নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের সমাজ মূলত উদার ও মধ্যপন্থী চরিত্রের হয়ে আসছে। এখানকার শতবর্ষী সমাজে কঠোর শাস্ত্রভিত্তিক ধর্মীয় কাঠামোর বিপরীতে সুফি, বাউল, নাথ, যোগী ও বৈষ্ণবদের সহজিয়া দর্শনের ব্যাপক প্রভাব ছিল। রাজনৈতিক ধ্যানধারণার চর্চা এই অঞ্চলে তুলনামূলক আধুনিক এক সংযোজন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা ঘটে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রেও এখানকার অধিকাংশ মানুষ বরাবরই বাস্তবসম্মত পথকে বেছে নিয়েছে। চরম ডান বা বামপন্থার চেয়ে বাস্তববাদী রাজনীতিই জনগণের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।
ব্রিটিশ জমানায় যুগান্তর দল, অনুশীলন সমিতি এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্রীতিলতা ও সূর্য সেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড জনসমাজে প্রবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের সেই বিদ্রোহ, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রবলভাবে উসকে দিয়েছিল। তবুও পরিশেষে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়েই অবসান ঘটেছিল ব্রিটিশ প্রত্যক্ষ শাসনের। ১৯০৬ সালে ঢাকার মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ, যা মূলত নবাব, নাইট ও খান বাহাদুরদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করত। তবে ১৯৩৬ বা ৩৭ সালের আগে এই সংগঠনটি সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। এর বিপরীত ধারায় কৃষকদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা প্রজা আন্দোলন বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে প্রজা আন্দোলনের বিকাশের ইতিহাস অত্যন্ত নিবিড় ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। সেই সময় হিন্দু জমিদার ও নায়েবদের কাছারিতে মুসলমান জোতদার, কৃষক ও প্রজাদের মাদুরে বসতে হতো। পক্ষান্তরে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের হিন্দু প্রজারা বেঞ্চিতে বসার সুযোগ পেতেন। সামাজিক মর্যাদার এই বৈষম্যের বিষয়টি ঘিরেই এই অঞ্চলের জোতদার কৃষকদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সচেতনতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরেই জন্ম নিয়েছিল প্রজা সমিতি এবং কৃষক-প্রজা পার্টি। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে এই দলটি অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছিল কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের যৌথ বা কোয়ালিশন সরকার।
চল্লিশের দশকের সূচনায় পাকিস্তানভিত্তিক আন্দোলন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং কৃষক-প্রজা পার্টি বিলীন হয়ে মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে নবাব ও নাইটদের প্রভাব কাটিয়ে মুসলিম লীগ সাধারণ কৃষক ও মধ্যবিত্তের মন জয় করতে সক্ষম হয়। ওই দশকে মুসলিম লীগের যে রাজনৈতিক তরঙ্গ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসিমসহ কিছু তরুণ নেতার মধ্যপন্থী ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক আগেভাগে মুসলিম লীগের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় সেই নবাব ও নাইটদের হাতেই ফিরে যায়। এর পরিণামে একদিকে দলটির প্রগতিশীল ও তরুণ অংশের হাত ধরে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়, অন্যদিকে মুসলিম লীগের মূল রাজনৈতিক অস্তিত্ব চিরতরে হারিয়ে যায়। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আইয়ুববিরোধী মুক্তিসংগ্রাম এবং ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে মূল নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগই।
গত ৫৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ পরিচালনা করেছে মূলত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ কিছুটা বামঘেঁষা মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত, আর বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পরিচিতি কিছুটা ডানঘেঁষা মধ্যপন্থী দল হিসেবে। এগুলোর বাইরে সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে গড়ে ওঠা বহু ডান ও বামপন্থী দল নানা উপদলে বিভক্ত রয়েছে। বিগত শতকের ষাটের দশকটিকে বামপন্থী রাজনীতির স্বর্ণালী সময় হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে এর অনেক আগেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভেদের সৃষ্টি হলে এ দেশের কমিউনিস্টরাও মস্কো ও পিকিং—এই দুই প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত মস্কোপন্থীরা নিজেদের একটি ধারা হিসেবে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সমর্থ হলেও পিকিংপন্থী রাজনীতি ১৯৭১ সালের মধ্যেই অন্তত তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।
পরবর্তী দুই দশকে পিকিংপন্থী ধারাটি আরও অসংখ্য উপধারায় টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মস্কো-পিকিং বিভাজনের কারণে বাম দলগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ছুঁতমার্গ ও তাত্ত্বিক আক্রমণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত তাদের ছয় দশক পরেও দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রথম সম্পাদক মতিউর রহমানের ‘লাল সালাম: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনসংগ্রাম ১৯৪৭-১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোট ২৪ জন কমিউনিস্ট বা বামপন্থী নেতা জয়লাভ করেছিলেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে এটিই ছিল বামপন্থীদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির ৫টিসহ বাম দলগুলো মোটে ১০টি আসন পেয়েছিল। কিছু আসনে তাদের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পেছনে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সমর্থনও কাজ করেছিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে দুটি ভিন্ন জোটে ভাগ হয়ে ১৮২টি আসনে প্রার্থী দিলেও তাদের মধ্যে ১৮০টি আসনেই প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। সার্বিকভাবে এই নির্বাচনে বাম দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। বিভিন্ন জনআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থীদের চিন্তা এবং রাজপথের উপস্থিতি কমবেশি প্রভাব ফেললেও, বহুধাবিভক্ত এই দলগুলোর পক্ষে জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কখনোই সম্ভব হয়নি। নির্বাচনী ঘরানার বামদের ক্ষেত্রে যা সত্য, অভ্যুত্থান ও বিপ্লবপন্থী বামদের বেলায়ও তা সমভাবে প্রযোজ্য।
রাজনীতিতে বামপন্থী ধারা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে সবচেয়ে বড় যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা হলো কৃষক, শ্রমিক, নারী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ান একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে সমাজে বিদ্যমান বাম, ডান ও মধ্যপন্থী চিন্তাধারার মধ্যকার ভারসাম্য চিরতরে ভেঙে গেছে। সার্বিক রাজনৈতিক চিন্তা ও জনআলোচনা এখন অনেক বেশি ডানপন্থী প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বিএনপির আট মাস অতিক্রান্ত হলেও বাউল ও মাজারপন্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বাউল গানের জলসা কিংবা যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা ও হামলার ঘটনা নিয়মিতই ঘটে চলেছে। কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠলে তবেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে, অন্যথায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নীরব থাকার কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে প্রথাগত ভোটারদের বাইরেও যেসব মানুষ কট্টর ডানপন্থী সরকার আসার ভয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর