ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কোরআনে বর্ণিত লোকমান হাকিমের ৯ প্রজ্ঞাময় উপদেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
কোরআনে বর্ণিত লোকমান হাকিমের ৯ প্রজ্ঞাময় উপদেশ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১ হাজার অব্দে আফrikযায় জন্ম নেওয়া লোকমান হাকিম এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব, যাঁর নামে পবিত্র কোরআনের ৩১ নম্বর সুরাটি নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর এই বিশেষ প্রজ্ঞা প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে তিনি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলেন এবং এই প্রজ্ঞার অনন্য প্রকাশ ঘটেছে সুরা লোকমানের ১৩ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত তাঁর সন্তানকে দেওয়া বিভিন্ন উপদেশের মধ্য দিয়ে। বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এই মৌলিক নীতিমালাগুলো ব্যক্তি এবং পরিবার উভয় জীবনের ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।

সন্তানকে দেওয়া প্রজ্ঞাবান পিতার প্রথম উপদেশটি ছিল বিশ্বাসের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপনসংক্রান্ত, যেখানে তিনি বলেন যে আল্লাহর সঙ্গে যেন কোনো অবস্থাতেই শিরক করা না হয়, কারণ এই শিরক হলো সবচেয়ে বড় অন্যায়। মানুষের চিন্তা এবং জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আর এই বুনিয়াদ যদি সঠিক না হয় তবে জীবনের অন্য কোনো অর্জনই তাকে প্রকৃত সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে না।

আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান সম্পর্কে সন্তানকে পুরোপুরি সচেতন করে তুলতে লোকমান হাকিম আরও বলেন যে কোনো কাজ যদি শর্ষের দানার মতো অত্যন্ত ক্ষুদ্রও হয় এবং তা যদি কোনো কঠিন পাথরের ভেতরে, সুদূর আকাশমণ্ডলে কিংবা পৃথিবীর যেকোনো অজানা স্থানেও লুকিয়ে থাকে, তবে আল্লাহ ঠিকই তা হাজির করবেন। মানুষের চোখে শর্ষের একটি ক্ষুদ্র দানা বা পাথরের ভেতরের সুক্ষ্ম বিষয় তুচ্ছ বা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও সম্যক জ্ঞানের বাইরে মানবকুলের প্রকাশ্য কিংবা গোপন কোনো কর্ম বা অন্তরের অভিপ্রায় কিছুই থাকে না।

পিতার এই সমস্ত উপদেশের মাঝেই আল্লাহপাক নিজে মা-বারের অপরিসীম অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন যে তিনি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ তার মা অসংখ্য কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। আজকের দিনে কোনো সন্তান যখন নিজের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও অবস্থান নিয়ে অহংকার বা গর্ব প্রকাশ করে, তখন সে ভুলে যায় যে তার এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে মা-বাবার অগণিত ত্যাগ ও শ্রম, আর এই অবদান ভুলে যাওয়া কেবল চরম অকৃতজ্ঞতাই নয়, বরং মৌলিক মানবিক মূল্যবোধেরও সরাসরি পরিপন্থী।

ঈমানের পরিক্রমায় লোকমান তাঁর সন্তানকে নিয়মিত নামাজ প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে নামাজ হলো বান্দার সঙ্গে তার পরম রবের সম্পর্ক নিবিড় করার প্রধান মাধ্যম। এখানে সাধারণ অর্থে নামাজ পড়ার কথা না বলে নামাজ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে, যার তাৎপর্য হলো নামাজকে এমন সুশৃঙ্খলভাবে আদায় করা যাতে তা ব্যক্তির পুরো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। আর এই নামাজের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের পরিমণ্ডলেই সীমিত থাকে না, কেননা আল্লাহ বলেছেন যে নামাজ মানুষকে সব ধরনের অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, ফলে এর শিক্ষা যখন মানুষের চিন্তাচেতনায় মিশে যায় তখন তা তাকে যেকোনো অন্যায় থেকে দূরে থাকতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

নামাজ প্রতিষ্ঠার এই মহান নির্দেশের পরপরই লোকমান সন্তানকে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দিয়ে বলেন যেন সে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে দৃঢ়ভাবে নিষেধ করে। ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত ভালো থাকা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শেখায় না, বরং সামগ্রিক সমাজের কল্যাণের প্রতিও তাদের সমানভাবে দায়িত্বশীল করে তোলে, যার কারণে নিজের সামর্থ্য ও উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করার পাশাপাশি মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সমাজের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে কিংবা সত্যের পথে অবিচল থাকতে গেলে বিভিন্ন বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে, এই বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে লোকমান বলেন যে মানুষের ওপর যে বিপদে আসে তাতে যেন সে পূর্ণ ধৈর্য ধারণ করে, কারণ এটি অত্যন্ত দৃঢ় সংকল্পের একটি কাজ। সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়া, মানুষের কল্যাণে কাজ করেও কটুকথা শোনা কিংবা নিজের ন্যায্য অধিকার ধরে রাখতে গিয়ে ব্যক্তিগত অসুবিধায় পড়ার মতো পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধরে সঠিক পথে অটল থাকার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন।

অহংকার বর্জনের কঠোর নির্দেশ দিয়ে লোকমান তাঁর সন্তানকে সতর্ক করে বলেছেন যে মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে কখনো যেন মুখ ফিরিয়ে না রাখা হয় এবং পৃথিবীতে যেন দম্ভভরে চলাফেরা করা না হয়, কারণ আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহংকারী মানুষকে ভালোবাসেন না। মানুষের অর্থসম্পদ, জ্ঞান, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচিতি বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় অন্যদের তুচ্ছ ভাবার এক ধরণের প্রবণতা তৈরি হয়, তাই লোকমান কেবল অন্তরের অহংকার ত্যাগ করতেই বলেননি, মানুষের সঙ্গে চলাফেরা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তার যেন কোনো প্রকাশ না ঘটে সেই নির্দেশ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) অহংকারের প্রকৃত পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং সাধারণ মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করাই হলো মূল অহংকার, যার মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হয় যে কেবল দামি পোশাক পরা বা বিলাসবহুল জীবনযাপন করা অহংকারের পরিচয় নয়, বরং সামনে সত্য আসার পরও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো এবং অন্যকে হেয় ভাবাই হলো অহংকার।

চলাফেরার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে লোকমান সন্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে নিজের চলাফেরায় সর্বদা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত, যেখানে কোনোভাবেই আত্মপ্রদর্শন প্রকাশ পাবে না আবার স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় চলাফেরায় কোনো ধরনের অকারণ কৃত্রিমতা বা শিথিলতাও কাম্য নয়। এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশ মানুষের সামগ্রিক জীবনাচরণে মিতাচারের বিশেষ গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়, যার ফলে পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যয়ভার বহন, সামাজিক অবস্থান প্রকাশ এবং দৈনন্দিন সাধারণ আচরণে সামঞ্জস্য বজায় রাখা একজন প্রকৃত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত হয়।

মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো তার কথাবার্তা এবং সে কীভাবে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে কিংবা মতবিরোধের সময় কেমন আচরণ প্রদর্শন করছে তার মাধ্যমেই তার আসল শিষ্টাচারের পরিচয় পাওয়া যায়। এই আলোচনার শেষাংশে লোকমান হাকিম নিজের কণ্ঠস্বর সবসময় সংযত রাখার জোরালো নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে তার কণ্ঠস্বর যেন নিচু রাখা হয়, কারণ সবচেয়ে অপ্রীতিকর ও কর্কশ আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ। কণ্ঠস্বর সামান্য উঁচু করলেই যে কোনো বক্তব্যের গুরুত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় বিষয়টি এমন নয়, আবার এর অর্থ এই নয় যে সব পরিস্থিতিতেই একদম নিচু স্বরে কথা বলতে হবে, বরং এখানে মূলত নিষেধ করা হয়েছে সব ধরনের অযথা উচ্চকণ্ঠ ও অসংযত আচরণকে।

সর্বপরি, প্রজ্ঞাবান লোকমান হাকিমের এই সমস্ত উপদেশসমূহ আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবনের প্রকৃত পরিবর্তন মূলত শুরু হয় তার বিশ্বাস ও চিন্তাচেতনার মৌলিক সংশোধনের মধ্য দিয়ে, আর সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পরবর্তীতে তার ইবাদত, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য ধারণ এবং সার্বিক আচরণের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যুবকের মরদেহ দেশে দেখার আক

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যুবকের মরদেহ দেশে দেখার আক