ঢাকা | বঙ্গাব্দ

লালনচর্চায় রবীন্দ্র-সংগৃহীত আদি খাতার অনন্য গুরুত্ব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 1, 2026 ইং
লালনচর্চায় রবীন্দ্র-সংগৃহীত আদি খাতার অনন্য গুরুত্ব ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর তারিখটিতে ফকির লালন শাহর ১১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ এই রচনাটি প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সমসাময়িককালে অনলাইন পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে সেই পুরানো লেখাটি আবার নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে।

লালনগীতি বর্তমানে দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষার গবেষক ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা এসব গানের মধ্যে থাকা অকৃত্রিম বাণী ও সুর গভীর মনোযোগের সঙ্গে অনুসন্ধান করে চলেছেন।

ইতোমধ্যে ইংরেজি, ফরাসি, ইতালি, জার্মান, জাপানি এবং হিন্দি ভাষার মতো বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় লালনগীতি অনূদিত হচ্ছে। যার ফলে বিশ্বমঞ্চে লালনের গান এবং তাঁর পরিচিতি ক্রমশ এক বিশাল বিস্তৃতি লাভ করছে।

উনিশ শতকের আশির দশকের সময়কাল থেকে শুরু করে কাঙাল হরিনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে পরবর্তীকালের বহু সুধীজন লালনগীতি সংগ্রহ করে তা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে এসেছেন।

তাদের মধ্যে কিছু কিছু গবেষকের সংগ্রহ পর্যালোচনা করলে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য পাঠ প্রতীয়মান হয়। এই বিশেষ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহটি সরাসরি আদি পাণ্ডুলিপিকেন্দ্রিক হওয়ায় তা লালনচর্চার ইতিহাসে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

একই সঙ্গে এই অমূল্য সংগ্রহটি আমাদের দেশজ সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সম্ভার হিসেবে খুব সহজে চিহ্নিত হতে পারে। রবীন্দ্র-সংগৃহীত লালনগীতি মূলত তিনটি প্রধান গ্রন্থে এযাবৎ মুদ্রিত হয়েছে।

গ্রন্থগুলো হলো 'লালনগীতিকা' যা ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়, 'লালন ফকির: কবি ও কাব্য' যা ১৩৮৬ বঙ্গাব্দে আসে এবং 'লালন সাঁই: দেশ এবং কাল' যা প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে।

এছাড়াও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজের সংগ্রহভান্ডার থেকে প্রবাসী পত্রিকার ১৩২২ বঙ্গাব্দের সংখ্যায় প্রায় ২০টি গান প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত 'ছন্দ' নামক গ্রন্থের 'বাংলা ছন্দের প্রকৃতি' শীর্ষক প্রবন্ধে প্রবাসীতে প্রকাশিত হওয়া দুটি গান প্রায় পুরোপুরি এবং অন্য একটি খণ্ডিত গান মুদ্রিত আকারে স্থান পেয়েছিল।

একটি বিষয় কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না যে রবীন্দ্র-উদ্যোগে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েই পরবর্তী সময়ে মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং বসন্তকুমার পাল প্রমুখ ব্যক্তিত্ব লালনগীতি সংগ্রহ ও প্রচার করেছিলেন।

তাঁদের এই মহৎ প্রচেষ্টা লালনচর্চার সমগ্র ধারাকে ভীষণভাবে সমৃদ্ধ এবং গতিশীল করে তুলতে সাহায্য করেছিল বলে গবেষকরা মনে করেন।

রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত লালনের গানের মোট সংখ্যা কত এবং তিনি ঠিক কতগুলো আদি খাতা জোগাড় করতে পেরেছিলেন, তার কোনো সঠিক হদিস আজো জানা সম্ভব হয়নি।

বাউল সাধক লালন ফকির ১৮৯০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে দেহত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস বাদে পারিবারিক জমিদারি পরগনা শিলাইদহ এস্টেট পরিচালনার মূল দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১ সালে সেখানে আসেন।

তার প্রায় দেড় যুগ পরে স্থানীয় লালনশিষ্যদের সঙ্গে কবির একটি বিশেষ ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ঠিক সেই সময়েই তিনি লালনের আসল গানগুলো পাওয়ার জন্য বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

একাধিক তথ্যের সঠিক সূত্রের সমন্বয়ে খুব সহজে এটি বোঝা যায় যে রবীন্দ্র-সংগ্রহে লালনগীতির অন্তত তিন কিংবা চারটি আদি পাণ্ডুলিপি নিশ্চিতভাবে ছিল।

এর বাইরে আরও অন্তত তিনটি আদি খাতা কবির ব্যক্তিগত ভান্ডারে সুরক্ষিত থাকার যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে নেহাত কোনো উড়ো খবর বলে সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

শান্তিনিকেতন থেকে ইংরেজি ও ইতিহাসের এক শিক্ষক হিসেবে পরিচিত সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ১৩১৩ সালে শিলাইদহে এনে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত করেছিলেন।

সেখানে অবস্থান করার কালীন সময়ে তিনি একদিন ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালনের আখড়াবাড়িতে নিজে গিয়ে লালনশিষ্যদের কাছ থেকে লালনগীতির একটি আদি খাতা হস্তগত করেছিলেন।

কলকাতার বিখ্যাত বঙ্গদর্শন পত্রিকার ১৩১৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় 'গ্রাম্যসাহিত্য' শিরোনামে সুবোধ মজুমদারের একটি চমৎকার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

ওই রচনার নির্দিষ্ট এক স্থানে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালন ফকিরের গানের যে খাতা তারা সংগ্রহ করেছিলেন তাতে এত বেশি বর্ণাশুদ্ধি ছিল যে তা পাঠের পুরোপুরি অযোগ্য ছিল।

উদ্ধৃত সেই অংশটি অনুসরণ করে এবং রবীন্দ্রজীবনের সেই সমসময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা গভীরভাবে লক্ষ করে আমাদের মনে এই ধারণা জন্মেছে যে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক আদিষ্ট হয়েই সম্ভবত সুবোধচন্দ্র লালনের প্রকৃত গান লিখে আনতে গিয়েছিলেন।

আর সেই উদ্দেশ্যেই তিনি ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি থেকে লালনগীতির একটি আদি খাতা নিজের দায়িত্বে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সেই প্রবন্ধটি রচনাকালে মূল খাতাটি তাঁর নিজ হেফাজতে আর অক্ষত অবস্থায় ছিল না।

আলোচ্য খাতাটি সুবোধচন্দ্র আখড়াবাড়িতে সসম্মানে ফেরত দিয়েছিলেন নাকি তা সরাসরি রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন—এই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর আজ পাওয়া খুবই কঠিন।

এই ঘটনার ঠিক বছরখানেক বাদে রবীন্দ্রনাথ লালনশিষ্য মনিরুদ্দীন শাহর নিজের হাতে লেখা লালনগীতির দুটি বহুমূল্য পাণ্ডুলিপি লাভ করতে সক্ষম হন।

পাণ্ডুলিপি দুটি বর্তমান সময়ে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নিবন্ধিত হয়ে সংরক্ষিত আছে। যার নির্দিষ্ট নিবন্ধন সংখ্যা হলো ১৩৮এ (আই) এবং (আইআই)।

তিন খণ্ড লালনসংগীত বইয়ের বিশিষ্ট সংকলক ছেঁউড়িয়ার নিবাসী ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহর কাছে মনিরুদ্দীন শাহর হাতের লেখা লালনগীতির একটি ছিন্ন ও খণ্ডিত খাতা বর্তমানে রয়েছে।

উল্লেখ্য যে মন্টু শাহর আন্তরিক সৌজন্যে ২০০৪ সালের ২৪ মার্চ তারিখটিতে মূল খাতাটি আমি নিজেই ফটোকপি করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

এই খাতার ভেতরের হাতের লেখা এবং রবীন্দ্রভবনে থাকা খাতা দুটির বিভিন্ন পৃষ্ঠার আলোকচিত্রগুলো বিভিন্ন গ্রন্থে মুদ্রিত হয়ে আসার পর তা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেখলে অনায়াসে একটি বড় ধারণা করা যায়।

তা হলো রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত খাতা দুটির আসল লিপিকার আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং মনিরুদ্দীন শাহ।

এই বিশেষ বিষয়টির প্রতি সবার প্রথমে জোরালো দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন 'যুক্তবঙ্গে লালনচর্চা' শীর্ষক গ্রন্থের সুযোগ্য লেখক সৈয়দ মনসুর আহমদ।

তিনি তাঁর ওই গ্রন্থের ৯১ পৃষ্ঠায় মন্টু শাহর কাছে অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত মনিরুদ্দীন শাহর খাতাটির সম্পূর্ণ বরাত দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

সেখানে তিনি বলেছেন যে মনিরুদ্দীন শাহ দুটি আলাদা খাতায় পেনসিল দিয়ে দাগ টেনে নিজ হাতে প্রায় ২৯৭টি গান কালিতে খুব সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

এরপর বাংলা ১৩১৪-১৫ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে সেই খাতাগুলো তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর ঠিক পরপরই তাঁর নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালে লালনগীতির সেই মূল্যবান দুটি পাণ্ডুলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয় শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগারে।

এই দুটি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি থেকে পরবর্তী সময়ে পারস্পরিক পুনরাবৃত্তি ঘটা এমন ১২টি গান বাদ দিয়ে বাকি ২৮৫টি গান একদম অবিকৃতভাবে ছাপা হয়েছে।

সনত্কুমার মিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় 'লালন ফকির: কবি ও কাব্য' শীর্ষক বইটিতে এই গানগুলো অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।

অবশ্য এর আগের সময়টাতেও অত্যন্ত বিশুদ্ধ বানানে আলোচিত এই পাণ্ডুলিপির প্রায় ৮৯টি গান একসঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এবং মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্রের যৌথ সম্পাদনায় তৈরি 'লালনগীতিকা' নামের বিখ্যাত গ্রন্থটিতে এই কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি আমাদের আজ অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে কোনো উপায়ই নেই।

কারণ সেই সুদূর যুগে তিনি যদি নিজে উদ্যোগী হয়ে লালনগীতির আদি খাতাগুলো তাঁর নিজস্ব হেফাজতে না নিতেন, তবে এত দীর্ঘ দিনের কালপরিক্রমায় ওগুলো নিশ্চিতভাবেই নষ্ট হয়ে যেত কিংবা একেবারে দুর্লভ বা বিলুপ্ত হয়ে পড়ত।

বিশেষ একটি তথ্যের দিক থেকে উল্লেখ করা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের পুরোনো কাগজপত্র ও চিঠিপত্রের ভিড়ে লালনের একটি বিশেষ গানের খাতা পাওয়া গেছে—এমন একটি খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সেই সংবাদ শুনে বিশিষ্ট গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ১৯৪৯ সালে সেই পাণ্ডুলিপির খাতাটি নিজ চোখে পরখ করে দেখার জন্য শান্তিনিকেতনে ছুটে গিয়েছিলেন।

সেদিন তাঁর সেই সফরে অত্যন্ত সংগী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রবিষয়ক নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের সম্মানিত রচয়িতা এবং শিলাইদহের সাবেক নিবাসী শচীন্দ্রনাথ অধিকারী।

সেখানে খাতাটি নিজের চোখে ভালো করে দেখে শচীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে ওই পাণ্ডুলিপির মূল লেখক হিসেবে বামাচরণ ভট্টাচার্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শনাক্ত করেছিলেন।

যিনি মূলত শিলাইদহ জমিদারি এস্টেটের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পুরোনো কর্মচারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুব জোরের সঙ্গেই বলা যেতে পারে যে, বামাচরণের লেখা বলে সঠিকভাবে শনাক্ত করা ওই পাণ্ডুলিপির খাতাটি রবীন্দ্র-পরিবারের পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালে অফিশিয়ালি জমা দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ সেটি যদি মনিরুদ্দীন শাহর নিজের হাতে লেখা দুটি খাতার ঠিক একটি না হয়ে থাকে, তবে কোনোভাবেই এটি না মেনে উপায় নেই যে বামাচরণ ভট্টাচার্যের লিখিত সেই পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে সত্যই নিখোঁজ রয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সিলেটে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

সিলেটে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