুলোতে আরও তিন বছর পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল থাকবে।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের ওই একই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এলডিসি থেকে সুবিধা বন্ধ হলে দেশের সম্ভাবনাময় ওষুধশিল্প বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে। এই তালিকা থেকে বের হলে ওষুধ খাতের ওপর মেধাস্বত্ব বা পেটেন্ট সংক্রান্ত বিধিবিধান আরও কঠোর ও কড়া করা হবে। তবে আপাতত আগামী তিন বছরের জন্য একটি বড় স্বস্তি অর্জিত হয়েছে। এই তিন বছর এলডিসিভুক্ত থাকার কারণে দেশের কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো মেধাস্বত্বের নিয়মাবলি প্রয়োগ করা হবে না। ফলে মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদা করে কোনো পেটেন্ট লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এতে ওষুধ উৎপাদনকারীদের খরচ অনেকটাই হ্রাস পাবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় কুড়ি শতাংশ ওষুধ এই ধরনের বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে।
স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকার সুবাদে যেকোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে উৎপাদিত যেকোনো পণ্য বা সেবার বিপরীতে নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি প্রদান করতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে নিজস্ব কৃষি ও শিল্প খাতের বহুমুখী পণ্য এবং সেবার ক্ষেত্রে নানা ধরনের ভর্তুকি দিয়ে আসছে। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ার কারণে এই ভর্তুকি এবং নগদ সহায়তার ধারা নিয়মিত অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
তাছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তুলনামূলক সহজ ও নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগও বহাল থাকবে। তবে এর উল্টো দিক হলো, এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের সদস্যপদের চাঁদার পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাবে। এছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো স্বল্পোন্নত দেশের গরিব শিক্ষার্থীদের নানা ক্যাটাগরির শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে, কিন্তু উত্তরণ ঘটে গেলে এই বৃত্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংস্কার বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের আর্থিক খাতকে পুরোপুরি স্থিতিশীল করা, কর থেকে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি করা এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারে এমন সরকারি ব্যয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন বাংলাদেশ সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর জন্য আবেদন করে, তখন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের বা ইকোসকের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি বাংলাদেশের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিল, যা সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদন হিসেবে পরিচিত। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এলডিসিভুক্ত তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কোন দেশ কবে বের হবে, তা মূল্যায়ন করার মূল দায়িত্ব এই সিডিপির ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর