ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি নির্বাচনে আরব দলগুলোর বড় সাফল্যের ইঙ্গিত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 29, 2026 ইং
ইসরায়েলি নির্বাচনে আরব দলগুলোর বড় সাফল্যের ইঙ্গিত ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ইসরায়েলে সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে আকর্ষক ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি হলো দেশটির প্রধান দুটি আরব রাজনৈতিক দলের অত্যন্ত জোরালো ও প্রভাবশালী অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান ও তীব্র অসন্তোষ জানাতে দল দুটির সমর্থক ও ভোটাররা রেকর্ডসংখ্যক ভোট প্রদান করেছেন। গত মঙ্গলবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে ইসরায়েলের বিভিন্ন সম্প্রচারমাধ্যমের প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ থেকে পরিষ্কার আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, আরব দল দুটি এবারের নির্বাচনে দারুণ বড় সাফল্য অর্জন করতে চলেছে। বুথফেরত জরিপ বলতে মূলত বোঝায় ভোটদান শেষ করে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা ভোটারদের ওপর সরাসরি চালানো একধরনের সমীক্ষা। এই সমীক্ষায় ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে তাঁরা ঠিক কাকে ভোট দিয়েছেন এবং তাঁদের দেওয়া সেই উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করেই মূলত নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

আলোচিত এই দল দুটি হলো সামাজিকভাবে রক্ষণশীল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা সংক্ষেপে রাআম এবং অপরটি হলো বামপন্থী জয়েন্ট লিস্ট। সর্বশেষ প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, দল দুটি এবার ইসরায়েলের পার্লামেন্টে রেকর্ডসংখ্যক আসন লাভ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটির প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে, সেই ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই আরব দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।

ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাআমের শীর্ষ নেতা মনসুর আব্বাস একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আরব ভোটারদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক উপস্থিতি এটিই প্রমাণ করে দিয়েছে যে তাঁরা তাঁদের দীর্ঘদিনের ‘হতাশা ও নিরাশা’কে সম্পূর্ণভাবে ‘আশায়’ রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষই হলো আরব। মনসুর আব্বাস তাঁর বক্তব্যে আরও বলেছেন যে তিনি মূলত ‘সম্ভাব্য সব উপায়ে’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারের অবসান বা পরিবর্তন চান। তাঁর প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার হলো এমন একটি নতুন সরকার গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করা, যার মাধ্যমে তাঁদের এই নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা পুরোপুরি সম্ভব হয়।

এদিকে আরব দলগুলোর এই অভাবনীয় সাফল্য দেশটির ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে তাদের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাবিকাঠি করে তুলতে পারে। তবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরব দলগুলোকে সরাসরি সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করা এখনো একটি বেশ জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়। অনেক ইসরায়েলি ইহুদি নাগরিক এখনও মনে করেন যে পার্লামেন্টে সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনের ওপর কখনো নির্ভর করা উচিত নয়।

ইসরায়েলের এই আরব নাগরিকদের একটি বড় অংশের মূল শেড় মূলgetAddress ফিলিস্তিনিদের বংশধরদের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৪৮ সালে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময় একটি তীব্র আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ঠিক সেই যুদ্ধের সময়ই এই ফিলিস্তিনিরা তাঁদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে না গিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিলেন।

বর্তমান সময়ে এসে দেখা যায়, এই আরব নাগরিকদের অর্ধেকের বেশি বা বেশির ভাগ মানুষই ইহুদি ইসরায়েলিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও পৃথক শহরে বসবাস করে আসছেন। দৈনন্দিন জীবনে তাঁরা নানা ধরনের সহিংসতা এবং আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বৈষম্যমূলক সরকারি নীতির চরম শিকার হন।

ইসরায়েলের একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব পরিচয়সহ নানা মৌলিক বিষয়ে দেশটির আরব নাগরিকদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ও অমিল রয়েছে। আর ঠিক এসব নানা জটিল কারণে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটির অনেক আরব ভোটার সচেতনভাবে ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন এবং ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

তবে বর্তমান সপ্তাহের এই নির্বাচনে এসে অনেক আরব ভোটার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন যে, বিশেষ করে পশ্চিম তীর এবং অবরুদ্ধ গাজায় সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর চরম আচরণে তাঁরা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও ফিলিস্তিনিদের অত্যন্ত অবমূল্যায়ন করে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয় বলেই তাঁরা জোরালোভাবে মনে করেন। আর এহেন পরিস্থিতির জন্য তাঁরা দেশের সরকারের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতিকেই প্রধানত দায়ী করে থাকেন। এমনকি গোটা নির্বাচনী প্রচারণাজুড়ে নেতানিয়াহু অত্যন্ত প্রকাশ্যে নিজের আরববিদ্বেষী মনোভাব ও প্ররোচনাকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের কাছ থেকে ভোট চেয়েছেন।

গত মঙ্গলবার লোদ নামক একটি শহরে সশরীরে ভোট প্রদান করেন ৩৯ বছর বয়সী এক আরব-ইসরায়েলি নারী, যাঁর নাম খুলুদ আল-জেইনাতি। উল্লেখ্য, এই লোদ শহরটিতে ইহুদি এবং আরব—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই পাশাপাশি বসবাস করে থাকেন। গত মঙ্গলবার সেখানকার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের বেশ দীর্ঘ সারি ও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

ভোট দিয়ে বের হয়ে এসে খুলুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি খুব আশাবাদী। মানুষ এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে এটা সাধারণ কোনো মামুলি নির্বাচন নয়। আমরা একটি নিশ্চিত পরিবর্তন চাই।’ এই আরব-ইসরায়েলি নারী আরও বলেন, ‘জীবনের নানা ক্ষেত্রে আরব সম্প্রদায়কেই সবচেয়ে বেশি চড়া মূল্য দিতে হয়। তাই আমাদের প্রত্যেককে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এই ভোটাভুটিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।’

খুলুদ অত্যন্ত আশার সুরে আরও বলেন, ‘আমি আশা রাখি যে, আগামীতে সরকার কেমন হবে, তা পুরোপুরি ঠিক করতে আমাদের এই ভোট সত্যিই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা রাখবে। এবং এটি আমাদের সবার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে একটি সুন্দর ও ভালো পরিবর্তন নিয়ে আসবে।’

গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই জাতীয় নির্বাচনে নজিরবিহীন ও চমৎকার ভালো ফলের আভাস পাওয়া সেই দুটি আরব দলের মধ্যে একমাত্র রাআম দলটই কেবল এর আগে দেশটির জোট সরকারে সরাসরি যোগ দিয়েছিল। এর আগে ২০২১ সালে দলটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সেই স্বল্পস্থায়ী এবং নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকারের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছিল।

রাআম দলখানি সেই জোট সরকারের সরাসরি শরিক হওয়ায় দেশের অনেক উগ্র ডানপন্থী ইহুদি ভোটার চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এর মাত্র প্রায় এক বছর পর বেনেটের সেই সরকারের আকস্মিক পতন ঘটে। আর এর পরপরই ওই ডানপন্থী ভোটাররা পুনরায় নেতানিয়াহুর দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাঁকে সমর্থন জানান। পরবর্তীতে তিনি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উগ্র ইহুদিবাদী সরকার গঠন করতে সক্ষম হন।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে খোদ নেতানিয়াহুর সেই কট্টর সরকারেরই এবার ক্ষমতা হারানোর একটি প্রবল আশঙ্কা ও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আর ঠিক যে নির্বাচনী ফলাফলটি আজ এই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তার পেছনে প্রধান ও সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি পালন করেছেন আরব ভোটারদের এই রেকর্ড পরিমাণ বিপুল অংশগ্রহণ।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
কোরআনের হাফেজদের সম্মান, দায়িত্ব ও জীবনচর্চা কেমন হওয়া চাই

কোরআনের হাফেজদের সম্মান, দায়িত্ব ও জীবনচর্চা কেমন হওয়া চাই