ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এলপিজির চড়া দামে রাজধানীতে লাকড়িতে ঝুঁকছেন নিম্ন আয়ের মানুষ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
এলপিজির চড়া দামে রাজধানীতে লাকড়িতে ঝুঁকছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার ঠিক বিপরীত পাশের রাস্তাঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা টিনের ঘরগুলোর একটির বাইরে চলছে রান্নার আয়োজন। সেখানে উন্মুক্ত আকাশের নিচে মাটির চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করছেন ৩২ বছর বয়সী তামান্না নামের এক নারী। তাঁর কাছে রান্নার এই মাধ্যম পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত দামের কারণে ওই জ্বালানি কিনে সংসার চালানো তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমান সময়ে রাজধানী ঢাকার তামান্নার মতো প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের বহু পরিবার গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে মাটির চুলায় লাকড়ি, চেলা কাঠ কিংবা কাগজ পুড়িয়ে কোনোমতে রান্নার কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। বাজারমূল্য লাগামছাড়া হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তাঁদের এই বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি কর্তৃক চলতি নভেম্বর মাসের জন্য নির্ধারিত ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। তবে সাধারণ ক্রেতাদের এই নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, কারণ খোলা বাজারে বর্তমানে প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার চড়া মূল্যে।

চলতি বছরের গত মার্চ মাসেও পরিস্থিতির এতটা অবনতি ছিল না, যখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি দাম নির্ধারিত ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা এবং বাজারে তা দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি দামে পাওয়া যেত।

গৃহীতা তামান্নার পারিবারিক কাঠামো নিয়ে কথা বলে জানা যায়, তাঁর পরিবারে স্বামী ছাড়াও দুটি ছোট ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাঁর স্বামী একটি দোকান পরিচালনা করেন এবং তাঁর সঙ্গেই তামান্নাও সেখানে সময় দেন। ওই দোকানে মূলত পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, ছোলা এবং চিকেন রোলের মতো বিভিন্ন মুখরোচক ভাজাপোড়া খাবার তৈরি করে বিক্রি করা হয়।

রান্নার জ্বালানি প্রসঙ্গে তামান্না আক্ষেপ করে বলেন যে বাড়তি দাম দিয়ে গ্যাস কিনে রান্না করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়, বিশেষ করে যারা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম শেষে বাসায় ফিরে দ্রুত রান্নার কাজটি সেরে ফেলতে চান, তারা গ্যাসে চড়ান। পক্ষান্তরে, যাদের গ্যাস কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের বাধ্য হয়েই লাকড়িতে রান্না করতে হয় কারণ তাদের অন্য কোনো উপায় নেই এবং চরম অর্থকষ্টে তাদের সংসার চালাতে হয়।

তবে লাকড়ি দিয়ে রান্না করাও বর্তমানে বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন তামান্না। তিনি জানান যে প্রতি কেজি লাকড়ির জন্য তাঁদের ১৫ টাকা করে গুনতে হয়, যার হিসাব অনুযায়ী প্রতি মণের দাম পড়ে ৬০০ টাকা।

তামান্নার স্বামী মনির হোসেন জানান যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। তিনি যেসব খাদ্যপণ্য তৈরি করে বিক্রি করেন, সেগুলোর কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁর সামগ্রিক আয়ও কমে গেছে। এই কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন যে গরিব মানুষ সারাক্ষণ গরিবই থেকে যায়।

আগারগাঁও এলাকার একটি বস্তিতে বসবাসকারী ৫০ বছর বয়সী আরেক নারী রহিমার অবস্থাও প্রায় একই রকম। তিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বর্তমান বয়সের ভার ও অসুস্থতার কারণে আগের মতো নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। তাঁকেও বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে হয়।

বাসাবাড়িতে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বৈধ সংযোগের ক্ষেত্রে দুই চুলার মাসিক বিল আসে ১ হাজার ৮০ টাকা। এর বিপরীতে পাঁচ সদস্যের কোনো পরিবারে যদি নিয়মিত ও স্বাভাবিক নিয়মে রান্না করা হয়, তবে মাসে দুটি গ্যাস সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়, যার পেছনে মাসিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।

