ঢাকা | বঙ্গাব্দ

লভ্যাংশ কর ১৫ শতাংশ: উদ্যোক্তাদের স্বস্তি, ক্ষুদ্রদের চাপ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
লভ্যাংশ কর ১৫ শতাংশ: উদ্যোক্তাদের স্বস্তি, ক্ষুদ্রদের চাপ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বাংলাদেশের ব্যক্তিগত করদাতাদের লভ্যাংশ অর্জনের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে একটি অত্যন্ত জটিল ও ভারী কর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। পূর্বে ডিভিডেন্ড বাবদ আসা অর্থ করদাতার সাধারণ আয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়মিত কর নেওয়া হতো। এর সঙ্গে সারচার্জ যুক্ত হলে সেই বোঝা আরও বেড়ে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশে পৌঁছাত। অর্থাৎ, ১০০ টাকা লভ্যাংশ পেলে সেখান থেকে ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা কর পরিশোধ করতে হতো। পাশাপাশি, উৎসে কর কর্তনটি বাধ্যতামূলকভাবে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হতো, যার ফলে অতিরিক্ত কেটে রাখা অর্থ কখনো ফেরত বা সমন্বয় করার কোনো অবকাশ ছিল না।

অর্থ আইন ২০২৬ পাসের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি ঐতিহাসিক ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন আয়কর আইনের সপ্তম তফসিল অনুযায়ী, সাধারণ করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর করের হার সরাসরি ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া উৎসে কর্তনকৃত অর্থকে আর চূড়ান্ত ন্যূনতম করের আওতাভুক্ত রাখা হয়নি, এটিকে এখন থেকে অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ বড় উদ্যোক্তা ও শীর্ষস্থানীয় করদাতাদের জন্য দারুণ স্বস্তিদায়ক হলেও প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে নতুন বিপত্তির সৃষ্টি করেছে।

প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ক্ষেত্রে এই সংশোধিত করনীতি আর্থিক পরিকল্পনার এক চমৎকার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পুরোনো বিধানের অধীনে পরিচালকেরা কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ না নিয়ে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কারণ হিসেবে বলা যায়, এই ধরনের ব্যয় কোম্পানিগুলো খরচ হিসেবে প্রদর্শন করতে পারত এবং এর মাধ্যমে করপোরেট করের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

নতুন নিয়মের ফলে শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত করের পরিমাণে নাটকীয় পতন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, যে শীর্ষ উদ্যোক্তা তার বেতনের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দিতেন, তিনি এখন প্রতিষ্ঠান থেকে লভ্যাংশ গ্রহণ করলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মাত্র ১৫ শতাংশ কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ, একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত করের চাপ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোম্পানিগুলো কেবল কর-পরবর্তী মুনাফা থেকেই লভ্যাংশ বিতরণ করতে সক্ষম হয়। এই নিয়মের ফলে কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা অযৌক্তিক উচ্চ পরিচালনা সুবিধা প্রদর্শন না করে পরিচ্ছন্ন ও প্রকৃত মুনাফা থেকে লভ্যাংশ প্রদানে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। এর মাধ্যমে প্রথমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করপোরেট কর সংগ্রহ করবে এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিশ্রেণি থেকে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ কর অর্জন করবে।

অন্যদিকে, ঠিক যখন শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাগণ এই পরিবর্তনের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন, তখন সাধারণ এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। নতুন আইন অনুযায়ী লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। একজন সাধারণ গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী কিংবা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যাঁদের বার্ষিক লভ্যাংশ আয় ৩ লাখ টাকা এবং যাঁদের মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে কিংবা মাত্র ১০ শতাংশের ধাপে রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রারম্ভিক অবস্থাতেই ১৫ শতাংশ বা ৪৫ হাজার টাকা কর কেটে রাখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বা প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই নতুন করকাঠামোর প্রকৃত অবস্থান পরিষ্কার হয়। ভারতের বাজারে লভ্যাংশ আয়ের ওপর আলাদা বা একক কোনো করহারের বিধান নেই। সেখানে সাধারণ আয়ের সঙ্গে লভ্যাংশ যোগ করে নিয়মিত হারে কর নেওয়া হয়, ফলে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সারচার্জসহ করের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে লভ্যাংশ দেওয়ার সময় ভারতীয় কোম্পানিগুলো ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখে।

ইন্দোনেশিয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির লভ্যাংশের ওপর সাধারণত ১০ শতাংশ চূড়ান্ত কর আদায় করা হয়। তবে সেখানে চমৎকার একটি প্রণোদনা রয়েছে, যেখানে লভ্যাংশ হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ দেশের উৎপাদনশীল বা অনুমোদিত কোনো খাতে তিন বছরের জন্য পুনর্বিনিয়োগ করা হলে কোনো কর দিতে হয় না, অর্থাৎ করের হার শূন্য শতাংশ। মালয়েশিয়ায় একক স্তর বা সিঙ্গেল টায়ার করব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোম্পানি পর্যায়ে কর পরিশোধের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ১ লাখ রিঙ্গিত পর্যন্ত লভ্যাংশ সম্পূর্ণ করমুক্তভাবে পান এবং এই সীমা অতিক্রম করলে মাত্র ২ শতাংশ কর দিতে হয়।

আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সহজ করকাঠামো বজায় রেখেছে। সেখানে ব্যক্তিশ্রেণির লভ্যাংশ আয়ের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ কর কাটা হয়, যা গোটা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের নতুন আইনে নির্ধারিত ১৫ শতাংশ অগ্রিম করের হার ভিয়েতনামের ৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার শূন্য থেকে ১০ শতাংশ কিংবা মালয়েশিয়ার প্রায় শূন্য শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে ভারতের ৩০ শতাংশের বেশি করহারের তুলনায় বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ হার উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক ও স্বস্তিদায়ক।

পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সংস্কারটি অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। যারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁরা সাধারণত ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকেই বেছে নেন। লভ্যাংশ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা শেয়ারবাজারের কৃত্রিম অস্থিরতা হ্রাস করবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কেবল মূলধনি লাভের পেছনে না ছুটে লভ্যাংশের আশায় দীর্ঘসময় শেয়ার ধরে রাখতে উদ্দীপ্ত হবেন।

এই সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। উদ্যোক্তারা এখন সম্পূর্ণ আইনসম্মত পন্থায় ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করে লভ্যাংশের অর্থ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে পারবেন। ফলে কোম্পানির ব্যালান্স শিটে কৃত্রিম হিসাব তৈরি করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। ব্যবসায়ী সমাজের প্রচলিত অভিমত অনুযায়ী, কোম্পানি যেহেতু ইতিমধ্যে কর-পরবর্তী মুনাফার ওপর কর পরিশোধ করে, তাই লভ্যাংশের ওপর পুনরায় করারোপ করা দ্বৈত করের শামিল। অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে প্রণীত ১৫ শতাংশ নির্দিষ্ট লভ্যাংশ করব্যবস্থা আমাদের করকাঠামোকে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করেছে ঠিকই, তবে এর সুফল পুরোপুরি নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত লভ্যাংশ করমুক্ত রাখা অথবা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশের করহার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দলীয় প্রভুত্ব কায়েমের প্রস্তুতি চলছে: শফিকুর রহমান

দলীয় প্রভুত্ব কায়েমের প্রস্তুতি চলছে: শফিকুর রহমান