ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নিখুঁত মায়ের অবাস্তব সামাজিক চাপ ও মিলেনিয়াল মাতৃত্বের সংকট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
নিখুঁত মায়ের অবাস্তব সামাজিক চাপ ও মিলেনিয়াল মাতৃত্বের সংকট ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

তিনটি সন্তানের জননী লরা গাকিয়ান তাঁর জীবনের প্রথম সন্তান জন্মদানের অব্যবহিত পরেই গুরুতর মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সংকট এতটাই তীব্র রূপ ধারণ করেছিল যে, একপর্যায়ে তাঁকে বাধ্য হয়ে একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়।

নিজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান যে, বর্তমানের এই মিলেনিয়াল প্রজন্মকে শৈশবকাল থেকেই একটি বিশেষ ধারণা দেওয়া হয়েছে। তাদের শেখানো হয়েছে যে একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা অর্জন, পেশাগত ক্যারিয়ার গড়া, সংসার সামলানো এবং সন্তান লালন-পালন—এই সবকিছুই অত্যন্ত সফলভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

তবে এই প্রজন্মের নারীদের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্রটি তাত্ত্বিক কথার মতো এত সহজ নয়। মাতৃত্বের প্রতিটি আলাদা মুহূর্ত সবসময় আনন্দ নিয়ে উপভোগ করতে হবে এবং কখনোই কোনো ধরনের ক্লান্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না—এমন অবাস্তব প্রত্যাশাও নারীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

অভিভাবকদের ওপর নিখুঁত মা হওয়ার সামাজিক চাপ কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। সেই গবেষণার ফলাফলে প্রকাশ পেয়েছিল যে, এই ধরনের সামাজিক চাপ অভিভাবকদের মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে তুলছে।

এর চার বছর পর, অর্থাৎ ২০২২ সালে পরিচালিত আরেকটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন মাধ্যমে অন্য মায়েদের জীবনের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করা এবং সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে একা একাই নেওয়ার প্রবণতা ক্ষতিকর ভূমিকা রাখছে। এই আচরণ কর্মক্ষেত্র এবং সন্তান লালন-পালন—উভય ক্ষেত্রেই মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট হিসেবে কাজ করা ক্যাট ন্যাপও ঠিক একই ধরনের কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছেন। সন্তানকে নিয়মিত বুকের দুধ পান না করানো এবং বিভিন্ন ধরনের শিশুতোষ ক্লাসে সন্তানকে নিয়মিত হাজির না করার মতো বিষয়গুলোর কারণে তিনি নিজেকে অন্যদের তুলনায় একজন অপরিণত মা বলে মনে করতেন।

নিজের ত্রুটিহীনতার এই মানসিকতার নেতিবাচক ফলস্বরূপ তাঁর মধ্যে প্রসব-পরবর্তী তীব্র উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দুই বছর ধরে নিয়মিত ব্যক্তিগত থেরাপি বা কাউন্সেলিং নেওয়ার পর তিনি তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে বর্তমানে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পেরেছেন।

বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট মত হলো, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে শিশুদের খাবার গ্রহণের ধরন, ঘুমের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি, গ্যাজেটের স্ক্রিন টাইম কিংবা সার্বFDবুক সন্তান লালন-পালন পদ্ধতি নিয়ে অসংখ্য ধরনের পরামর্শের ছড়াছড়ি রয়েছে যা মায়েদের মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত করছে। অথচ সব শিশুর শারীরিক ও মানসিক প্রয়োজন কখনোই এক রকম হতে পারে না।

যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা এলা নামের অপর এক মা জানান যে, সন্তানের ঘুমের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিক করার জন্য তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পরামর্শ অন্ধের মতো অনুসরণ করেছিলেন। এমনকি এজন্য একজন বিশেষজ্ঞকে তিনি তিনশ পাউন্ড ফি পর্যন্ত দিয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও তাঁর মনের ভেতরের উদ্বেগ বিন্দুমাত্র কমেনি।

দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার অন্তە তিনি অবশেষে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, অন্য কারো দেওয়া গেঁড়ে বসা পরামর্শ অন্ধভাবে শোনার চেয়ে নিজের সন্তানের প্রকৃত প্রয়োজন এবং নিজের মানসিক প্রশান্তিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া বেশি দরকার।

মাতৃত্বজনিত অপরাধবোধ ও মানসিকতা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ বেলিন্ডা ব্যাটের মতে, সন্তান লালন-পালন সম্পর্কিত তথ্যের প্রাচুর্য বর্তমান যুগে ভূরি ভূরি থাকলেও সেই সমস্ত জটিল পরামর্শ বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ দায়ভার কেবল মায়েদের একার ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চরম নেতিবাচক প্রভাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এবং বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন সংঘাতের মতো বড় বড় অনিশ্চয়তাগুলোও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীর উপযোগী করে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে মায়েদের জন্য বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে।

লরা গাকিয়ানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিগত প্রজন্মের মায়েদের বর্তমান যুগের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য দশজন মানুষের নিখুঁত জীবনযাপনের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে তুলনা করার মতো আত্মঘাতী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।

এই বিদ্যমান হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা আনা, পুরুষদের জন্য আরও উন্নত পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করা, সাশ্রয়ী মূল্যে শিশুযত্ন কেন্দ্র স্থাপন এবং মায়েদের নিজস্ব মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

সবশেষে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরামর্শ হলো, সবদিক থেকে একদম নিখুঁত মা হওয়ার অহেতুক ও অবাস্তব প্রতিযোগিতা থেকে নারীদের পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তে মায়েদের নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত সক্ষমতাকেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কারণ একজন মা মানসিকভাবে ভালো ও সুস্থ না থাকলে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পুরো পরিবারটির ওপরই পড়ে। মূলত একটি শিশুর পাশাপাশি মায়ের নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা—উভয়কেই সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমেই মাতৃত্বের প্রকৃত ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
কলকাতার পুজোয় ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কাঠগড়ায় মুখ্যমন্ত্রীর ভা

কলকাতার পুজোয় ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কাঠগড়ায় মুখ্যমন্ত্রীর ভা