ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অন্যের জীবনকে বড় মনে করার প্রবণতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 1, 2026 ইং
অন্যের জীবনকে বড় মনে করার প্রবণতা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বাংলাদেশের পেশাজীবী সমাজে একটি অত্যন্ত পরিচিত মানসিকতা হলো নিজের বর্তমান অবস্থাকে ছোট করে দেখা এবং চারপাশের মানুষের অবস্থানকে তুলনামূলক অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করা। মানুষ নিজের জীবনের না পাওয়ার হিসাবটা যেভাবে কষে, ঠিক সেভাবে অন্যের জীবনের প্রতিদিনের না বলা সংগ্রামগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।

একদিন এক চায়ের আড্ডায় বসেছিলেন কয়েকজন বন্ধু, যাঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ও নবীন উভয় শ্রেণির ব্যক্তিরাই উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উপস্থিত সকলের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল একে অপরের জীবনযাত্রা এবং কার জীবন কতটা বেশি সুখের বা গোছানো, তা নিয়ে নানা আলোচনা।

সেখানে উপস্থিত একজন ব্যবসায়ী বন্ধু আড্ডায় অংশ নিয়ে বলেন যে, বাকিরা চাকরি করায় তাঁদের জীবন অনেক বেশি শান্তিময়। তাঁর মতে, ব্যবসায় পদে পদে ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা রয়েছে, যেখানে সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নির্দিষ্ট চাকরি ও মাস শেষে নিয়মিত বেতন বেশ শান্তির বিষয়।

সরকারি বিসিএস ক্যাডার বন্ধু তখন প্রতিবাদ করে বলেন যে, বাইরে থেকে মনে হলেও সরকারি চাকরিতে আসলে মন খুলে কথা বলা যায় না এবং নিজের ইচ্ছামতো কিছু লেখার বা যেকোনো সময় ঘুরে বেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁর মতে, চারপাশের অসংখ্য বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দि জীবন ছেড়ে আপনারাই স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা বন্ধুটি জানান যে, ব্যাংকের ভেতরের পরিবেশ মোটেও শান্তিময় নয়, বরং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা গ্রাহকদের নানা জটিল সমস্যা সামলানো এবং লেনদেনের হিসাব মেলানোই তাঁদের মূল কাজ। এই অসহ্য চাপ থেকে মুক্তি পেতে তাঁর মাঝেমধ্যে বিদেশ চলে যাওয়ার তীব্র বাসনা জাগে।

ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে কর্মরত বন্ধুটি উল্লেখ করেন যে, অফিসে প্রবেশের নির্দিষ্ট সময় থাকলেও বের হওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না এবং কোনো অডিট এলে দিন ও রাতের ব্যবধান ঘুচে যায়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কাজ করার সুবাদে করোনা মহামারি, হরতাল কিংবা ঝড়-বৃষ্টির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁকে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বন্ধুটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানান যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো স্থায়ী শান্তির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, যেখানে আজ ক্ষমতা থাকলে কালই তা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। প্রতিনিয়ত এক অজানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পথ চলতে হয়।

গবেষণা খাতের বন্ধুটি সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, ল্যাবরেটরিতে দিনের পর দিন পড়ে থেকে অন্তহীন পরিশ্রম করতে হলেও সেখানে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি প্রায়শই পাওয়া যায় না। কখনো কখনো নিজের সম্পূর্ণ জীবনটাই গবেষণার বেদিতে বলি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।

প্রবাসী বন্ধুটি সবার বিদেশ যাওয়ার আগ্রহের বিপরীতে নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন যে, মাতৃভূমি ছেড়ে মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের থেকে দূরে থাকতে তাঁর মোটেও ভালো লাগে না। বিদেশে উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও অর্থপ্রাপ্তি থাকলেও আপনজনদের সান্নিধ্য এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার টান কোনো অর্থ দিয়েই পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি চাকরি হারানো বন্ধুটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন যে, চাকরিজীবীদের অন্তত একটি নির্দিষ্ট পরিচয় ও নিয়মিত আয়ের উৎস থাকে, যা তাঁর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কর্মসংস্থান হারানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, চাকরির পাশাপাশি নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প আয়ের পথ খোলা রাখা কতটা জরুরি।

শিক্ষক পেশার বন্ধুটি জানান যে, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন, কোচিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং সামাজিক মূল্যায়নের অবক্ষয় দেখে তাঁর মাঝেও এই পেশায় আসার জন্য গভীর হতাশা কাজ করে। তাঁর মতে, অন্য কোনো পেশায় প্রবেশ করলে হয়তো জীবনটা আরও অনেক বেশি সুন্দর হতে পারত।

সবার দীর্ঘ আলোচনা মনোযোগ সহকারে শোনার পর আড্ডার চায়ের দোকানদার মৃদু হেসে মন্তব্য করেন যে, বড় ভাইদের দোয়ায় তিনি তাঁর ক্ষুদ্র পরিসরে বেশ ভালো ও সন্তুষ্ট আছেন। তাঁর প্রত্যাশা কম থাকায় হতাশার মাত্রাও কম, তবে তিনি কাউকে নিজের এই পেশায় আসার পরামর্শ দেন না।

দোকানদারের এই সহজ কথায় সবাই সমস্বরে হেসে উঠলেও সেই হাসির আড়ালে একটি বড় সত্য লুকিয়ে ছিল যে, আমরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজের জীবনের চেয়ে অন্য দশটি মানুষকে বেশি সুখী বলে মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে দেশের প্রতিটি তরুণ-তরুণী নিজের পছন্দমতো ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুদূর প্রসারী স্বপ্ন বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলে।

কেউ সেই স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছাতে সফল হয় আবার কেউ নানা প্রতিকূলতার কারণে ব্যর্থ হয়, যেখানে চাকরি পেয়েও অনেকে অসন্তুষ্ট থাকে। ব্যবসায়িকভাবে সফল ব্যক্তিরাও যেমন গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তেমনি বিদেশে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে থিতু হওয়া মানুষেরাও মনের ভেতরে মারাত্মক শূন্যতা অনুভব করেন।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থানের সুযোগের স্বল্পতা, বেতনের স্বল্পতা, চাকরির স্থায়ী নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুবিধার ঘাটতি এক বড় সংকট হিসেবে বিরাজ করছে। এর ওপর চাকরির বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তরুণ প্রজন্মের হতাশার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অনেক সময় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ফারাক পরিলক্ষিত হয়, যা তরুণদের মনে বৈষম্যের জন্ম দেয়। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থীও যথাযথ সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নেটওয়ার্কিংয়ের অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, অথচ প্রকৃত মেধা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সীমানায় আটকে থাকে না।

অন্যদিকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা নানা যাচাই-বাছাইয়ের পর অত্যন্ত যোগ্য প্রার্থী বেছে নিলেও দেখা যায় নতুন কর্মী যোগদানের মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই তা ত্যাগ করছেন। ফলে একদিকে প্রতিষ্ঠান যেমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল ধরে রাখতে গিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়ে, অন্যদিকে নতুন নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পেছনে প্রচুর অর্থ ও সময় অপচয় হয়।

এই পুরো ব্যবস্থার ভেতরে প্রশ্নটি কেবল সাধারণ কর্মীর নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়। উপযুক্ত বেতন কাঠামোর পাশাপাশি সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, সঠিক প্রশিক্ষণ, পদোন্নতির স্বচ্ছ সুযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি ধরে রাখা অনেক সহজ হতো।

এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা চালু করার বিকল্প নেই। শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই যে একটি চমৎকার চাকরি নিশ্চিত হবে না, এই সত্যটি শিক্ষার্থীদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গতানুগতিক পড়াশোনার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি, জটিল সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, দেশের তরুণ সমাজকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা কিংবা প্রবাসজীবন—প্রতিটি ক্ষেত্রেরই আলাদা সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যের বাহ্যিক সাফল্যের দিকটি দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে কেবল হতাশাই বৃদ্ধি পাবে, কোনো ইতিবাচক সমাধান মিলবে না।

পরিশেষে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিল্প খাত এবং কর্মসংস্থানের মূল স্রোতের মধ্যে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী সেতু বন্ধন তৈরি করা অতীব জরুরি। বিদেশে পাড়ি জমানো কোনো অপরাধমূলক কাজ নয়, কারণ উন্নত সুযোগ বা পারিবারিক নিরাপত্তার খাতিরে অনেকেই বিদেশে যেতে পারেন। তবে দেশের ভেতরেও যদি মেধার সঠিক বিকাশ ও গবেষণার পরিবেশ থাকে, তবে তরুণরা দেশেই থাকতে চাইবেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
চার দিনের সফর শেষে ঢাকা ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী

চার দিনের সফর শেষে ঢাকা ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী