নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ দায়দেনা এখন দুইশত চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির চল্লিশ শতাংশের বেশি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের আমলেই এই পাহাড়সমান দায়ে জর্জরিত হওয়ার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল। গত দেড় দশকে পুঞ্জীভূত এই দায় থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার কোনো লক্ষণ অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন বা বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির মাঝে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারের ভেতরের দিক থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনীহা কিংবা সংযম প্রদর্শনের প্রবণতা একদম অনুপস্থিত।
বর্তমান দুই হাজার ছাব্বিশ থেকে দুই হাজার সাতাশ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, পুরোনো পাওনা শোধ ও সুদ মেটানোর জন্য নির্ধারিত অর্থ দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল খাত শিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রায় সমান হয়ে গেছে। আগামী দুই হাজার আঠারো থেকে দুই হাজার উনিশ সালের জাতীয় হিসাব থেকে সরকারের এই দায় শোধের খাতটিই সবচেয়ে বড় ব্যয়ের অংশে রূপ নেবে। ফলে প্রতিবেশী পাকিস্তানের মতো এ দেশের প্রশাসনকেও দেনার কিস্তি পরিশোধ করার জন্যই নতুন করে ঋণ নেওয়ার দুষ্টচক্রে পড়তে হবে, যাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ঋণ ফাঁদ বলা হয়।
গত দুই হাজার ছাব্বিশ সালের এগারো মাস শেষে বৈদেশিক পাওনাদারদের কাছে বাংলাদেশের মোট দেনার পরিমাণ একশো ষোলো বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মোটের ওপর জিডিপির চব্বিশ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মাপকাঠিতে বাইরের দেনা তখনই বিপজ্জনক বলা হয় যখন তা মোট উৎপাদনের চল্লিশ ভাগের ঘর ছাড়িয়ে যায়। সেই হিসেবে বর্তমান চিত্রটিকে নিরাপদ মনে হতে পারে, তবে পেছনের অন্য বাস্তবায়নগুলো খতিয়ে দেখলে আসন্ন বিপদের প্রকৃত ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা সম্ভবপর হয়।
কর্ণফুলী তলদেশ দিয়ে নির্মিত যোগাযোগ সুড়ঙ্গে দশ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা প্রচার করা হলেও এখান থেকে তিন হাজার কোটি টাকার অধিক লুটপাট করা হয়েছে। এই নির্মাণের আনোয়ারা অংশে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় পাঁচ তারকা মানের একটি অবকাশ কেন্দ্র বানানোর মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সরকারি তহবিল অপচয় করা হয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দ্রুতগতির বাস চলাচলের প্রকল্পটিতে দুই হাজার আটশো কোটি টাকার বেশি তছরুপ হওয়ার পর অবশেষে তা পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা অনুসারে, বিগত উনিশ থেকে কুড়ি অর্থবছর পর্যন্ত এ দেশের বাইরের দেনা সামগ্রিক উৎপাদনের পনেরো শতাংশের নিচে অবস্থান করছিল। সেই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মোট দেনার প্রায় আটত্রিশ শতাংশ এসেছে বিশ্বব্যাংক থেকে, চব্বিশ দশমিক পাঁচ শতাংশ এডিবি থেকে এবং সতেরো শতাংশ জাপানি সংস্থা জাইকা থেকে। বাকি অংশের মধ্যে চীন থেকে ছয় দশমিক আটাশ, রাশিয়া থেকে ছয় দশমিক চৌদ্দ এবং ভারত থেকে মাত্র এক দশমিক তিন শতাংশ সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ।
এসব আন্তর্জাতিক উৎস থেকে মূলত সহজ শর্তে এবং কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অতীতে খুব বেশি সমস্যা তৈরি হয়নি। গত পঞ্চান্ন বছরের ইতিহাসে কখনোই বাইরের দেনার কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়নি এই জনপদ, এমনকি করোনা মহামারীর আগের বছরগুলোতেও এই সুদাসলের পরিমাণ ছিল বাজেটের সামান্য একটি অংশ। কিন্তু পূর্ববর্তী শাসনামলের শেষ দশকে একের পর এক অতি খরচে মেগা প্রকল্পের নামে অন্ধভাবে তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে এক বিশাল লুণ্ঠন সাম্রাজ্য তৈরি করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা এখনো দাবি করেন যে সেই পনেরো বছরের মেয়াদে দেশে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে এবং বড় বড় স্থাপনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের চোখের সামনে বিশাল সেতু, পাতালপথ বা সুড়ঙ্গ থাকার কারণে এই যুক্তিগুলো প্রাথমিক অবস্থায় বেশ চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়। কিন্তু এই দৃষ্টিগ্রাহী কাঠামোগুলোর ঠিক আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির ভয়াবহ ইতিহাস, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের।
যারা এই অবকাঠামো নির্মাণের ভেতরের দুর্নীতি ও হরিলুটের প্রকৃত চিত্র অনুধাবন করতে পারতেন, তারা আগেই জানতেন এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে একচ্ছত্র শাসন ও অর্থ পাচারের যে সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল, তার আর্থিক খেসারত দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের জনগনকে পরিশোধ করতে হবে।
চব্বিশ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক দিনটিতে সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের দেনার সম্মিলিত পরিমাণ আঠারো লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অথচ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের দিন এই সম্মিলিত অঙ্কের পরিমাণ ছিল মাত্র দুই লক্ষ ছিয়াত্তর হাজার আটশো ত্রিশ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে কী পরিমাণ বেপরোয়া গতিতে ঋণের বোঝা চাপিয়ে মাথাপিছু আয়ের কৃত্রিম স্ফীতি দেখিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
বিগত তেইশ ও চব্বিশ সালের হিসাবকালে বাইরের পাওনা শোধ করতে আড়াই বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হলেও বর্তমান বাজেটে তা বেড়ে সাড়ে চার বিলিয়নে ঠেকেছে। আগামী দিনগুলোতে এই খাতে অর্থের জোগান আরও বাড়িয়ে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে বলে বিভিন্ন সূত্রে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া বিষয় হলো দেশের ভেতরের খাতগুলো থেকে বর্তমান প্রশাসনের ঋণ নেওয়ার যে প্রবণতা চলছে, তাতে আগামীতে ঘাটতি উৎপাদনের পাঁচ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এই সার্বিক সংকটের মূল শিকড়টি নিহিত রয়েছে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার মধ্যে, যা বর্তমানে মোট উৎপাদনের মাত্র সাত শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
কয়েক বছর আগেও এই অনুপাত দশ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও বিগত পাঁচ বছরে তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। একপাশে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল স্থাপনা গড়ার উন্মাদনা এবং অন্যপাশে সরকারি কোষাগারে অর্থ আদায়ে চরম ব্যর্থতা—এই দুইয়ের ফল হিসেবেই দেনার এই পাহাড় তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ ভাগে বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে গেলেও কেবল প্রবৃদ্ধির ভুয়া চিত্র দেখাতে সরকারি খাতের বিনিয়োগ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল।
ব্যাংক খাত থেকেও যত্রতত্র উপায়ে দেদারছে তহবিল তুলে নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশ থেকে অর্থ আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট ব্যাংকিং কাঠামো ব্যবহার করে এক অদ্ভুত লুণ্ঠনের দুষ্টচক্র কায়েম করেছিল, যা অর্থনীতির ভিত সম্পূর্ণ দুর্বল করে দিয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর