নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার কার্যক্রম চলাকালে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা গুম ও হত্যার অভিযোগের মামলায় এদিন তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। শতধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ও গুমের এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামকে জেরা করছিলেন আসামিপক্ষ।
দুপুরের দিকে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান। সে সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের বোন ও তাঁর অপর আইনজীবী নাজনীন নাহারও।
জেরার একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জানান যে, ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে জিয়াউল আহসান র্যাব এবং এনএসআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাসমূহে চাকরি করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্য সে সময় এজলাসে থাকা টাইপিস্ট দ্রুত লিখে চলছিলেন। আদালতের বড় বড় মনিটরসহ অন্যান্য মনিটরেও সেই লেখা ভেসে উঠছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মনিটরের দিকে তাকাতে বলা হয় এবং একাধিক প্রসিকিউটর বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন।
প্রসিকিউশনের এমন আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউলের আইনজীবী নাজনীন নাহার এজলাসে উপস্থিত প্রসিকিউশন পক্ষের উদ্দেশে মন্তব্য করেন যে, সবাই মিলে যেন একসঙ্গে জেরার জবাব দেওয়া হয়।
আইনজীবী নাজনীন নাহারের এই মন্তব্যের পর পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাঁর অনেক কথা এতদিন সহ্য করা হয়েছে এবং তিনি যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন।
প্রসিকিউটরের এমন কথার জবাবে আইনজীবী নাজনীন নাহার পাল্টা প্রশ্ন তোলেন যে, তিনি কেন এভাবে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন।
পরিস্থিতি একপর্যায়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম মন্তব্য করেন যে, এই আদালত এখন সালিসে পরিণত হয়েছে এবং এটি সালিসের চেয়েও অনেক নিচে নেমে গেছে।
আদালতের ভেতরে এমন বাকবিতণ্ডা চলার সময় প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ারের উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনাল নিজেই প্রশ্ন রাখেন যে, তিনি কি চান আদালত এই বিষয়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
বিনিময়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার ট্রাইব্যুনালকে জানান যে, তিনি কেবল আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক সেটাই চান। তিনি আরও বলেন যে আদালত ফোনে কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন এবং অন্যদিকে আসামি কথা বলছেন, তাই আদালতের সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকুক।
পরবর্তীতে এই বিষয়ে মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার ব্যাখ্যা করেন যে, আদালতের ভেতরে ডিফেন্স কাউন্সিলের একজন রাগারাগি করছিলেন এবং জেরা করবেন না বলছিলেন, অন্যদিকে আরেকজন তাঁকে অনুরোধ করছিলেন। রাগারাগি ও তা ভাঙানোর এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল এজলাসে বসেছিলেন এবং আসামি ও আইনজীবী উভয়েই কথা বলছিলেন, ফলে আদালত তার নিজস্ব ডিসিপ্লিন ও ডেকোরাম রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
এদিকে সোমবারের আসামিপক্ষের জেরার সময় তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম আদালতকে জানান যে, অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, যা তিনি বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জেনে নিজের ডায়েরিতে টুকে রেখেছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জেরার জবাবে আরও স্পষ্ট করেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তারিক সিদ্দিকের সঙ্গে জিয়াউল আহসানের টেলিফোনে কোনো যোগাযোগের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর হাতে নির্দিষ্ট কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা এভিডেন্স সংরক্ষিত নেই।
তদন্ত কর্মকর্তা জবানবন্দিতে পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জিয়াউল আহসান র্যাব ও এনএসআইয়ে কর্মরত ছিলেন, তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কখনো এনএসআই কার্যালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর