ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান মক্কা চুক্তির প্রথম দশ বছর প্রত্যাহার করা যাবে না

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 21, 2026 ইং
তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান মক্কা চুক্তির প্রথম দশ বছর প্রত্যাহার করা যাবে না ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মাঝে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের হলেও, কার্যকর হওয়ার প্রথম এক দশকের মধ্যে কোনো রাষ্ট্রই এই সমঝোতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারবে না। নির্ধারিত ১০ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো সদস্য দেশ চুক্তি ত্যাগ করতে ইচ্ছুক হলে, তাদেরকে তিন মাস পূর্বে লিখিতভাবে নিজ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অবশই অবহিত করতে হবে।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ১৬ ধারাসম্পন্ন এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকের সম্পূর্ণ বিবরণীটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সংগ্রহে এসেছে এবং সম্প্রতি গত মঙ্গলবার অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে চুক্তিটি তুরস্কের জাতীয় পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়েছে।

চুক্তির বিভিন্ন ধারায় সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্র কিংবা ভৌগোলিক অঞ্চলকে বিপদের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এর বদলে তিন দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত সীমান্তগুলো সুরক্ষিত রাখতে পারস্পরিক সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

চুক্তির দ্বিতীয় ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জোটের যেকোনো সদস্য পক্ষ যদি বাহ্যিক কোনো সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হয়, তবে সেই আগ্রাসনকে সব পক্ষের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। কোনো রাষ্ট্র যদি এক বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়, তবে বাকি দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সবরকম সহায়তা প্রদান করবে এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণ করবে।

জাতিসংঘ সনদের একান্ন অনুচ্ছেদে বর্ণিত আত্মরক্ষার সহজাত অধিকারকে ভিত্তি করেই এই যৌথ সহযোগিতা পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে প্রথম ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক পরিধি বা স্বীকৃত সীমান্ত হুমকির মুখে পড়লে তা নিষ্ক্রিয় করতে অন্য অংশীদাররা সম্ভাব্য সব ধরনের কার্যকর উপায় প্রয়োগ করবে।

নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে নিয়মিত শলাপরামর্শ করবে এই ত্রিদেশীয় জোট এবং যৌথভাবে জঙ্গিবাদ দমনে নিজেদের তৎপরতা আরও জোরদার করবে। শান্তিকালীন পরিস্থিতি কিংবা যুদ্ধাবস্থা—উভয় কালেই সামরিক বাহিনীর সদস্য পারস্পরিক বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে সেনা মোতায়েনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তি আদান-প্রদান, যৌথ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। চাহিদা ও সক্ষমতা অনুযায়ী যুদ্ধাস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি তেল, যন্ত্রাংশসহ সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে গোয়েন্দা তথ্যও আদান-প্রদান করা হবে।

তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হবে, যা প্রতি বছর পালাক্রমে তিন রাষ্ট্রে দুটি বৈঠকে মিলিত হবে। এছাড়া প্রয়োজন সাপেক্ষে তিন দেশের শীর্ষ নেতারাও বছরে অন্তত একবার পারস্পরিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন এবং সৌদি আরবে চুক্তিটির প্রধান সচিবালয় স্থাপিত হবে।

জোটভুক্ত তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছর মেয়াদের জন্য মহাসচিব পদের দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং এর প্রথম মহাসচিব আসবেন পাকিস্তান থেকে। চুক্তির আওতায় নতুন কোনো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিমালা বা নিয়ম তিন দেশ সম্পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে এবং এর গোপনীয় নথি কোনো অবস্থাতেই বাইরের কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের কাছে প্রকাশ করা যাবে না।

শুধুমাত্র একান্ত প্রয়োজন এবং যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকলেই কেবল সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ব্যক্তিরা এই গোপনীয় নথিপত্র দেখতে পারবেন এবং এই পূর্ণাঙ্গ বিবরণীকেই চুক্তি বাস্তবায়নের মূল আইনি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অতীতে সম্পন্ন হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর যাবতীয় অধিকার ও দায়দায়িত্ব পুরোপুরি অক্ষুণ্ন থাকবে এবং যেকোনো ধরনের মতপার্থক্য কেবল আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করতে হবে।

সবকটি দেশের পার্লামেন্ট বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর সর্বশেষ অনুমোদনপত্রটি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির নির্ধারিত সচিবালয়ে জমা দেওয়ার মাধ্যমেই এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। চুক্তি থেকে কেউ সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা কার্যকর হওয়ার জন্য অন্তত তিন মাস আগে অন্য অংশীদার রাষ্ট্রগুলোকে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে।

কোনো দেশ চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে গেলেও এর আগে যেসব কার্যক্রম ও প্রকল্পের বিষয়ে পারস্পরিক সম্মতি হয়েছিল, সেগুলোর ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে সংরক্ষিত গোপনীয় নথিপত্র সুরক্ষিত রাখার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা চুক্তি ত্যাগের পরেও সমানভাবে বহাল থাকবে।

তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি—এই তিনটি ভিন্ন ভাষায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এই তিন ভাষার মূল পাঠের কোনো ব্যাখ্যায় মতবিরোধ দেখা দিলে সর্বাবস্থায় ইংরেজি পাঠকেই প্রধান ও চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিগত বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে যে, এই চুক্তি অনুমোদনের পরপরই সৌদি আরবে নিজস্ব সেনাসদস্য প্রেরণের জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চাইবে তুর্কি প্রশাসন।

ক্ষমতাসীন একে পার্টির এক সংসদ সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞরা সৌদি আরবে যাবেন, তবে তারা কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন না। হুতি বিদ্রোহীদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে লোহিত সাগরের জলসীমায় নিরাপদ নৌ চলাচলের স্বার্থে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটেও যুক্ত হতে সম্মত হয়েছে তুরস্ক।

এর পাশাপাশি গতকাল কাতারের রাজধানী দোহায় তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া যৌথভাবে সম্পূর্ণ পৃথক অপর একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই পৃথক চুক্তির আওতায় সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি, যৌথ প্রশিক্ষণ পরিচালনা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
জুলাই শহীদের মেয়ে লামিয়া ধর্ষণ মামলায় ৩ আসামির কারাদণ্ড

জুলাই শহীদের মেয়ে লামিয়া ধর্ষণ মামলায় ৩ আসামির কারাদণ্ড