রহিমা গণমাধ্যমকে জানান যে আড়াই হাজার টাকা খরচ করে একসাথে একটি সিলিন্ডার কেনা তাঁর আর্থিক সামর্থ্যের সম্পূর্ণ বাইরে। এই দুর্বিষহ অর্থনৈতিক অবস্থার কারণেই নানা ধরনের শারীরিক ভোগান্তি সহ্য করেও তিনি লাকড়ির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হন।

নিজের কষ্টের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রহিমা বলেন যে অতীতে যখন গ্যাসে রান্না করতেন, তখন খুব দ্রুত কাজ শেষ করে চটজলদি কাজে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে লাকড়ি দিয়ে রান্না করার ফলে রান্নার পাত্র ও পরিধেয় কাপড়ে কালি লেগে যায়, ধোঁয়ার কারণে ঠিকমতো শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং ঘরের ভেতরেও কালি পড়ে যায়। সব মিলিয়ে লাকড়িতে রান্না করা তাঁর জন্য নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

পরিবারের সদস্যের বিষয়ে রহিমা জানান যে তাঁর এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। তাঁর স্বামী প্রায় সাত মাস আগে মারা গেছেন। তাঁর মেয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন এবং ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের ভিটেমাটির কথা স্মরণ করে তিনি জানান যে তাঁদের আদি বাড়ি ছিল ভোলায়, কিন্তু সর্বনাশা নদী তাঁদের সব ঘরবাড়ি ও জায়গািজমি গ্রাস করে নিয়েছে। তাই বর্তমানে তারা ঢাকা শহরে অত্যন্ত মানবেতর ও কোনোমতে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া এলাকার কিছু প্লটেও টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট ঘর দেখতে পাওয়া যায়। সেই ঘরগুলোতে হকারি করে, অটোরিকশা চালিয়ে কিংবা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা নিম্ন আয়ের মানুষেরা বসবাস করেন। সেখানেও অনেক পরিবারকে মাটির চুলা তৈরি করে লাকড়িতে রান্না করতে দেখা যায়।

সেখানকার একজন বাসিন্দা নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান যে তিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গিয়ে ঘর মোছা ও কাপড় ধোয়ার মতো দুটি কাজ করে মাস শেষে সব মিলিয়ে মাত্র আড়াই হাজার টাকা বেতন পান। অথচ বাজারে গিয়ে রান্নার জন্য একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে গেলেও ঠিক সমপরিমাণ অর্থাৎ আড়াই হাজার টাকাই খরচ করতে হয়।

বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে বাসাবাড়িতে কোনো ধরনের গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয় না। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির দুই চুলার সংযোগের মাসিক বিল ১ হাজার ৮০ টাকা হলেও পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের নিয়মিত রান্নার প্রয়োজনে দুই সিলিন্ডার গ্যাস বাবদ মাসে খরচ হয় পাঁচ হাজার টাকা।

একসঙ্গে একটি গ্যাস সিলিন্ডার কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত দুরূহ একটি বিষয়। এই আর্থিক অপারগতার কারণেই তারা লাকড়ির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এর প্রভাবে বাজারে লাকড়ির চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দামও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঠ বিক্রেতারা জানাচ্ছেন যে কাঠের মানভেদে প্রতি মণ লাকড়ির দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এবং বর্তমানে তা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আগারগাঁওয়ের লাকড়ি বিক্রেতা ৩৫ বছর বয়সী হাফিজুর জানান যে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আগের সময়গুলোতে তিনি দিনে মোটে এক থেকে দেড় মণ লাকড়ি বিক্রি করতেন। অথচ বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তনে তাঁর দোকানে দিনে প্রায় ৭ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত লাকড়ি বিক্রি হচ্ছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
শ্রীমঙ্গলে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় শিশু নিহত, আহত একই পরিবার

শ্রীমঙ্গলে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় শিশু নিহত, আহত একই পরিবার